টুশি বলল, “একশবার শোনে।”
“তা হলে সেই আগের যুগে শুনত। আজকাল শোনে না।”
টুশি বলল, “তা হলে তোমাকে কোনো হুকুম করা যাবে না?”
“নাহ্।”
টুশি রেগে গিয়ে বলল, “আমার কী মনে হয় জান?”
“কী?”
“তুমি আসলে জিন না–তুমি মানুষও না, তুমি হচ্ছ সন্ত্রাসী। তুমি এই বাসায় ডাকাতি করতে এসেছ। তোমার দলের আরও লোকজন আছে তারাও ডাকাতি করতে রেডি হচ্ছে। তোমার একটা অন্য নামও আছে, খচ্চর কাবিল কিংবা পিচ্চি মহিন্দর কিংবা ট্যারা কোহকাফী”
টুশির কথা শুনে কাবিল খুব রেগে গেল, চিৎকার করে বলল, “কক্ষনো না। আমার নাম খচ্চর কাবিল না। আমি জিন। হান্ড্রেড পার্সেন্ট খাঁটি জিন।”
টুশি বলল, “কী প্রমাণ আছ যে তুমি জিন দেখাও একটা প্রমাণ। দেখাও।”
“কী প্রমাণ চাও?”
“এক ঘড়া সোনার মোহর নিয়ে এসো।”
“সোনার মোহর?” কাবিল কোহকাফী মুখ ভেংচে বলল, “আমার আর খেয়েদেয়ে কাজ নাই, এখন আমি তোমার জন্যে জঙ্গলে জঙ্গলে সোনা খুঁজে বেড়াই!”
তপু টুশির হাত ধরে বলল, “না টু-টুশি আপু। বলে একটা ক-ক কম্পিউটার।”
“হ্যাঁ। টুশি মাথা নাড়ল। ঠিক বলেছিস, একটা কম্পিউটার নিয়ে আসো।”
কাবিল কোহকাফী বুকে থাবা দিয়ে বলল, “আমি একটা জিন, আমি চোর না। তোমার জন্যে আমি চুরিচামারি করে জিনিস আনব? আমার আর কাজ নাই?”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, ঠিক আছে।” টুশি বিচিত্র সেই বোতলটা নিয়ে এসে বলল, “তুমি তা হলে আবার এই বোতলের ভিতর ঢোকো।”
কাবিল কোহকাফী হা হা করে হেসে বলল, “তুমি আমাকে বেকুব পেয়েছ? শাহজাদি দুনিয়া এই ট্রিক্স করে আমাকে বোতলের ভিতরে ঢুকিয়েছিল। জিনেরা এত বোকা না, তারা এক ভুল দুইবার করে না!”
“তার মানে তুমি কোনো প্রমাণ দিতে পারবে না যে তুমি জিন। জিনেরা কত রকম অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করে, তুমি তার কিছুই করতে পার না। তুমি সত্যিকারের জিন হলে সেগুলি করতে পারতে।” কথা শেষ করে টুশি তপুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তাই না রে তপু?”।
তপু আবার বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল। কাবিল কোহকাফী এবার হেঁটে ডাইনিং টেবিলের কাছে গিয়ে সেটার উপর প্রচণ্ড থাবা দিয়ে বলল, “অবশ্যই আমি অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করতে পারি।”
টুশিও কাবিল কোহকাফীর পিছনে পিছনে গিয়ে টেবিলে সমান জোরে থাবা দিয়ে বলল, “কী করতে পার?”
“আমি বাতাসে উড়তে পারি। জাদু দিয়ে মানুষকে টিকটিকে বানাতে পারি। মন্ত্র পড়ে লোহাকে সোনা বানাতে পারি।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে পরীক্ষা হয়ে যাক!” টুশি তপুর দিকে তাকিয়ে বললো, “তপু যা তো লোহার কিছু-একটা নিয়ে আয়।”
তপু প্রায় ছুটে গিয়ে তার আব্দুর টুল-বক্স থেকে বড় একটা হাতুড়ি নিয়ে এল। সেটাকে ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে বলল, “এ-এ-এটাকে সোনা বানাও।”
কাবিল কোহকাফী তার পাঞ্জাবির হাত গুটিয়ে খুব গম্ভীর মুখ করে এগিয়ে এল। হাতুড়িটার দিকে তাকিয়ে হাত-পা নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে শরীর দুলিয়ে সে মন্ত্র পড়তে শুরু করে,
“অজটং ভজটং লোহাটং সোনা
সোনাটং সোনাটং লোহাটং মোনা
টুকুল টুকুলি মুকুলি ঘাস
ঝুককুর মুককুর পেটাটুং ফাস”
হঠাৎ মনে হল সে মন্ত্রটা ভুলে গেছে। কয়েকবার চেষ্টা করে মাথা চুলকে। বলল, “ফাসটুলি মাসটুলি এ্যা–ইয়ে মানে ভোম্বাটুলি লাশ।” তারপর চোখ বন্ধ করে হাতুড়িতে ফুঁ দিয়ে বলল, “হয়েছে?”
টুশি বলল, “না, হয় নাই।”
“হয় নাই?” কাবিল কোহকাফী খুব অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “কী আশ্চর্য!”
“এর মাঝে আশ্চর্যের কিছু নাই। তুমি একটা ভড়ং করেছ আর কিছু না।”
“আমি মোটেও ভড়ং করি না।”
টুশি রেগে বলল, “তা হলে?”
“আসলে মন্ত্রের শেষ লাইনটা ভুলে গেছি। অনেকদিন প্র্যাকটিস করি নাই তো সেজন্যে মনে নাই। শেষ লাইনটা হবে মাসটুলি ফাঁসটুলি–”।
টুশি বাধা দিয়ে বলল, “থাক থাক । অনেক হয়েছে। তোমার আর মন্ত্র পড়তে হবে না। তার চাইতে আমি একটা কথা বলি তুমি সেটা মন দিয়ে শোনো।”
“কী কথা?”
“আমরা এখন হানড্রেড পার্সেন্ট শিওর যে তুমি একটা ফালতু মানুষ। চোর কিংবা ডাকাত, কোনো একটা বদ মতলব নিয়ে এসেছ। বাসার ভিতরে তুমি কীভাবে এসেছ সেটা আমরা এখনও বুঝতে পারি নাই–কিন্তু সেটা অন্য ব্যাপার। তাই আমি কী ঠিক করেছি জান?”
“কী ঠিক করেছ?”
“আমি এক্ষুনি দারোয়ানকে ডাকব। সে এসে তোমাকে বেঁধে নিয়ে যাবে। আর সেটা যদি না চাও তুমি নিজে নিজে বের হয়ে যাও।”
কাবিল কোহকাফী এত অবাক হল যে সেটা আর বলার মতো নয়। চোখ কপালে তুলে বলল, “তুমি এরকম একটা পুঁচকে মেয়ে আমাকে বের হয়ে যেতে বলছ?”
টুশি মাথা নাড়ল, বলল, “বলছি।” তারপর তপুর দিকে তাকিয়ে বলল,” তপু তুই দরজাটা খুলে দে তো।”
কাবিল কোহকাফী মাথা নেড়ে বলল, “আমাকে তুমি বের করে দিচ্ছ? আমি একজন সম্মানী জিন। তোমাদের একজন মেহমান।”
“যাদেরকে দাওয়াত দিয়ে আনে তারা হচ্ছে মেহমান। তোমাকে এখানে কে দাওয়াত দিয়েছে?”
কাবিল কোহকাফী এবারে সত্যিই একটু কাহিল হয়ে গেল। মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “তা হলে তুমি বিশ্বাস করছ না যে আমি জিন?”
“না।”
“আমি যদি উড়ে দেখাই তা হলে বিশ্বাস করবে?”
“আগে দেখাও।”
কাবিল কোহকাফী ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে ওড়ার জন্যে প্রস্তুত হল। বড় একটা নিশ্বাস নিয়ে দুই পাশে দুইটা হাত নিয়ে হঠাৎ করে পাখির মতো করে হাত ঝাঁপটাতে শুরু করল। হাত ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে সে ঘরের মাঝে দৌড়াতে থাকে, ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সে টেবিল-ল্যাম্পের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। সেখান থেকে উঠে হাত ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে সে শেলফে ধাক্কা খেল, শেলফ থেকে কয়েকটা বই নিচে পড়ে গেল, তার উপর দিয়ে কাবিল কোহকাফী দৌড়ে গেল, মুখে চিৎকার করতে লাগল, “আমি উড়ছি! আমি উড়ছি। এই দ্যাখো আমি উড়ছি।”
