কাবিল কোহকাফী বলল, “ভয় করবে কেন? আমি ছিলাম না!”
চাচা-চাচি অবশ্যি কাবিল কোহকাফীর কথা শুনতে পেলেন না, টুশি মাথা নেড়ে বললেন, “না চাচি ভয় করে নাই।”
“রাত্রে কী খেয়েছিলে তোমরা?”
“খিচুড়ি বেঁধে নিয়েছিলাম। আর ডিম ভাজা।”
কাবিল কোহকাফী বলল, “ফাস্ট ক্লাস রান্না হয়েছিল!” চাচা-চাচি সেটা শুনলেন না। চাচি বললেন, “ভেরি গুড। আই অ্যাম সরি, হঠাৎ করে আটকা পড়ে গেলাম তাই আসতে পারলাম না।”
টুশি সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় আটকা পড়েছিলেন?”
“মায়ের বাসায়। তপুর নানির শরীরটা ভালো না তো।”
“কী হয়েছে?”
“বয়স হয়েছে তো তাই। মাথায় একটু গোলমালের মতো হয়েছে।”
তপু অবাক হয়ে বলল, “না-না-নানি পা-পাগল হয়ে গেছে?”
চাচি অস্বস্তি নিয়ে বললেন, “না, ঠিক পাগল না তবে
চাচা ভেংচে বললেন, “বুড়ির ভিমরতি হয়েছে। এত বড় প্রপার্টি এতিমখানায় দান করে দেবে। ঢং দেখে বাঁচি না!”
চাচার কথা শুনে কাবিল কোহকাফী দুই পা এগিয়ে এসে বলল, তাতে অসুবিধে কী হয়েছে? একজন মানুষ তার প্রপার্টি দান করতে পারে না?”
চাচা সেই কথা শুনতে পেলেন না, গজগজ করে বললেন, “এতগুলো মানুষ মিলে বোঝালাম, বুড়ি তবু বোঝে না।”
চাচি বললেন, “থাক থাক, বাচ্চাদের সামনে এইসব কথা বলে লাভ নেই।”
কাবিল বুকে থাবা দিয়ে বলল, “আমার সামনে বলো। আমি বাচ্চা না। আমার বয়স এক হাজার দুইশ বাইশ।”
চাচা তার কথা শুনলেন না তাই কিছু বললেন না, কিন্তু কাবিল তাতে শান্ত হল না, সে টেবিলের মাঝখানে একটা থাবা দিয়ে বলল, “কী হল? কথা কানে যায় না?”
চাচা এবং চাচি কাবিলের কথা শুনতে পেলেন না, কিন্তু টেবিলের থাবাটা ঠিকই শুনতে পেলেন, চাচা চমকে উঠে বললেন, “কী হল? টেবিলটা এভাবে শব্দ করে কেঁপে উঠল কেন?”
চাচিও অবাক হয়ে টেবিলটার দিকে তাকালেন, কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “কী জানি!”
টুশি এবারে চেষ্টা করে কাবিল কোহকাফীর চোখের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে পাগলামো করতে নিষেধ করল। কাবিল কোহকাফী চোখ মটকে বলল, “এখন কেমন জব্দ হয়েছ বাছাধন? একটু আগে যে আমাকে বাসা থেকে বের করে দিচ্ছিলে–এখন কেমন জব্দ হয়েছ? তোমার চাচা-চাচিকে আরেকটু শিক্ষা দেব? দেব নাকি?”
টুশি ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে নিষেধ করল। কাবিল কোহকাফী চোখ পাকিয়ে বলল, “আর আমার সাথে বেয়াদপি করবে? করবে বেয়াদপি?”
টুশি তার চাচা-চাচির দৃষ্টি এড়িয়ে মাথা নেড়ে জানাল যে আর বেয়াদপি করবে না।
“মনে থাকে যেন। আমি হচ্ছি কাবিল বিন মুগাবালি মাহিন্দর কোহকাফী। শাহজাদি দুনিয়া আমার জন্যে পাগল ছিল। আমি আসল সোলেমানি জাদু জানি ইচ্ছা করলে মন্ত্র পড়ে সবাইকে টিকটিকি বানিয়ে দিতে পারি। আমার সাথে বেয়াদপি করলে খবর আছে! আর আমাকে বাসা থেকে বের করে দেবে?”
টুশি এবং তপু মাথা নাড়ল–এবারে চাচা-চাচির দৃষ্টি এড়াতে পারল না। চাচি ভুরু কুঁচকে বললেন, “এরকম বোকার মতো মাথা নাড়ছ কেন?”
টুশি ঢোক গিলে বলল, “না-মানে ইয়ে–”।
চাচি এবারে বাসার চারদিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, “বাসার এই অবস্থা কেন? মনে হচ্ছে বাসার মাঝে ঝড় হয়ে গেছে। যাও–বাসাটা পরিষ্কার করো!”
টুশি এবং তপু চাচা-চাচির সামনে থেকে সরে গেল। টুশি আর তপু বসার ঘরে বইগুলো শেলফে তুলে টেবিল-ল্যাম্পটাকে সোজা করল, টেবিলটাকে ঠিক জায়গায় রেখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ম্যাগাজিনকে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে লাগল। তখন কাবিল কোহকাফী তাদের ঘরে এসে দাঁড়াল। টুশি ফিসফিস করে বলল, “ঘরটাকে তুমি এই অবস্থা করেছ। তুমি কেন পরিষ্কার করছ না!”
“আমি একটা সম্মানী জিন। আমি ঝাড় দার না।”
“বেশি ঢং করলে চাচা-চাচিকে বলে দেব তোমার কথা!”
কাবিল কোহকাফী মুখ ভেংচে বলল, “বলে দেবে আমার কথা? বলে দাও তা হলে–তারা তোমার কথা বিশ্বাস করবে? তুমি প্রমাণ করতে পারবে যে আমি আসলেই আছি?”
টুশি মাথা চুলকাল, কাবিল কোহকাফী সত্যি কথাই বলেছে। অদৃশ্য কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে তারা একটু অবাক হতে পারে কিন্তু এইখানে একটা অদৃশ্য জিন ঘুরে বেড়াচ্ছে সেটা কখনওই কেউ বিশ্বাস করবে না। জোর করে বললে উলটো ব্যাপার হতে পারে–ভাবতে পারে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। টুশি বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, তোমার কথা কাউকে বলব না। তুমি থাকো। কিন্তু বেশি চিৎকার কোরো না–বেশি লাফঝাঁপ দিও না। বুঝেছ?”
“পুঁচকে মেয়ে, তোমার আমাকে উপদেশ দিতে হবে না। আমি একজন জ্ঞানী জিন। কখন কী করতে হয় আমি জানি। ক্রিটিক্যাল সময়ে আমি রাইট ডিসিশন নিতে পারি। খলিফা হারুন অর রশিদের সময়ে যখন–”
ঠিক তখন তারা শুনতে পেল তপুর আব্বা তার মোটা শরীর নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বাথরুম থেকে বের হয়ে আসছেন, চিৎকার করে বলছেন, “শায়লা, শায়লা দেখে যাও বাথরুমে!”
“কী হয়েছে?”
“বাথরুমে কাটা লম্বা চুলদাড়ি, জরিদার পোশাক–”
টুশি কাবিল কোহকাফীর দিকে তাকাল, ফিসফিস করে বলল, “ক্রিটিক্যাল সময়। রাইট ডিসিশন নাও দেখি!”
কাবিল মাথা চুলকাল, “সর্বনাশ! এখন কী হবে?” তপু বলল, “তো-তোমাকে কেউ দেখে না! তু-তুমি যাও–ওগুলো লুকিয়ে ফেলো। দৌড়াও।”
তপুর কথা শেষ হবার আগেই কাবিল কোহকাফী বাথরুমে ছুটে গেল, চোখের পলকে তার জরিদার পোশাকে কাটা চুলদাড়ি সবকিছু চেঁছে পুছে সরিয়ে নিয়ে চলে এল। কয়েক মুহূর্ত পরে চাচিকে চাচা বাথরুমে নিয়ে গেলেন, সেখানে কী হয় দেখার জন্যে টুশি এবং তপু এবং কাবিল কোহকাফীও হাজির হল। বাথরুমের দরজা খুলে চাচি বাথরুমের ভিতরে চারিদিকে তাকিয়ে বললেন, “কোথায়?”
