মানুষটা আবার তেড়ে গেল কিন্তু ছেলেটা ততক্ষণে দৌড়ে সরে গেছে, অনেকদূর থেকে তার হাসির শব্দ শোনা যেতে থাকে।
টুশি আর তপু দ্রুত সেই জায়গা থেকে চলে গেল–কাবিল কোহকাফী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ চিৎকার করতে চাইছিল, কিন্তু টুশি আর তপু তাকে সেই সুযোগ দিল না।
স্কুলের কাছাকাছি এসে টুশি কাবিল কোহকাফীকে বলল, “তুমি স্কুলের ভিতরে আবার কোনো গোলমাল শুরু করো না যেন।”
কাবিল কোহকাফী বলল, “আমি কখনও কোনো গোলমাল করি না।”
টুশি চোখ পাকিয়ে বলল, “কী বললে, গোলমাল কর না? একটু আগে কী করেছ?”
কাবিল কোহকাফী মুখ শক্ত করে বলল, “এটা গোলমাল হল। একজন পাজি মানুষকে একটু টাইট করা হল–”
টুশি মাথা নাড়ল, বলল, “মনে থাকে যেন স্কুলের ভিতরে তুমি কাউকে টাইট দিতে পারবে না।”
কাবিল কোহকাফী মুখ সুচালো করে বলল, “খুব যদি পাজি হয়–ডাবল গেজ পাজি–তখন আমি যদি শুধু”।
“তুমি কারও গায়ে হাত দিতে পারবে না।”
“হাত দিতে পারব না? একটু ধাক্কা–একটু কাতুকুতু একটু ডলাডলি–”
“উঁহু।” টুশি গম্ভীর মুখে বলল, “তুমি আমাকে কসম খেয়ে বলো কারও গায়ে তুমি হাত দেবে না।”
কাবিল কোহকাফী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে কথা দিচ্ছি।”
“কী কথা দিচ্ছ? স্পষ্ট করে বল।”
কাবিল কোহকাফী বিরক্ত হয়ে বলল, “কথা দিচ্ছি যে কারও গায়ে হাত দেব না।”
“কসম খেয়ে বলো।”
“কসম? কসম খেয়ে কেন বলতে হবে?”
“কারণ তোমাকে আমি চিনি। খাও কসম।”
“ঠিক আছে ঠিক আছে কসম খাচ্ছি।” কাবিল কোহকাফী মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “শাহজাদি দুনিয়ার চোখের ভুরুর কসম, তার রেশমি চুলের কসম, তার গালের তিলের কসম। কোহকাফ নগরের কসম। আসমান জমিনের কসম মুরগির রোস্টের কসম”
টুশি কী করবে বুঝতে না পেরে চোখ কপালে তুলে হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল।
.
তবে কাবিল কোহকাফী তার কথা রেখেছিল, সে স্কুলে কারও গায়ে হাত দেয় নি। স্কুল কম্পাউন্ডের ভেতরে কিছু দোলনা আছে–ছোট ছোট বাচ্চারা সেখানে উঠে আবিষ্কার করল কোনো কারণ ছাড়াই আজ দোলনাগুলো দুলছে। অন্যদিন সেগুলো দুলিয়ে দেবার জন্যে অন্যদের সাধাসাধি করতে হত–আজকে কাউকে বলতেও হচ্ছে না দোলনাগুলো বেশ নিজে নিজেই দুলছে! শুধু তা-ই নয়, কেউ যদি অন্যকে চড়তে না দিয়ে নিজে নিজে বেশিক্ষণ দোলনায় বসে থাকতে চায় তা হলে কেন জানি বসতে পারে না–পিছলে পড়ে যায়। বেশি ছোট বাচ্চা নিজে থেকে উঠতে না পারলেও কীভাবে কীভাবে জানি দোলনায় উঠে যাচ্ছে। ব্যাপারগুলো খুব বিচিত্র, বলা যেতে পারে অবিশ্বাস্য কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চারা সেটা নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাল না। শুধু টুশি আর তপু আসল ব্যাপারটা দেখতে পেল, কাবিল কোহকাফী মহা আনন্দে ছোট বাচ্চাদের সাথে দোলনা নিয়ে খেলছে, দোলনা ধাক্কা দিচ্ছে, ছোটদের দোলনায় তুলে দিচ্ছে, যারা বেশি সময় ধরে দোলনায় বসে আছে তাদের। নামিয়ে দিচ্ছে–কেউ তাকে দেখছে না, শুধু তার মজার কাজকর্মগুলো টের পাচ্ছে। বয়স্ক কোনো মানুষ হলে হয়তো ঘাবড়ে যেত কিন্তু ছোট হওয়ার অনেক মজা কেউই ব্যাপারটি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।
আরও কিছু বিচিত্র ব্যাপার ঘটল–যেটা কেউই ঠিক বুঝতে পারল না। যেমন তপুর কথায় একটু তোতলামো আছে বলে ক্লাসের দুষ্টু ছেলেরা তাকে নিয়মিতভাবে ভ্যাংচায়, আজ হঠাৎ করে তাদের বিপদ হয়ে গেল। যেমন বাইরে ছোটাছুটি করে। সবাই কুমির কুমির খেলছে, তপু লাফ দিয়ে সিঁড়িতে উঠে বলল, “আমি ডা-ডা ডাঙায়–”
তাকে ঠাট্টা করে সাদিব নামে ছেলেটা দাঁত বের করে হেসে বলল, “ডা-ডা ডাঙা ভা-ভা-ভাঙা– ডা-ডা-ডাঙা ভা-ভা-ভাঙা–”
সাথে সাথে খুব একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটে যায়, সাদিবের মনে হল তার শার্টের কলার ধরে কেউ যেন উপরে তুলে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিচে নামিয়ে দিয়েছে। সে যা ভয় পেল সেটি আর বলার মতো নয়। একটু পর খেলতে খেলতে তপু যখন মাঠে নেমে চিৎকার করে বলল, “কু-কু-কুমির তোর জলে নেমেছি” তখন তাদের ক্লাসের পাজি একটা মেয়ে, নাম শাওন, মুখ ভেংচে বলল, “কু-কু কুমির কু-কু-কুমির–”
হঠাৎ করে শাওনের মনে হল তার বেণিটায় কেউ একটা হ্যাঁচকা টান দিয়েছে, শাওন যন্ত্রণায় চিৎকার করে পিছনে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। সে যত না অবাক হল ভয় পেল তার থেকে অনেক বেশি। সারাদিন এরকম ঘটনা ঘটতে থাকল– তপুকে কেউ টিটকারি করা মাত্র সাথে সাথে তার শাস্তি পেয়ে যায় এবং দিনের শেষে আর কেউ তপুকে নিয়ে টিটকারি করার সাহস পেল না। ব্যাপারটা টুশি এবং তপু দুজনেই লক্ষ করেছে–তপুর যা আনন্দ হল সেটা আর বলার মতো নয় কিন্তু টুশি ব্যাপারটাকে একেবারেই ভালো চোখে দেখল না। কাবিল কোহকাফীকে এক কোনায় ঠেলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমি বলেছ তুমি কারও গায়ে হাত দেবে না।”
কাবিল কোহকাফী বুকে থাবা দিয়ে বলল, “আমি কারও গায়ে হাত দেই নাই।”
“একটু আগে তুমি একটা মেয়ের বেণি ধরে টান দিয়েছ।”
“বেণি হচ্ছে চুল–আমি চুলে হাত দিয়েছি গায়ে হাত দেই নাই”
এই নিয়ে তর্ক করা যেত কিন্তু ঠিক সেই সময়ে ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে গেল। টুশি ক্লাসে যাবার সময় ফিসফিস করে বলল, “দ্যাখো–তুমি যদি আমার ক্লাসে ঢোকো ভালো হবে না কিন্তু।”
কাবিল কোহকাফীর চোখ উত্তেজনায় চকচক করে উঠল, সে দুই পা এগিয়ে এসে আগ্রহ নিয়ে বলল, “কেন? ক্লাসে ঢুকলে কী হবে?”
