“আমি বললাম ঘণ্টা কিংবা অন্য কিছু। ঘুঙুরও হতে পারে।”
দোকানের মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, সে ভাবছে আমি তার সাথে ঠাট্টা করছি। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“যারা চোখে দেখতে পায় না তারা খেলতে পারবে।”
মানুষটা মুখ বাঁকা করে বলল, “যারা চোখে দেখতে পায় না তারা খেলবে লুডু, বল কেন খেলবে?”
আমি মানুষটার সাথে তর্ক করে একটা টেনিস বল কিনে আনলাম। যদি এরকম বল কিনতে পাওয়া না যায় তা হলে সেটা বানাতে হবে।
রাস্তার মোড়ে বড় বড় গোঁফের একজন কমবয়সী মুচি কাজ করে। আমি একদিন তার কাছে গিয়ে হাজির হলাম। আমি আগেই লক্ষ করেছি একজন মুচির সামনে দিয়ে যখন কেউ হেঁটে যায় তখন সে কখনো মানুষটার মুখের দিকে তাকায় না, সবসময় তার পায়ের দিকে তাকায়। কাজেই কমবয়সী মুচিটিও আমার পায়ের দিকে একবার তাকিয়ে তার কাজ করে যেতে লাগল। আমি যেহেতু চলে যাইনি তাই শেষ পর্যন্ত মুচিটি আমার মুখের দিকে তাকাল। তখন আমি বললাম, “আমি কি আপনার সাথে একটা জিনিস নিয়ে কথা বলতে পারি?”
“কী জিনিস?”
আমি তখন তার সামনে বসে টেনিস বলটা দেখিয়ে বললাম, “এই টেনিস বলটা কেটে একটা জিনিস ঢুকিয়ে আবার কি সেটা ঠিক করে দেওয়া যাবে?”
“কী জিনিস ঢুকাতে চাও?” আমি পকেট থেকে কয়েকটা ঘুঙুর বের করে দিলাম, “এই যে এগুলো।”
মানুষটি ঘুঙুরগুলো পরীক্ষা করে দেখল, তারপর টেনিস বলটা দেখে বলল, “এটা কেটে তারপর ঢোকাতে হবে। আমার কাছে খুব চিকন সুঁই আছে সেটা দিয়ে সেলাই করে দিতে পারি, কিন্তু শুধু সেলাই দিয়ে হবে না।”
“কেন হবে না?”
“বাতাস বের হয়ে গেলে তো বল লাফাবে না।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “তা হলে কীভাবে করা যাবে?”
“খুব ভালো আঠা দরকার। বিদেশী আঠা আছে খুব দামি। রবার পাস্টিক চামড়া সব জোড়া দিতে পারে।”
“আছে আপনার কাছে সেই আঠা?”
মানুষটা মাথা নাড়ল, “নাই। দেখি জোগাড় করতে পারি কি না।”
দামি আঠা কতো দামি সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম, “কতো খরচ পড়বে?”
মানুষটা হাসল, বলল, “খরচ তো পরের কথা! আগে দেখতে হবে এটা সম্ভব কি না।”
“আমার কাছে তো টাকা বেশি নাই সেই জন্যে জানতে চাচ্ছিলাম।”
“পোলাপানের কাছে টাকা থাকার কথা না। আমি জানি।” মানুষটা গম্ভীর হয়ে বলল, “আমার কাছে রেখে যাও, দেখি কী করা যায়।”
“কবে আসব?”
“কাল-পরশু।”
কাজেই আমি মুচির কাছে টেনিস বলটা রেখে গেলাম। কমবয়সী মানুষটা সেটা নিয়ে গবেষণা করল, দুইদিন পর সত্যি সত্যি সে টেনিস বলটা আমাকে ফিরিয়ে দিল। ভিতরে চারটা ঘুঙুর-বলটা নাড়ালেই ঝুনঝুন শব্দ করে। আমার কানেই খুব স্পষ্ট শোনা যায় আঁখি নিশ্চয়ই আরো অনেক ভালো শুনতে পাবে! মুচির হাতের কাজ খুবই ভালো, সেলাইটা প্রায় দেখাই যায় না। তার উপরে এক ধরনের আঠা লাগিয়েছে। আমি টেনিস বলটা মাটিতে ড্রপ দিয়ে দেখলাম, ড্রপ খেয়ে উপরে উঠে এল, সাথে ঝুনঝুন শব্দ। এক কথায় একেবারে ফাটাফাটি।
মুচি আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল, আমার খুশি খুশি ভাব দেখে সেও খুশি হয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করল, “এইটা দিয়ে কী করবে?”
“আমার এক বন্ধুকে দিব। জন্মদিনের উপহার।”
“অ।” মুচি মাথা নাড়ল, “তোমার বন্ধু ঝুনঝুন শব্দওয়ালা বল দিয়ে কী করবে?”
“চোখে দেখতে পায় না তো তাই তাকে খেলায় নিতে পারি না। এই বলটা থাকলে খেলায় নিতে পারব।”
“অ” মুচি মাথা নাড়ল।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, “কত দিতে হবে?” আমার বুকটা ভয়ে ধুকধুক করতে লাগল। যদি অনেক বেশি টাকা চেয়ে বসে তা হলে কেমন করে দিব?
মুচি বলল, “কিছু দিতে হবে না।” বলে সে একটা পুরোনো জুতায় পেরেক ঠুকতে শুরু করল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিছু দিতে হবে না?”
“না। তুমি তোমার বন্ধুরে দেও। সে খেলুক।”
“কিন্তু—কিন্তু–আপনার খরচ হয়েছে না? দামি বিদেশী আঠা কিনতে হয়েছে, কতো সময় লেগেছে।”
“ওইগুলা কিছু না। তোমার বন্ধু এইটা দিয়ে খেলবে চিন্তা করলেই আমার আনন্দ হবে। ধরে নাও এই আনন্দটাই আমার মজুরি।”
এইরকম একটা কথা বলার পরে তো আমি তাকে আর টাকা সাধতে পারি। আমি তারপরেও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললাম, “আপনার নাম কী?”
মুচি মানুষটি জুতায় পেরেক ঠোকা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, “নাম দিয়ে কী করবে?”
“না মানে ইয়ে-” আমি নিজেও জানি না নাম দিয়ে কী করব!
মুচি মানুষটি আবার জুতায় পেরেক ঠোকা শুরু করে বলল, “আমাদের নাম থাকা না থাকা সমান কথা। আমার বউ আমাকে ডাকে, হ্যাঁগা, ছেলেমেয়ে ডাকে বাবা, পাবলিক ডাকে এই মুচি। কোনটা চাও, বল?”
আমি তখন বুঝতে পারলাম এই মানুষটা অন্যরকম, তাকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। তাই তখন যেটা সহজ সেটাই করলাম, বললাম, “আপনাকে অনেক থ্যাংকু।–”
মানুষটা তখন মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে তার বড় বড় গোঁফের ভিতর দিয়ে একটু হাসল।
.
আঁখির জন্মদিনে আমরা দল বেঁধে তার বাসায় হাজির হলাম, আমরা সবাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ভালো কাপড় পরে এসেছি। সুজন পর্যন্ত মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে এসেছে, হঠাৎ দেখলে চেনা যায় না। আমরা সবাইকে সবসময় স্কুলের ভিতরে স্কুলের পোশাকে দেখি, এখানে কেউ স্কুলের পোশাক পরে নেই তাই সবাইকে অন্যরকম লাগছে। সবচেয়ে বেশি অন্যরকম লাগছে মেয়েদের-তারা মনে হয় সেজেগুঁজে এসেছে, কাউকেই চিনতে পারি না। আমরা সবাই কিছু না কিছু উপহার নিয়ে এসেছি, কেউ কেউ আমার মতো আলাদা কেউ কেউ রিতু শান্তা সুমির মতো একসাথে। সবাই চেষ্টা করেছে উপহারটাকে সুন্দর করে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজিয়ে আনতে শুধু সুজনের উপহারটা খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো। তার যুক্তিটা ফেলে দেবার মতো না–যত সুন্দর কাগজ দিয়েই মোড়ানো হোক আঁখি তো আর সেটা দেখতে পাবে না।
