“ডেইলি সাপ্লাই কী, মামা?”
“আমি যদি সেটা জানতাম তাহলে তোকে এসিস্টেন্ট বানালাম কী জন্য? তুই দেখ কী কী লাগবে। পারবি না?”
আমি একটু আঁ উঁ করে বললাম “পারব।”
“গুড। আর রিসার্চের কাজের প্রথমটা হচ্ছে একটা গাইগার কাউন্টার নিয়ে এই পুরো এলাকাটার ম্যাপিং করা।”
আমি মাথা চুলকে বললাম, “গাইগার কাউন্টার কী?”
“গাইগার কাউন্টার হচ্ছে এক ধরনের রেডিয়েশন মনিটর। কোথাও রেডিও একটিভিটি কিছু থাকলে সেটা সিগনাল দেয়।”
“কী রকম সিগনাল?”
“আমার কাছে যেটা আছে সেটা কট কট শব্দ করে। সেটা নিয়ে পুরো এলাকাটা চষে ফেলবি। দেখবি কোথাও বেশি রেডিও একটিভিটি আছে কি নেই।”
“কেমন করে বুঝব কোথায় বেশি কোথায় কম?”
“খুবই সোজা, বেশি রেডিও একটিভিটি হলে বেশি কটকট করবে কম হলে কম করবে।”
“যন্ত্রটা কতো বড় মামা?”
“দাঁড়া তোকে দেখাই।” বলে মামা ভেতরে একটা বাক্স খুলে একটা ছোট যন্ত্র বের করে আনল। একটা টিউবের মতো অংশের পেছনে একটা হাত দিয়ে ধরার জন্য তার উপরে একটা হ্যাঁন্ডেল। চারকোণা উপরে একটা পুরানা আমলের কাটাওয়ালা মিটার লাগানো। দেখে মনে হয় কেউ ঘরে বসে এটা তৈরি করেছে। একটা সস্তা মোবাইল ফোন পর্যন্ত এর থেকে বেশি মডার্ন। এররকম মান্ধাতা আমলের একটা যন্ত্র হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে চিন্তা করে আমার একটু মন খারাপ হলো।
যন্ত্রটার নিচে একটা সুইচ ছিল, মামা সেটা অন করল, তখন যন্ত্রটা কট কট শব্দ করতে লাগল। আমি বললাম, “শব্দ করছে কেন? এইখানে তো কোনো রেডিওএকটিভ কিছু নাই।”
“আছে।” মামা বলল, “সব জায়গায় থাকে। আকাশ থেকে হাই এনার্জি মিউডন আসে। কসমিক রে আসে।”
আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম যে মামা হয়তো এক্ষুণি মিউডন জিনিসটা কী আর কসমিক রে কেমন করে আসে সেটা ব্যাখ্যা করা শুরু করে দেবে। কপাল ভালো সেটা শুরু করে দিল না। বলল, “তোর কাজ হচ্ছে এটা নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখা, কোথাও বেশি কট কট করে কি না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “যদি করে তাহলে কী করব?”
“জায়গাটা চিনে রাখবি। পরে আমি ভালো করে দেখতে যাব। বুঝেছিস?”
“বুঝেছি।” আমি যন্ত্রটা হাতে নিয়ে বললাম, “এটার নামটা ফানি। গাইগার কাউন্টার। কী আজিব।”
মামা বলল, “এর মাঝে তুই আজিব কী দেখলি? যে সায়েন্টিস্ট এটা বানিয়েছে তার নাম ছিল গাইগার।”
আমি বললাম, “টাইগার শুনেছি, গাইগার কখনো শুনি নাই। বাপ মা আরেকটু ভালো একটা নাম দিলেই পারতো।”
“গাইগারের বাবা মায়ের সাথে দেখা হলে সেটা নিয়ে তাদের সাথে তর্ক করিস। এখন বের হবার জন্য রেডি হয়ে নে।”
“কিন্তু তিন নম্বর কাজটা কী সেইটা বললে না?”
“সেটা হচ্ছে সেম্পল নিয়ে আসা।”
“সেম্পল? মানে মাটি, পানি, গাছ, পাতা, মাছ।”
“না, না। এতো কিছু না, শুধু মাটি। আমি সবার সামনে গাছ, পাতা, পানি নিয়ে কথা বলেছিলাম যেন মনে করে আসলেই পরিবেশ দূষণ নিয়ে কাজ করছি।”
“কোথা থেকে মাটি আনব?”
“পাঁচশ মিটার পর পর। ল্যাটিচ্যুড লঙ্গিচ্যুড জানতে হবে। জিপিএসটা নিয়ে যাবি।”
জিপিএসটা কী ঠিক বুঝি নাই কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। তাহলে মামা পুরো জিনিসটা বোঝাতে বোঝাতে মাথা খারাপ করে দেবে। যেটুকু দরকার মামা নিজেই নিশ্চয়ই বলে দেবে।
হলোও তাই, ঠিক যখন বের হব তখন কী কী করতে হবে মামা গুছিয়ে শুধু বলে দিল, একটা নোট বইয়ে লিখেও দিল। মামা যে আসলেই সায়েন্টিস্ট সেটা তার লেখা থেকে বোঝা যায়। মুখে যখন কথা বলে তখন একশটা কথা বলে। লেখার সময় দরকারি কথা ছাড়া একটা বাড়তি কথা লিখে না।
একটু পরেই আমি বের হওয়ার জন্য রেডি হলাম। এক হাতে গাইগার কাউন্টার রেডিওএকটিভিটি মাপার জন্য আরেক হাতে লম্বা একটা লাঠি (কেন আমি জানি না), মাথায় বেস বল ক্যাম্প, (রোদ থেকে বাঁচার জন্য।), পিঠে ব্যাকপেক (ডেইলি সাপ্লাই আনার জন্য), পায়ে টেনিস সু (কাদা মাটি থেকে পা বাঁচানোর জন্য), পকেটে মানি ব্যাগ (ডেইলি সাপ্লাই কেনার জন্য)। যে কেউ আমাকে দেখলে মোটামুটি অবাক হয়ে যাবে। ক্যামেরা থাকলে আপুকে দেখানোর জন্য আর আমার ক্লাসের হিংসুটে ছেলেগুলোকে দেখানোর জন্য একটা ফটো তুলে রাখা যেতো। কিন্তু আফসোস সাথে ক্যামেরা নেই।
আমি হাঁটতে হাঁটতে একটু চিন্তা করলাম। আমাকে যে কাজগুলো করতে হবে তার একটা হচ্ছে একটা দোকান খুঁজে বের করে সেখান থেকে ডেইলি সাপ্লাই কিনে আনা। এই কাজটা ভালো করে করা যাবে যদি মাহবুবকে সাথে নিয়ে যাই। আরেকটা কাজ হচ্ছে কয়েক কেজি করে মাটি তুলে আনা, সেই কাজটাও ভালো করে করা যাবে যদি সাথে মাহবুব, ডোরিন আর টনি থাকে। সবাই মিলে এক সাথে অনেক মাটি আনা যাবে। আমি একা একা যে কাজটা করতে পারব সেটা হচ্ছে গাইগার কাউন্টার দিয়ে এলাকাটা চষে ফেলা। কাজেই আপাতত আমি সেটাই করি। মাহবুব বলেছে সে দশটার দিকে আসবে, এখন বাজে আটটা। তার মানে আমার হাতে দুই ঘণ্টা সময়। দুই ঘণ্টা অনেক সময়, ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার করে হাঁটলে আমি দশ কিলোমিটার হেঁটে ফেলতে পারব।
তাই আমি বুকে ফুঁ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার হাতের গাইগার কাউন্টারটা মাঝে মাঝে কট কট শব্দ করতে লাগল। কোথাও যদি শব্দ বেশি হয় তাহলে আমাকে সেই জায়গাটা চিনে রাখতে হবে। আশা করতে লাগলাম যে কোনো সময় কট কট শব্দটা অনেক বেড়ে যাবে এবং সেই জায়গাটা মামাকে দেখিয়ে অবাক করে দেব।
