তপু মাথা নেড়ে বলল, “না। তু-তুমি ওড়ো নি।”
টুশি কঠিন মুখে বলল, “মাটি থেকে তুমি এক ইঞ্চিও উপরে উঠ নি।”
কাবিল কোহকাফী হাত নেড়ে নেড়ে দৌড়ানো বন্ধ করে বলল, “উপরে উঠি নি? কী আশ্চর্য!”
“হ্যাঁ। তুমিআবার একটা ভড়ং করছ।”
“আসলে অনেকদিন উড়ি নাই তো সেইজন্যে প্র্যাকটিস নাই। শাহজাদি দুনিয়াকে নিয়ে যখন বাগদাদ থেকে কোহকাফ নগরে উড়ে গেলাম”।
টুশি মুখ শক্ত করে দরজার দিকে আঙুল দিয়ে বলল, “আউট। এক্ষুনি আউট। যদি আউট না হও তা হলে আমি আর তপু ধাক্কা দিয়ে তোমাকে আউট করে দেব। তাই না রে তপু?”
তপু বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল।
তবে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার দরকার হল না। কারণ ঠিক সেই সময় বাসার বেল বাজল। বাইরে তপুর আব্ব আর আম্মুর গলায় স্বর শোনা গেল।
টুশি কাবিল কোহকাফীর দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচে বলল, “এখন হয়েছে তো? চাচা-চাচি এসেছেন। তাদের সামনে তোমার জিনগিরি দেখাও। আমি তো ভালো মানুষের মতো তোমাকে খালি বাসা থেকে বের করে দিচ্ছিলাম, তারা তোমাকে নিশ্চয়ই পুলিশে দেবেন!”
কাবিল কোহকাফী ভয়-পাওয়া মুখে কিছু-একটা বলতে চাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই টুশি দরজা খুলে দিয়েছে এবং সেই খোলা দরজা দিয়ে প্রথমে চাচা এবং তার পিছুপিছু চাচি এসে ঢুকলেন।
কাবিল কোহকাফী পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে আছে, চাচা এবং চাচি সোজা তার দিকে এগিয়ে এলেন।
০৬. কোহকাফী এবং চাচা-চাচি
টুশি এবং তপু কী হয় দেখার জন্যে চোখ বিস্ফারিত করে তাকিয়ে রইল। তারা দেখল চাচা সোজা কাবিল কোহকাফীর দিকে এগিয়ে গিয়ে তার সাথে ধাক্কা খেলেন, ধাক্কা খেয়ে কাবিল কোহকাফি এবং চাচা দুইজন দুইদিকে উলটে পড়লেন এবং দুইজনেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন। চাচি চাচাকে ধরে টেনে তুলতে তুলতে বললেন, “কী হয়েছে? কী হয়েছে তোমার?”
চাচা ভয়-পাওয়া ফ্যাকাশে মুখে বললেন, “বুঝতে পারলাম না, হঠাৎ মনে হল কোথায় যেন ধাক্কা খেলাম”
“ধাক্কা খেলে?” চাচি গলা উঁচু করে বললেন, “ফাঁকা ঘরে তুমি কেথায় ধাক্কা খাবে?”
তারা দুজনেই সামনের দিকে তাকায়, টুশি এবং তপু অবাক হয়ে দেখল তাদের দৃষ্টি কাবিল কোহকাফীর উপর দিয়ে ঘুরে সারা ঘর হয়ে ফিরে এল কিন্তু তারা কাবিল কোহকাফীকে দেখতে পেলেন না। কী আশ্চর্য! শুধু তাই না, কাবিল কোহকাফী চাচার সাথে ধাক্কা খেয়ে যে ছিটকে পড়ে যন্ত্রণায় কো কো করে শব্দ করছে সেটাও তাঁরা শুনতে পাচ্ছেন না। তপু কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিল, টুশি তার হাতে চাপ দিয়ে তাকে থামিয়ে দিল–ব্যাপারটা বোঝা দরকার।
চাচা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে কাবিল কোহকাফীর একেবারে গা ঘেঁষে এগিয়ে গেলেন কিন্তু তবু তাকে দেখতে পেলেন না। চাচা একটা চেয়ারে বসে কেমন যেন ভয় পেয়ে চারদিকে তাকাতে লাগলেন। চাচি কঠিন মুখে বললেন, “এখন কেমন লাগছে?”
“কেমনে আবার লাগবে। আমি বলছি কী-একটার সাথে যেন ধাক্কা খেলাম”
“তুমি কোথাও ধাক্কা খাও নাই। তুমি হঠাৎ করে কলাপস করেছ। আমি একশবার করে বলছি খাওয়া কমাও খাওয়া কমাও–তুমি আমার কথা শোন না।” চাচি যখন চাচাকে গালাগাল শুরু করেন সেটা সাধারণত খুব ভয়ংকর ব্যাপার হয়, এবারেও তা-ই হল। চাচি তার খনখনে গলায় বলতে লাগলেন, “খেয়ে খেয়ে খাসির মতো মোটা হয়েছ, ব্লাডপ্রেশার হয়েছে, কোলেস্টেরল হয়েছে, এখন নিশ্চয়ই হার্ট এটাক হয়েছে। নিশ্চয় তুমি হার্ট এটাক হয়ে পড়ে গেছ।”
চাচা দুর্বল গলায় বললেন, “না। আমার হার্ট এটাক হয় নাই।”
“তা হলে কি স্ট্রোক করেছে?”
চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, “স্ট্রোক করবে কেন? তোমার সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি।”
চাচি চোখ-মুখ লাল করে বললেন, “আমার সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি? তুমি হাঁটতে হাঁটতে আছাড় খেয়ে পড়ে যাও আর সেটা নিয়ে কথা বললে আমার বাড়াবাড়ি হয়?”
চাচা কিছু না বলে তাঁর পেটে হাত বুলাতে বুলাতে চারিদিকে তাকাতে লাগলেন।
টুশি আর তপু দেখতে পেল কাবিল কোহকাফী উঠে এসে তাদের একেবারে কাছে এসে চাচা-চাচির ঝগড়া দেখতে দেখতে আনন্দে হাসতে লাগল। তারপর টুশির দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন বিশ্বাস হল যে আমি জিন? দেখছ এরা আমাকে দেখতে পাচ্ছে না? আমার কথাও শুনতে পাচ্ছে না?”
সত্যি সত্যি চাচা-চাচি কাবিল কোহকাফীকে দেখতে পেলেন না, শুনতেও পেলেন না–দুজনে নিজেদের মতো ঝগড়া করতে লাগলেন। কাবিল কোহকাফী বুকে থাবা দিয়ে বলল, “বিশ্বাস হল আমি জিন?”
টুশি কিছু বলল না, তপু মাথা নেড়ে বলল, “বি-বিশ্বাস হয়েছে।”
চাচা এবং চাচি তপুর কথা শুনে তার দিকে ঘুরে তাকালেন, বললেন, “কী বললি? কী বিশ্বাস হয়েছে?”
তবু একেবারে থতমত খেয়ে গেল, এমনিতেই তার কথায় একটু তোতলামো এসে যায় এখন একেবারে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেল, বলল, “না-না-না– মা মা-মা–জি-জি-জি–”
টুশি তাকে রক্ষা করল, বলল, “না চাচি কিছু না। আমি বলেছিলাম আপনারা সকালবেলাতেই চলে আসবেন, তপু আমার কথা বিশ্বাস করে নাই। এখন জিজ্ঞেস করছিলাম আমার কথা বিশ্বাস হয়েছে কি না–তাই বলছিল বিশ্বাস হয়েছে। তা ই না রে তপু?”
তপু বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে খুব জোরে জোরে মাথা নাড়ল। চাচি এবারে চাচার পাশে একটা চেয়ারে বসে দুজনের দিকে প্রথমবার ভালো করে তাকালেন। বেশ চেষ্টা করে গলাটা একটু নরম করে বললেন, “রাত্রিবলা একা একা থাকতে ভয় করেছিল?”।
