চাচাকে কেন জানি হঠাৎ খুব খুশি মনে হল। দুলে দুলে হেসে বললেন, “এখন বুঝেছ তপু কেন তোতলা হয়েছে?”
“কেন?”
“ফ্যামিলিগত ব্যাপার। তুমি তোতলা, তোমার ছেলেও তোতলা।”
“আমি মোটেও তোতলা না।”
“তা হলে একটু আগে কথা বলতে পারছিলে না কেন?”
“সেটা অন্য ব্যাপার” চাচি আরও কী-একটা বলতে চাইছিলেন কিন্তু তার । আগেই কাবিল কোহকাফী এসে চাচির মুখ শক্ত করে চেপে ধরল। চাচি প্রাণপণে কথা বলতে চাইলেন কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে শুধু উ উ ধরনের একটা শব্দ বের হল, কোনো কথা বের হল না।
চাচা উল্লসিত হয়ে বললেন, “এই দ্যাখো তুমি আবার তোতলাচ্ছ!”
কাবিল কোহকাফী চাচির মুখটাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, “মনে থাকে যেন লেডি। এই ছোট ছেলেটাকে আপনি যদি উৎপাত করেন আপনার মুখ আমি চেপে ধরে রাখব। আমাকে চেনেন না–হুঁ! আমি হচ্ছি কাবিল বিন মুগাবালি মহিন্দর কোহকাফী।”
চাচি কিংবা চাচা কেউই কাবিল বিন কোহকাফীর কথা শুনতে পেলেন না, কিন্তু ঠিক করে কথা বলতে না পারার জন্যে ছোট একটা ছেলেকে যে যন্ত্রণা দেয়া যায় না হঠাৎ করে সেই জিনিসটা বুঝে গেলেন।
খাবার টেবিলে সবাই নিঃশব্দে খেতে লাগল। খুব ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যেত টুশি এবং তপু চোখের কোনা দিয়ে কাবিল কোহকাফীর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।
বিচিত্র এই জিনটাকে টুশি এবং তপু একসাথে ভালোবেসে ফেলল।
০৭. স্কুল
রাত্রিবেলা কাবিল কোহকাফী টুশি আর তপুর ঘরে ঘুমাল। টুশি তার বালিশটা কাবিল কোহকাফীকে দিয়েছিল, কিন্তু তার জন্যে নরম বিছানায় ব্যবস্থা করা গেল না। কাবিল কোহকাফী ইচ্ছে করলে বাইরের ঘরে সোফায় শুয়ে ঘুমাতে পারে, কিন্তু ভোরবেলা চাচা ঘুম থেকে উঠে সোফায় বসে কিছুক্ষণ টিভি দেখেন–ভুল করে যদি অদৃশ্য কাবিল কোহকাফীর ভুঁড়ির উপর বসে যান তা হলে যা, একটা কেলেঙ্কারি হবে সেটা আর বলার মতো নয়!
টুশি এবং তপু দুজনের ঘুমই হল ছাড়া-ছাড়া তাদের দুজনের কেউ টের পায় নি নাকডাকার ব্যাপরটি এরকম ভয়ংকর হতে পারে। যখনই ঘুমিয়েছে তখনই স্বপ্ন দেখেছে যে তারা একটা প্লেনে করে যাচ্ছে কিংবা একটা সিংহ গর্জন করে তাদের তাড়া করছে কিংবা একটা মিছিলে হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করছে–একটু পরে পরে তাদের ঘুম ভেঙে গেছে আর তারা আবিষ্কার করেছে যে প্লেনের শব্দ, সিংহের গর্জন বা মিছিলের চিৎকারের শব্দ ঘুম ভাঙার পরও শোনা যাচ্ছে– খানিকক্ষণ পর তারা টের পেয়েছে যে সেটা কাবিল কোহকাফীর নাকডাকার শব্দ!
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে টুশি আর তপু তাদের স্কুলের জন্যে রেডি হতে থাকে তখন তারা শুনতে পেল চাচি রান্নাঘর থেকে চিৎকার করছেন, কে নাকি ফ্রিজ থেকে সব রুটি খেয়ে ফেলেছে! এটা নিশ্চয়ই কাবিল কোহকাফীর কাজ–টুশি আর তপু ভয়ে ভয়ে থাকল–ব্যাপারটি নিয়ে চাচা কিংবা চাচি কোনোকিছু সন্দেহ না করে বসেন। কিন্তু সেরকম কিছু হল না, কারণ চাচা বিরক্ত হয়ে চাচিকে বললেন, “কী ভোরবেলা উঠেই তুমি ক্যাটক্যাট শুরু করলে–”
চাচি তখন রেগে আগুন হয়ে বললেন, “কী? আমি ক্যাটক্যাট করি? তোমার এত বড় সাহস”
ব্যস দুজনে খেপে গেলেন এবং তার এক ফাঁকে টুশি আর তপু স্কুলের জন্যে বের হয়ে যায়। তারা মাত্র বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় পা দিয়েছে তখন শুনল কাবিল কোহকাফী পিছন থেকে চিৎকার করতে করতে আসছে, “দাঁড়াও! দাঁড়াও আমিও যাব।”
টুশি আর তপু অবাক হয়ে কাবিল কোহকাফীর দিকে তাকাল, টুশি জিজ্ঞেস করল, “তুমি? তুমি কোথায় যাবে?”
“তোমরা যেখানে যাচ্ছ।”
“আমরা স্কুলে যাচ্ছি।”
“আমিও স্কুলে যাব।”
টুশি মাথা নেড়ে বলল, “বড় মানুষেরা স্কুলে যায় না। স্কুলে যায় ছোট ছেলে মেয়েরা, আর তুমি বড় মানুষও না, তুমি হচ্ছ একটা জিন!”
তপু টুশির হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “টু-টু-টু-শি আপু–”
“কী হল?”
“তু-তু-তুমি এইভাবে কথা বোলো না, স-স-সবাই তোমার দিকে অবাক হয়ে দে-দেখছে।”
টুশির হঠাৎ করে মনে পড়ল যে রাস্তায় যারা যাচ্ছে আসছে তাদের কেউ কাবিল কোহকাফীকে দেখছে না, তাই সে যখন অদৃশ্য কাবিল কোহকাফীর সাথে কথা বলছে তাকে নিশ্চয়ই সবাই ভাবছে মাথা খারাপ! টুশি নিশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিকই বলেছিস।” তারপর আড়চোখে কাবিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা এখন সোজাসুজি তোমার দিকে তাকিয়ে কথাও বলতে পারব না। তা হলে সবাই আমাদের পাগল ভাববে।”
কাবিল কোহকাফী চুটকি বাজিয়ে বলল, “কোনো চিন্তা নাই। আমার দিকে না তাকিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে কথা বলো–আমি শুনে নেব।”
তপু বলল, “টু-টু-টুশি আপু। তাড়াতাড়ি চলো, দে-দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“হ্যাঁ চল।”
কাবিল কোহকাফীও বলল, “চলো।”
টুশি আর তপু সামনে এবং তাদের দুই পা পিছনে কাবিল কোহকাফী হাঁটতে শুরু করে। বড় রাস্তায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে কয়েকটা অঘটন ঘটে গেল, মাথায় টুকরি নিয়ে একজন পুরানো কাগজ শিশি-বোতল নিয়ে যাচ্ছিল, কাবিল কোহকাফীর সাথে ধাক্কা খেয়ে তার পুরানো কাগজের বাণ্ডিল রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল–মানুষটা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে টুকরিতে কাগজের বাণ্ডিল তুলতে তুলতে বলল, “কী আজব কাণ্ড–মনে হল ধাক্কা খেলাম কিন্তু ধাক্কা খাওয়ার কিছু নাই।”
কাবিল মানুষটাকে সাহায্য করার জন্যে আসতে চাইছিল, টুশি নিষেধ করল, সাহায্যের বদলে তখন উলটো ঝামেলা শুরু হয়ে যাবে–মানুষ যখন দেখবে কাগজের বাণ্ডিল নিজে থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে টুকরিতে ঢুকে যাচ্ছে সেটা একটা মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যেতে পারে।
