টুশি দুর্বলভাবে চেষ্টা করল, বলল, “তুমি আমাকে কথা দিয়েছ–”
“আমি কথা দিয়েছি কারও গায়ে হাত দেব না।” কাবিল কোহকাফী চোখ নাচিয়ে বলল, “কিন্তু আমি তোমার ক্লাসে ঢুকব না সেটা তো কথা দিই নাই।”
টুশি রেগেমেগে কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক তখন টুশির ক্লাসের একটি মেয়ে টুশির দিকে অবাক হয়ে বলল, “তুমি একা একা কথা বলছ কেন?”
টুশি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা চোখে বলল, “আমার যখন খুব মেজাজ খারাপ হয় তখন আমি নিজে নিজে কথা বলি।”
মেয়েটা, যে ক্লাসের মাঝে সবচেয়ে সুন্দরী কিন্তু যে সারা ক্লাসের মাঝে সবচেয়ে পাজি, যার নাম ফারিয়া, একেবারে নায়িকাদের মতো ঢং করে খিলখিল করে হেসে বলল, “ও মা! তোমার চেহারা যেরকম অদ্ভুত তোমার স্বভাবও সেরকম অদ্ভুত!”
কাবিল কোহকাফী ফারিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, টুশি দাঁতে দাঁত ঘষে ফিসফিস করে বলল, “খবরদার কাবিল কোহকাফী।”
ফারিয়া বলল, “কী বলছ?”
টুশি চোখ লাল করে বলল, “কিছু বলি নাই।”
০৮. বিজ্ঞান ক্লাস
বিজ্ঞান ক্লাসে রেহানা আপা আজকে নানারকম জিনিসপত্র নিয়ে ঢুকলেন। টেবিলে সেগুলো সাজিয়ে রাখতে রাখতে গম্ভীর মুখে বললেন, “আজকে তোমাদের বিজ্ঞানের সৌন্দর্য দেখাব।”
রেহানা আপা টুশিদের বিজ্ঞান পড়ান। তার চেহারা খুব সুন্দর, ফরসা রং ফাঁপানো চুল, টানা-টানা চোখ। মানুষের চেহারা সুন্দর হলেই প্রথমে সবাই তাকে পছন্দ করে ফেলে, ধরেই নেয় তার চেহারা যেরকম সুন্দর মনটাও নিশ্চয়ই সেরকম সুন্দর–কিন্তু দেখা গেছে সেটা সবসময় সত্যি হয় না। রেহানা আপা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন কিন্তু সেগুলো বলেন শুধু তার পছন্দের ছেলেমেয়েদের সাথে। এমনিতে মানুষটা কেমন যেন নিষ্ঠুর প্রকৃতির–সবাই তাঁকে কেমন যেন ভয় পায়। তাই যখন টেবিলে নানারকম জিনিসপত্র রেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে বিজ্ঞানের সৌন্দর্যের কথা বললেন তখন ক্লাসের কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু ফারিয়া খিলখিল করে হেসে বলল, “বিজ্ঞানের সৌন্দর্য হয় নাকি আপা? আমি শুধু ভাবতাম যে মানুষের চেহারায় সৌন্দর্য হয়।”
টুশি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না যে কেউ এরকম গাধার মতো একটা কথা বলতে পারে। কিন্তু রেহানা আপার কাছে সেটা গাধার মতো কথা মনে হল না। আপাও খুব মধুর হাসি দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ ফারিয়া, ফুলের যেরকম সৌন্দর্য আছে, চেহারার যেরকম সৌন্দর্য আছে ঠিক সেরকম বিজ্ঞানেরও একটা সৌন্দর্য আছে।”
টুশি দাঁতে দাঁত চেপে একটা নিশ্বাস ফেলল, একজন টিচার কীভাবে এরকম কথা বলে? চেহারার সৌন্দর্যের কথা নয়, বলা উচিত ছিল মানুষের ভেতরকার সৌন্দর্যের কথা–চরিত্রের সৌন্দর্যের কথা। কিন্তু রেহানা আপা মনে হয় সেগুলোর কথা জানেনই না।
রেহানা আপা টেবিলে একটা চুম্বক, একটা পেন্ডুলাম, বিকারে একটু পানি, একটা মোমবাতি, কিছু মার্বেল, মার্কার পেন্সিল এসব সাজিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, “বিজ্ঞান পড়ার আগে বিজ্ঞানকে জানতে হয়–বিজ্ঞানকে বুঝতে হয়। বিজ্ঞানকে অনুভব করতে হয়।”
ক্লাসের সবাই একটু উসখুস করে বসল, এখন না রেহানা আপা আবার গভীর জ্ঞানের একটা প্রশ্ন করে বসেন। মনে-মনে সবাই যেটা ভয় পাচ্ছিল তা-ই হল, রেহানা আপা জিজ্ঞেস করলেন, “বলো দেখি বিজ্ঞান বলতে আমরা কী বুঝি?”
টুশি তাড়াতাড়ি চিন্তা করে মনে-মনে উত্তরটা ঠিক করার চেষ্টা করল কিন্তু রেহানা আপা তার দিকে তাকালেন না, কখনোই তার দিকে তাকান না। ক্লাসের পিছনের দিকে বসে থাকা হাবাগোবা টাইপের শাফকাতকে জিজ্ঞেস করলেন। শাফকাত দাঁড়িয়ে মাথা চুলকে বলল, “হ্যাঁ ইয়ে মানে–যেটা দিয়ে মানে মেশিন টেশিন বানায় মানে হচ্ছে গিয়ে”
রেহানা আপা গর্জন করে বললেন, “গাধা কোথাকার!” তারপর মুখ ভেংচে বললেন, “যেটা দিয়ে মেশিন বানায়! বুদ্ধির চেঁকি। বসো।”
শাফকাত চট করে বসে পড়ল, টুশি একবার ভাবল হাত তোলে, কিন্তু সাহস হল না–উত্তরটা পছন্দ না হলে তার আরও খারাপ গালি শুনতে হবে। তার গায়ের রং নিয়ে চেহারা নিয়ে খোটা দেয়া হবে। রেহানা আপা কঠিন মুখে সারা ক্লাসের উপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে ফারিয়ার দিকে তাকালেন, তখন তাঁর কঠিন মুখ নরম হয়ে গেল, চোখ হাসি-হাসি হয়ে উঠল। আপা জিজ্ঞেস করলেন, “ফারিয়া, তুমি বলো দেখি বিজ্ঞানটা কী?”
ফারিয়া নেকু নেকু ভাব করে নায়িকাদের মতো চুল পিছনে সরিয়ে বলল, “টেলিভিশন লাইট এইসব হচ্ছে বিজ্ঞান।”
টুশি অপেক্ষা করে রইল দেখার জন্যে রেহানা আপা কী বলেন। শাফকাতকে যদি গাধা আর বুদ্ধির ঢেঁকি বলা হয় তা হলে ফারিয়াকে কমপক্ষে ছাগল আর বেকুব ডাকা উচিত। কিন্তু রেহানা আপা সেটা ডাকলেন না। কষ্ট করে মুখে হাসিটা ধরে রেখে বললেন, “ভেরি গুড ফারিয়া–তুমি বিজ্ঞানের আবিষ্কারের চমৎকার দুইটা উদাহরণ দিয়েছ। একটা জিনিস বোঝার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে উদাহরণ দিয়ে বোঝা। টেলিভিশন আর লাইট–এই দুটি হচ্ছে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ। ভেরি গুড।” ।
রেহানা আপার কথা শুনে ফারিয়ার চোখমুখ আনন্দে ঝলমল করতে লাগল, গাধা মেয়েটা জানতেও পারল না যে সে কী বোকার মতো কথা বলেছে।
রেহানা আপা এবারে টেবিল থেকে একটা চুম্বক তুলে বললেন, “এই যে ছেলে এবং মেয়েরা, আমার হাতে আছে একটা চুম্বক। চুম্বক দিয়ে কী হয় বলো দেখি?”
