কাবিল হা হা করে বললে, “কই গেল? ঐ মেয়েটা কই গেল? একেবারে শাহজাদি দুনিয়ার মতো দেখতে!”
টুশি বলল, “এইটা সত্যিকারের মেয়ে না। এইটা টেলিভিশনের ছবি। তুমি নিশ্চয়ই ভুল করে এই রিমোটটা টিপে দিয়েছিলে!”
“হ্যাঁ।” কাবিল কোহকাফী মাথা নাড়ল, “টিপে দিতেই বাক্সের ভিতর থেকে একটা লোক আক্রমণ করল!”
টুশি হাসি গোপন করে বলল, “তোমার চিৎকার শুনে যা ভয় পেয়েছিলাম!”
কাবিল বলল, “আমিও ভয় পেয়েছিলাম। কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ বাক্সের ভিতর থেকে পাগলা মানুষ চাকু হাতে ছুটে আসছে! ওহ্!”
“তোমার রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়েছিল?”
“হ্যাঁ। এক হাজার বছর পর হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমালাম। কী আরাম! আহ্! শুধু এই দাড়ি আর চুল–কুট কুট কুট কুট করে। আজকে সব কেটে ফেলব।”
কথা শেষ করেই কাবিল একমুঠি দাড়ি ধরে টেনে তরবারি দিয়ে কাটার চেষ্টা। করতে লাগল। টুশি বলল, “আরে কী করছ। গাল কেটে যাবে তো?”
“দাড়ি কাটতে হলে একটু গাল কাটেই!”
টুশি মাথা নাড়ল, বলল, “না। তরবারি দিয়ে কেউ দাড়ি কাটে না। দাড়ি কাটার জন্যে কাঁচি আছে, রেজর আছে।”
“সেগুলো আবার কী? এই দুনিয়ায় দেখি একটার পর আরেকটা ম্যাজিক!”
কাজেই কাবিল কোহকাফীকে বাথরুমে নিয়ে কাঁচি, রেজর, শোভিং ক্রিম সাবান টুথপেস্ট টুথব্রাশ এইসব দেখিয়ে দিল। কাবিল কোহকাফী সবচেয়ে বেশি অবাক হল পানির ট্যাপ দেখে, ট্যাপ খুললেই পানি বের হয়ে সেটা সে সে বিশ্বাসই করতে পারে না। সে হাঁ হয়ে পানির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর পানিতে হাত দিয়ে আনন্দে হা-হা, করে হাসতে থাকে। চোখ বড় বড় করে টুশি আর তপুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি এক হাজার বছর গোসল করি নাই! এক হাজার বছর!”
টুশি নাক কুঁচকে কাবিল কোহকাফীর দিকে তাকাল, তার শরীর থেকে যে বোটকা গন্ধ বের হচ্ছে এক হাজার বছর গোসল না করলে এরকম গন্ধ হতেই পারে! সে মুখ শক্ত করে বলল, “খুব ভালো করে গোসল করো–এক হাজার বছর গোসল না করা ভালো ব্যাপার না!”
টুশি কাবিল কোহকাফীকে একটা শুকনো তোয়ালে, তপুর আব্দুর একটা ঢিলে পায়জামা আর পাঞ্জাবি দিয়ে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিল।
কাবিন কোহকাফী অনেক হৈচৈ করে ভেতরে চুল দাড়ি কেটে গোসল করতে লাগল। একসময় সাবান চোখে যাওয়ায় সে ভেতর থেকে ভয়ংকর চিৎকার করতে শুরু করে। তখন টুশিকে বলতে হল ভয় পাওয়ার কিছু নেই, পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পরেই ভেতর থেকে কাবিল গলা ফাটিয়ে গান গাইতে লাগল। হঠাৎ করে গান থেমে গেল এবং হুটোপুটির শব্দ শোনা গেল। আবার হুটোপুটি থেমে গিয়ে গানের শব্দ বের হতে লাগল–মনে হতে লাগল ভেতরে কেউ গোসল করছে না, বুঝি কারো সাথে কুস্তি করছে।
শেষ পর্যন্ত বাথরুম থেকে যখন কাবিল কোহকাফী বের হয়ে এল তখন তাকে দেখে টুশি এবং তপু চমৎকৃত হয়ে যায়, দাড়িগোঁফ শেভ করা, মাথার চুল কেটে ছোট করা, একটা পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরে আছে পরিষ্কার ভদ্রলোকের মতো চেহারা। লম্বা চুল, লম্বা দাড়ি, কানে দুল গলায় মালা, হাতে তরবারি জরিদার জাব্বাজোব্বা পরা যে ভয়ংকর জিনকে দেখে রাত্রে তারা ভয় পেয়েছিল সকালবেলার এই কাবিল কোহকাফীর মাঝে তার কোনো চিহ্নই নেই। তাকে দেখে কোনোভাবেই জিন মনে হয় না, সে পুরোপুরি একজন মানুষ এবং তাকে দেখে হঠাৎ টুশির এখন অন্যরকম একটা ভয় হতে লাগল, তার মনে হতে লাগল কাবিল কোহকাফী আসলে জিন না, লে একজন মানুষ, কীভাবে কীভাবে জানি বাসায় ঢুকে গেছে। সে তপুকে ফিসফিস করে বলল, “তপু!”
“কী-কী হয়েছে?”
“আমার কী মনে হচ্ছে জানিস?”
“কী?”
“কাবিল কোহকাফী আসলে জিন না, আসলে একজন মানুষ।”
তপু অবাক হয়ে বলল, “মা-মা-মানুষ হলে বো-বোতলের ভিতর ঢুকেছে কেমন করে?”
“বোতলের ভিতরে কখনও ঢুকে নাই। আমাদের মিথ্যে কথা বলছে। দেখছিস না একেবারে মানুষের মতো!”
রাত্রিবেলা কাবিল কোহকাফীকে দেখে তপু যেরকম ভয় পেয়েছিল এখন তাকে দেখে তার মোটেই সেরকম ভয় লাগছে না, টুশির কথা শুনে সে একেবারে সরাসরি কাবিলকে জিজ্ঞেস করে বসল, বলল, “তু-তুমি আসলে জিন না?”
কাবিল কোহকাফী ভুরু কুঁচকে বলল, “এ্যা! কী বললে?”
“বলেছি তু-তুমি জিন না। তু-তুমি মানুষ।”
কাবিল কোহকাফীকে দেখে মনে হল তপুর কথা শুনে সে খুব অপমানিত হয়েছে। মুখ চোখ লাল করে বলল, “ছি ছি ছি, তুমি কী বলছ? আমি মানুষ কেন হব? আমি জিন?”
এবারে টুশিও তপুর সাথে যোগ দিল, বলল, “আসলে তুমি জিন না, আসলে তুমি মানুষ। রাত্রিবেলা তুমি যখন ওরকম জামাকাপড় পরে ঢং করে লাফঝাঁপ দিয়েছ তখন আমরা ভয় পেয়ে ভেবেছিলাম তুমি জিন! এখন বুঝতে পারছি পুরোটা তোমার অ্যাকটিং। তুমি দাড়ি কেটে গোসল করে পায়জামা পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছ। তুমি একজন মানুষ।”
কাবিল পা কাঁপিয়ে বলল, “আমি জিন।”
টুশিও সমান জোরে পা কাঁপিয়ে বলল, “তুমি মানুষ! আমি আরব্য রজনীর গল্প পড়েছি। আমি জিন ভূতের কিচ্ছা পড়েছি। আমি পড়েছি জিনেরা এসেই সালাম দিয়ে বলে, আমি আপনার বান্দা, হুকুম করুন। তখন যেটাই হুকুম করা হয় সেটাই জিনেরা শোনে।” টুশি তপুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তাই না রে তপু?”
তপু মাথা নাড়ল, টুশি যে-কথাই বলে সে সবসময় সেটাতে মাথা নাড়ে। কিন্তু কাবিল কোহকাফী টুশির কথা মানল না, হাত নেড়ে বলল, “আরে ধুর! বাজে কথা, জিনেরা কখনও কারও হুকুম শোনে না।”
