চাচার মুখ হাঁ হয়ে গেল। চারদিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে বললেন, “এ-এ-এইখানে ছিল!”
“কী ছিল?”
“জরিদার পোশাক। এই লম্বা লম্বা কাটা চুলদাড়ি–”
চাচি চোখ ছোট ছোট করে চাচার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চাচা ফ্যাকাশে মুখে বললেন, “কী হল? তুমি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
চাচি কেমন জানি ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “তোমার শরীর ভালো আছে ইমতিয়াজ?”
চাচা কেমন জানি রেগে উঠলেন, বললেন, “আমার শরীর ভালো থাকবে না কেন? তুমি ভাবছ আমি মিথ্যা কথা বলছি? আমি আসলে দেখি নাই?”
চাচি বললেন, “এই বাথরুমে তাকাও। কোথাও কিছু আছে?”
“না নাই। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি স্পষ্ট দেখেছি।”
“আমি তোমার কথা বিশ্বাস করেছি, সেইজন্যেই বলছি।”
“কী বলছ?”—
“তুমি বিছানায় শুয়ে থাকো। আমি আইসব্যাগটা নিয়ে আসি।”
চাচা মুখ শক্ত করে বললেন, “কেন?”
“তোমার মাথায় দিতে হবে। তোমার নিশ্চয়ই হেলুসিনেশান হচ্ছে। তুমি বিছানায় শুয়ে থাকো। তুমি উলটাপালটা জিনিস দেখছ। এটা ভালো লক্ষণ না।”
“কোনটা ভালো লক্ষণ না?”
“প্রথমে এমনিতে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলে, এখন অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস দেখছ।”
“আমি কোনো অদ্ভুত জিনিস দেখি নাই।” চাচা চিৎকার করে বললেন, “আমি যেটা দেখেছি সেটাই বলেছি।”
চাচি চাচাকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে দিলেন–এক হাজার বছর গোসল না করা কাবিল কোহকাফী এই বিছানায় ঘুমিয়েছে তাই চাদরে বালিশে একটা বোটকা গন্ধ। চাচা দুর্বল গলায় বললেন, “কেমন জানি গন্ধ গন্ধ লাগছে।”
চাচি বললেন, “সব তোমার মনের ভুল। তুমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো।” চাচা চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলেন।
.
দুপুরে খাবার টেবিলে খাওয়া শুরু করার কিছুক্ষণের মাঝেই চাচি হঠাৎ করে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন টেবিলে রাখা সব খাবার শেষ হয়ে গেছে। চাচি ভুরু কুঁচকে চাচার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ডাক্তাররা না বলেছ তুমি কম করে খাবে!”
চাচা মুখ কালো করে বললেন, “আমি কম করেই খাচ্ছি।”
“কম করে খাচ্ছ? সারা সপ্তাহের জন্যে রান্না করেছি তুমি একা সাবাড় করে দিয়েছ।”
চাচা রেগে উঠে বললেন, “আমি কখন খেয়েছি? একটু মুখে দিয়েছি না কি দিই নি”
চাচি টেবিলে রাখা ডেকচি কাত করে দেখিয়ে বললেন, “এই দ্যাখো। দুইটা মুরগি রান্না করেছিলাম, শুধু পাখনার একটা হাড্ডি আছে। তুমি খাওনি তো কে। খেয়েছে?”
টুশি আর তপু শক্ত হয়ে বসে রইল। শুধু তারাই আসল ব্যাপারটি দেখেছে– কাবিল কোহকাফী ঘুরে ঘুরে খাচ্ছে, একটু পরপর টেবিল থেকে খাবার তুলে নিচ্ছে। এক হাজার বছরের অভুক্ত জীনের ক্ষুধা এক দুইদিনে মিটবে বলে মনে হয় না।
চাচি বললেন, “বলো কে খেয়েছে।”
চাচা রেগে চিৎকার করে বললেন, “তুমি খেয়েছ। তুমি।”
ব্যস–সাথে সাথে দুজনের তুমুল ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। ঝগড়াটা একটু জমে ওঠার সাথে সাথে প্রায় নিয়মমাফিক তাদের রাগটা এসে পড়ল তপুর ওপর। চাচা হুংকার দিয়ে বললেন, “কী হল? তুই খাচ্ছিস না কেন?”
তপু বলল, “খা-খা-খাচ্ছি আলু।”
চাচি বললেন, “খবরদার কথা বলবি না, চুপ করে খা।”
তপু কথা বলল না, মাথা নেড়ে চুপচাপ খাবার চেষ্টা করল। কিন্তু তাতে মনে হল চাচির রাগ আরও বেশি হয়ে গেল। চোখ লাল করে বললেন, “কী বলেছি আমি?”
“ব-ব-ব–” ভয় পেয়ে তপুর কথা মুখে আটকে যায়। চাচি তখন আরও হিংস্র হয়ে উঠলেন, চিৎকার করে বললেন, “কী বলেছি আমি?”
তপু অসহায়ভাবে একবার টুশির দিকে তাকিয়ে আবার বলার চেষ্টা করল, “ব ব-ব–বলেছ–খ-খ-খ-” তপুর মুখ লাল হয়ে গেল, ঠিক করে কথা বলার চেষ্টায় তার চোখে পানি এসে যায়, ঠোঁটে কামড় দিয়ে সে প্রাণপণে আবার চেষ্টা করে– “খ-খ-খ “
চাচি চিলের মতো চিৎকার করে বললেন, “কথা বলো ঠিক করে বদমাইশ পাজি ছেলে–”
কাবিল কোহকাফী চাচির দিকে দুই পা এগিয়ে এসে বলল, “এই যে এই যে লেডি, কী করছেন আপনি? দেখছেন না ছেলেটা নার্ভাস–কথা বলতে অসুবিধে হচ্ছে দেখছেন না–”
চাচি কাবিল কোহকাফীকে দেখছেন না, তার কথাও শুনছেন না, ডালের চামুচটা হাতে নিয়ে ওপরে তুলে মারের ভঙ্গি করে আরেকবার গালাগাল করার জন্যে মুখ খুললেন ঠিক তখন কাবিল কোহকাফী চাচির মুখটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরল। চাচি একেবারে হতবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন তিনি মুখ খুলতে পারছেন না, কয়েকবার চেষ্টা করে উঁ উঁ উঁ করে একটু শব্দ করে ছটফট করতে লাগলেন। চাচা অবাক হয়ে বললেন, “কী হয়েছে তোমার? কথা বলছ না কেন?”
কাবিল কোহকাফী চাচির মুখটা একটু ফাঁক করে দুই-একটা শব্দ বলতে দিল, “ক-ক-কথা ব-ব-বলতে পারছি না।” কাবিল কোহকাফী আবার শক্ত করে মুখ চেপে ধরল। চাচি মুখ খোলার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করতে থাকেন কিন্তু কোনো লাভ হয় না। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে, যায় চোখে পানি এসে যায় কিন্তু মুখ থেকে একটি শব্দ বের হয় না।
কাবিল কোহকাফী শেষ পর্যন্ত চাচির মুখ ছেড়ে দিয়ে সরে গেল, হুংকার দিয়ে বলল, “এখন বুঝেছেন কথ না বলতে পারলে কেমন লাগে? বুঝেছেন লেডি?”
চাচি কাবিল কোহকাফীর কথা না শুনতে পারলেও কথা বলতে না পারার কষ্টটা প্রথমবার টের পেলেন। সাবধানে নিজের দুই গালে, চোয়ালে মুখে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, “কী কী সর্বনাশ! ম-ম-মনে হল কেউ মুখ চেপে ধরে রেখেছে কথা বলতে দিচ্ছে না।”
