টুকরি মাথায় মানুষের সাথে ধাক্কা থেকেও চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল যখন আট দশ বছরের কয়েকটা বাচ্চা কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে কোথা থেকে ছুটে এল এবং তাদের মাঝে একজন অদৃশ্য কাবিল কোহকাফীর ভেতর দিয়ে বের হয়ে। যাবার চেষ্টা করল। বাচ্চাটা আরেকটু হলে আছাড় খেয়ে পড়ত, কিন্তু কাবিল কোহকাফী তাকে ঠিক সময়ে ধরে ফেলে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেয়। কাবিল কোহকাফীকে দেখতে পাচ্ছে বলে ব্যাপারটি টুশি আর অপুর কাছে মোটেও অস্বাভাবিক মনে না হলেও অন্য বাচ্চাগুলোর চোখ গোল আলুর মতো বড় হয়ে। যায়। তারা দেখল বাচ্চাটি আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়ার শেষ মুহূর্তে হঠাৎ ম্যাজিকের মতো সোজা হয়ে আকাশের দিকে উঠে মাটিতে দু-পায়ের ওপর। দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটি কীভাবে সম্ভব কেউ সেটা বুঝতে পারল না।
কাবিল কোহকাফীকে সাথে নিয়ে গেলে এরকম আরও কত কী ঘটবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, তাই তারা তাড়াতাড়ি স্কুলে যাবার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু বড় রাস্তায় এসে কাবিল কোহকাফীকে নড়ানো খুব মুশকিল হয়ে যায়। সে এর আগে কখনও গাড়ি দেখে নি এবং রাস্তার গাড়িগুলোর দিকে সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। চোখ কপালে তুলে বলল, “ইয়া মাবুদ! এটা কী তেলেসমাতি!”
টুশি কাবিলের দিকে না তাকিয়ে বলল, “এইটা তেলেসমাতি না। এইটার নাম গাড়ি।”
“চলে কেমন করে? ঘোড়াগুলো কোথায় ঢুকিয়েছে?”
টুশি মাথা নেড়ে বলল, “এর মাঝে কোনো ঘোড়া নাই। এগুলো ইঞ্জিন দিয়ে চলে।”
“ইঞ্জিন! সেগুলো আবার কীরকম জানোয়ার? কখনও নামও শুনি নাই। কোন দেশে পাওয়া যায়?”
“এগুলো কোনো জন্তু-জানোয়ার না। এগুলো মেশিন!”
“কী আশ্চর্য!” কাবিল কোহকাফী চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে থেকে বলল, “কী আচানক ব্যাপার!”
টুশি কাবিল কোহকাফীকে খোঁচা দিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি চলো, তা না হলে স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।”
দুই-দুইবার ধাক্কা খেয়ে কাবিল কোহকাফী এবারে মানুষের ধাক্কা বাঁচিয়ে খুব সাবধানে যেতে থাকে, তার পরেও একজন অন্ধ ফকির, একজন হকার আর একজন ট্রাফিক পুলিশের সাথে ছোট মাঝারি আর বড় একটা ধাক্কা লাগিয়ে ফেলল। শুধু যে মানুষের সাথে ধাক্কা লাগিয়েই গোলমাল পাকাল তা নয়, একেবারে নিজে নিজেও সে একটা গোলমাল পাকাল। সেটা শুরু হল এভাবে।
একজন খুব সেজেগুজে থাকা ফিটফাট মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে জুতো পালিশ করাচ্ছে, জুতো পালিশ করছে একটা ছোট ছেলে। ছেলেটা খুব যত্ন করে জুতো পালিশ করে সেটা চকচকে একটা আয়নার মতো করে ফেলেছে। মানুষটা। দেখে খুব খুশি হয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে একটা ময়লা নোট ছুঁড়ে দিল। ছেলেটা চোখ কপালে তুলে বলল, “স্যার এইটা কী দিলেন?”
ফিটফাট মানুষটা বলল, “যা যা বেটা ভাগ! যা দিয়েছি বেশি দিয়েছি।”
“বেশি দিয়েছেন?” ছেলেটা রেগে বলল, “এইটা বেশি হল?”
মানুষটা রেগে এবারে ছেলেটার মাথায় একটা চটি মেরে বলল, “চুপ কর ছোটলোকের বাচ্চা। চড় মেরে দাঁত ভেঙে ফেলব।”
ছোট ছেলেটার মনে হয় বেশ তেজ আছে, তেরিয়া হয়ে বলল, “কী বললেন? আমি ছোটলোকের বাচ্চা? এতক্ষণ ধরে জুতো পালিশ করলাম আর এই ছেঁড়া একটা নোট দিয়ে আমারে বলেন ছোটলোকের বাচ্চা? কে আসলে ছোটলোকের বাচ্চা?”
ফিটফাট মানুষটা এবারে হুংকার দিয়ে বলল, “তবে রে হারামজাদা–” তারপর পা তুলে সে ছোট ছেলেটাকে কষে একটা লাথি মেরে বসল–অন্তত সে তা-ই ভাবল। আসলে অবশ্যি সেটা ঘটল না, কারণ কাবিল কোহকাফী বিদ্যুদ্বেগে মাঝখানে গিয়ে তার লাথিটা ফেরাল, তারপর টুশি আর তপু কিছু বোঝার আগে মানুষটার বুকের কাপড় ধরে ওপরে তুলে তাকে পিছনে ছুঁড়ে ফেলে দিল। টুশি এবং তপুর কাছে মনে হল কাজটি ভয়ংকর কিন্তু অন্য সবার কাছে মনে হল কাজটি অবিশ্বাস্য রকমের হাস্যকর। তারা কেউ কাবিল কোহকাফীকে দেখেনি, তারা দেখেছে ফিটফাট একটা মানুষ ছোট একটা বাচ্চাকে লাথি মারতে গিয়ে হঠাৎ মাঝখানে তার পা ব্রেক কষেছে, তারপর হঠাৎ করে রকেটের মতো সে উপরে উঠে গিয়ে উলটো দিকে ডাইভ দিয়ে কাদা-পানির মাঝে উলটো হয়ে পড়েছে। কোনো মানুষ কাদায় পিছলে পড়লে হাসা উচিত নয় জেনেও সবাই হেসে ফেলে–এখানে ফিটফাট একটা মানুষ নিজে থেকে একটা হাস্যকর ভঙ্গিতে উলটোভাবে কাদার মাঝে লাফিয়ে পড়েছে মানুষজন হাসতেই পারে। আশপাশে যারা ছিল সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করে দেয়। সবচেয়ে জোরে হাসল জুতো পালিশ করা ছেলেটা–সে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে হাসতে হাসতে মাটিতে লুটোপুটি খেতে থাকে।
ফিটফাট মানুষটা, যে আর ফিটফাট নেই, কোনোমতে কাদা থেকে উঠে ছেলেটার দিকে তেড়ে আসছিল, তখন রাস্তার লোকজন তাকে থামায়–একজন বলল, “ভাই! আপনি জোকারি করে কাদার মাঝে লাফাচ্ছেন–পোলাপান হাসবে না? হাসার কাজ করলে তো তোক হাসবেই।”
মানুষটা মুখ খিঁচিয়ে বলল, “আমি লাফ দেই নাই–আমাকে ধাক্কা মেরেছে।”
“কে ধাক্কা মেরেছে? বাতাস?”
মানুষটা এর কোনো উত্তর দিতে পারল না, রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। জুতো পালিশ করা ছেলেটা একটু নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে চিৎকার করে বলল, “গরিবের বন্ধু হচ্ছে আল্লাহ্! আপনি গরিবকে ঠকিয়েছেন তাই আল্লাহ্ আপনার শাস্তি দিয়েছে!” ছেলেটার চোখেমুখে অবশ্যি ঠকে যাওয়ার কোনো চিহ্ন দেখা গেল না, সবগুলো দাঁত বের করে হেসে বলল, “খোদার কসম স্যার আপনি যে সার্কাস দেখাইলেন চাইনিজ সার্কেও সেটা দেখাতে পারবে না।”
