“এগুলো তিতির পাখির ডিম না, এগুলো মুরগির ডিম।”
“মুরগির ডিম? মুরগির আবার ডিম হয় নাকি?” কাবিল কোহকাফী আবার গগনবিদারী একটা ঢেকুর তুলে লাফ দিয়ে টেবিল থেকে নেমে বলল, “এখন ঘুম।”
টুশি বলল, “ঘুম?”
“হ্যাঁ, এক হাজার বছর ঐ চিপা বোতলের ভিতর আমি আটকা পড়েছিলাম। পেরেছি দাঁড়াতে না পেরেছি বসতে না পেরেছি হাত-পা ছড়িয়ে শুতে।” কাবিল কোহকাফী দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে এক পাক ঘুরে বলল, “আজ আমি দুই : হাত দুই পা ছড়িয়ে ঘুমাব।” কথা বলতে বলতে তার দুই চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। কোনোমতে খোলা রেখে টুশিকে জিজ্ঞেস করল, “বিছানা কোথায়?”
“বিছানা?”
“হ্যাঁ। বালিশ তুলতুলে নরম তো? কোলবালিশ আছে তো? আমি কোলবালিশ ছাড়া কিন্তু ঘুমাতে পারি না।” কাবিল কোহকাফী ঢুলুঢুলু চোখে বলল, “কোথায় বিছানা?”
টুশি কিছু বলার আগেই হঠাৎ করে বেডরুমে চাচা-চাচির বড় বিছানাটা তার চোখে পড়ল। সে টলতে টলতে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল এবং কিছু বোঝার আগেই ধড়াম করে বিছানার মাঝে আছাড় খেয়ে পড়ল। বিছানায় মাথা স্পর্শ করার আগেই সম্ভবত সে ঘুমিয়ে পড়েছিল কারণ এক মুহূর্ত পরেই টুশি আর তপু প্লেনের ইঞ্জিনের গর্জনের মতো তার নাকডাকার শব্দ শুনতে পেল।
টুশি আর তপু কিছুক্ষণ কাবিল কোহকাফীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার বিশাল পেটটা নাকডাকার শব্দের সাথে সাথে একবার উপরে উঠছে একবার নিচে নামছে। চুল দাড়ি গোঁফে খিচুড়ি আর ডিম লেগে আছে। দুই হাত দুই দিকে ছড়ানো, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা জুতো না খুলেই সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তপু ফিসফিস করে বলল, “এ-এ-এখন কী হবে?”
টুশি মাথা চুলকাল, বলল, “পুলিশে খবর দিতে হবে মনে হয়।”
“পু-পু-পুলিশে? কে-কে-কেন?”
“তা হলে কাকে খবর দেব?”
তপু কোনো উত্তর দিল না, অবাক হয়ে কাবিল কোহকাফীর দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করে বলল, “আ-আমি ভেবেছিলাম সত্যিকারের জি-জিন দেখলে ভ ভয় লাগবে। এখন এ-এ-একটুও ভয় লাগছে না।”
“ভয় লাগছে না? এখন যদি চাচা-চাচি আসে? এসে যদি থেকে তাদের বিছানায় খিচুড়ি-মাখা এই জিন এরকম মোটা পেট নিয়ে শুয়ে আছে তখন কী হবে?”
টুশির এই কথা শুনে তপুর মুখ শুকিয়ে গেল। বলল, “স-স-সর্বনাশ! ত-তখন কী হবে?”
“বলেছেন তো আজ রাত্রে আসবেন না। না আসলেই ভালো। কাল সকালে দেখা যাবে।”
“এ-এখন আমরা কী করব?”
“কী আর করব? ঘুমাব।”
“রাত্রে য-যদি জিন জেগে ওঠে?”
“উঠলে উঠবে। যেভাবে ঘুমাচ্ছে মনে হয় উঠবে না।”
তপু মাথা নাড়ল, যেভাবে গভীর ঘুমে কাবিল কোহকাফী অচেতন হয়ে আছে, আজ রাত্রে তার ঘুম ভাঙবে বলে মনে হয় না।
রাত্রিবেলা তপু আর টুশির ঘুম হল ছাড়া ছাড়া। একটু পরেপরে তাদের ঘুম ভেঙে গেল এবং শুনতে পেল পাশের ঘর থেকে প্লেনের ইঞ্জিনের মতো শব্দ করে কাবিল কোহকাফী ঘুমাচ্ছে। টুশি কখনও চিন্তাও করে নি যে সে কোনোদিন একটা জিনকে পাশের ঘরে নিয়ে ঘুমাবে! এই জিন নিয়ে যে তাদের কপালে কত দুর্ভোগ আছে তখনও তারা তার কিছুই জানত না।
০৫. দিনের আলোয়
সকালবেলা ভয়ংকর এক চিৎকার শুনে হঠাৎ করে একসাথে টুশি আর তপু লাফিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল। কয়েক সেকেন্ড লাগল বুঝতে ব্যাপারটা কী–বসার ঘর থেকে কাবিল কোহকাফী চিৎকার করছে, একই সাথে ভয়ের এবং ক্রোধের একধরনের চিৎকার। টুশি এবং তপু একজন আরেকজনের দিকে তাকাল তারপর বিছানা থেকে নেমে একছুটে বসার ঘরে গিয়ে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। টেলিভিশনে একটা মারামারির দৃশ্য দেখাচ্ছে এবং মাঝে মাঝে ভয়ংকর চেহারার একজন মানুষ অস্ত্র-হাতে লাফঝাঁপ করছে, কাবিল কোহকাফী তার সামনে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং টেলিভিশনের সেই মানুষের সাথে যুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। কাবিল কোহকাফী লাফাচ্ছে এবং তরবারি নেড়ে তেড়ে যাচ্ছে, চিৎকার করে বলছে, “খুন করে ফেলব–একেবারে খুন করে ফেলব বেতমিজ! খামোশ! কাছে আসবি না আমার, খবরদার কাছে আসবি না। বেল্লিক-নালায়েক-বদমাইশ—“
টুশি আর তপু বুঝতে পারল কাবিল কোহকাফী টেলিভিশনের দৃশ্যটাকে সত্যি ভাবছে আর সেটা নিয়েই এই ঝামেলা। টুশি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সোফার উপর থেকে রিমোট কন্ট্রোলটা হাতে নিয়ে টিভিটা অফ করে দেয়।
কাবিল কোহকাফী বন্ধ টিভিটার দিকে তাকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিতে থাকে তার চোখমুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে আছে, দুই হাত দিয়ে তরবারিটা শক্ত করে ধরে রেখেছে, মনে হচ্ছে টেলিভিশন থেকে কেউ বের হয়ে এলেই এক কোপে তার গলা আলাদা করে ফেলবে। টুশি আর তপুর দিকে তাকিয়ে কাবিল কোহকাফী বলল, “সাবধান। খুব সাবধান–এই বাক্সের ভিতর থেকে খুন করতে আসছে।”
টুশি বলল, “এই বাক্সের ভিতর থেকে কেউ আসছে না। এটার নাম টেলিভিশন। টেলিভিশনে অনুষ্ঠান হয়, মানুষ সেই অনুষ্ঠান দেখে।”
কাবিল কোহকাফী অবাক হয়ে টুশির দিকে তাকিয়ে রইল, মনে হল সে তার কথা ঠিক বুঝতে পারছে না। টুশি রিমোটটা দেখিয়ে বলল, “এই যে দ্যাখো, এটা দিয়ে টেলিভিশন অন করে।”
টুশি টেলিভিশনটা চালাতেই কাবিল কোহকাফী তরবারিটা ধরে লাফিয়ে উঠল। কিন্তু তখন সেখানে একটা সাবানের বিজ্ঞাপন হচ্ছে, সুন্দরী একটা মেয়ে নেচে নেচে গান গাইছে এবং সেটা দেখে কাবিল কোহকাফীর চোখ গোল গোল হয়ে উঠল। টুশি রিমোট টিপে আবার টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়ে বলল, “এই দ্যাখো এইটা টিপে আবার অফ করে দেয়া যায়।”
