সবাই চলে যাবার পর যখন অন্ধকার নেমেছে আমি তখন মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা মামা! তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?”
“কর।”
“তুমি আজকে সবার সামনে আমাকে নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে এতো কথা কেন বলেছ?”
“কোনটা বানিয়ে বলেছি?”
“এই যে আমি হাফ সায়েন্টিস্ট। সব যন্ত্রপাতি চিনি, অপারেট করতে পারি এইসব।”
“তুই যন্ত্রপাতি চালাতে পারিস না? নিশ্চয়ই পারিস।”
“আমি কোন যন্ত্র অপারেট করতে পারি?”
“কেন, দুপুরবেলা মাইক্রোওয়েভ ওভেন চালিয়ে ডিম সিদ্ধ করেছিস মনে নেই?” সেইটা কী একটা যন্ত্র না?”
“যাও মামা, ঠাট্টা করো না।”
“মোটেও ঠাট্টা করছি না। আমার সাথে থাকলে তুই সবকিছু শিখে যাবি। আজকে তোকে ডাটা নেয়া শিখিয়ে দেব। এক ধাক্কায় দুই হাফ সায়েন্টিস্ট হয়ে যাবি। যেটা পরে হবি সেটা একটু আগে বলে দিলাম।”
“কেন?”
“একটা তোর বয়সী মেয়ে এসেছে। এইরকম বয়সে মেয়েদের সামনে একটু নিজেকে জাহির করার ইচ্ছা করে না? তোর পক্ষ হয়ে আমি করে দিলাম।”
আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। মামা মহা আজিব মানুষ।
.
রাত্রে আমরা মাহবুবের মায়ের রান্না করা খাবার খুব শখ করে খেলাম। মামা আমার থেকে বেশি শখ করে খেলো, চেপা ভর্তা জিনিসটা এতো শখ করে খাওয়া যায় কে জানত। মামা যে শুধু শখ করে খেলো তা নয় চেপার উপর একটা বিশাল বক্তৃতা দিল। এটা নাকি খাদ্য সংরক্ষণের একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক, নাম ফারমেন্টেশন টেকনিক। এই দেশের মানুষের আবিষ্কার, খাবারটা ব্যাক্টেরিয়া ধরতে পারবে না। কিন্তু রক্ষা পাবে! দেখে মনে হয় পচে ক্যাতক্যাতা হয়ে গেছে আসলে পচে নাই!
খাওয়া শেষ করে মামা তার গামা রে স্পেকট্রোমিটার দিয়ে কেমন করে ডাটা নিতে হয় শিখিয়ে দিল। পুরো ব্যাপারটা যথেষ্ট জটিল কিন্তু মামা আমাকে যত্ন করে শেখালো। আমি শেখার চেষ্টা করলাম, কী করতে হয় সেগুলো ডাইরিতেও লিখে রাখলাম। মনে হলো সত্যি সত্যি এক ধাক্কাতে আমিও হাফ সায়েন্টিস্ট হয়ে গেছি। কী মজা!
রাত্রে মাইক্রোবাসের মেঝেতে দুটি ক্যাম্প খাট পেতে সেখানে বিছানা করা হলো, খুবই আরামদায়ক বিছানা। সেখানে শুয়ে জঙ্গলে জন্তু জানোয়ার আর পশুপাখির ডাক শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে গেলাম। একটু যে ভয় ভয় করছিল না তা নয়, কিন্তু মামা আছে, তার পিস্তল আছে কাজেই ভয়টা আমাকে বেশি কাবু করতে পারল না।
০৬. পরদিন ভোরবেলা
০৬.
পরদিন ভোরবেলা ঘুম পুরোপুরি ভাঙার আগেই মামা বলল, “আজকে তোর তিনটা কাজ।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী কাজ?”
মামা বলল, “রেডি হয়ে নে, তারপর বলব।”
কাজেই আমি রেডি হতে শুরু করলাম। সকাল ঘুম থেকে উঠে রেডি হওয়ার প্রথম অংশটা হচ্ছে বাথরুম করা। বাসায় আমি শান্তিতে বাথরুম করতে পারি না। বাথরুমে ঢুকলেই আপু দরজা ধাক্কা দিয়ে বলতে থাকে, কী হলো টোপন? এতোক্ষণ লাগে? ঘুমিয়ে গেছিস নাকি? আর কত? বের হ। তাড়াতাড়ি।
এখানে আপু নাই, কিন্তু বাথরুমও নাই। (মাইক্রোবাসের ভিতরে যেটা আছে সেটা নাকি শুধুমাত্র সুপার ইমার্জেন্সির সময় ব্যবহার হবে। কাজেই আমাকে একটা “ইয়ে হাতে নিয়ে গভীর জঙ্গলের ভিতর ঢুকে যেতে হলো। শুধু তাই না পরিবেশ রক্ষা করার জন্য মামা আমার হাতে একটা ছোট খুরপি দিল, কি বেইজ্জতি ব্যাপার। কেউ যদি দেখে ফেলে কী সর্বনাশ হবে!
যাই হোক বাথরুমের পর খুবই অল্প পানি দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আমরা নাস্তা করতে বসলাম। মামা পাউরুটির সাইসের উপর জেলির মতো চেপা ভর্তা লাগিয়ে সেটা মহা আনন্দে খেতে লাগল। আমি শুকনো রুটি চিবিয়ে চিবিয়ে যখন অর্ধেক স্লাইস খেয়ে শেষ করেছি মামা ততক্ষণে চার সুইস খেয়ে ফেলেছে। আমাকে দেখে মামার মনে হলো একটু মায়া হলো, বলল, “দাঁড়া চা বানিয়ে দিই। চাতে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খা, ভালো লাগবে।”
মামা তারপর আলকাতরার মতো কুচকুচে কালো চা বানিয়ে দিল। সেই চা তিতকুটে এবং বিস্বাদ, আমার মনে হয় ইঁদুর মারার বিষ খেতে এর থেকে ভালো। পাউরুটি ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাওয়ার পর আমার মনে হলো পাউরুটির স্লাইসটা পেটের ভিতর কোন জায়গা থেকে কোন জায়গায় যাচ্ছে। সেটাও বাইরে থেকে বলে দেওয়া যাবে।
মামা খুব তৃপ্তি করে তার আলকাতরার মতো চা খেয়ে শেষ করে বলল, “ব্রেকফাস্টের সময় একটা ফল খাওয়া ভালো।”
আমি আশা নিয়ে বললাম, “কোনো ফল আছে, মামা?”
মামা বলল, “দেখি।” তারপর খুঁজে খুঁজে একটা ঝুড়ির ভেতর থেকে। কয়েকটা কলা বের করল। আমি এর আগে কখনো এরকম কুচকুচে কালো কলা দেখি নাই। মামাকে অবশ্যি সেইজন্যে খুব বেশি চিন্তিত দেখা গেল না, কলা ছিলতে ছিলতে বলল, “এর শুধু ছিলকেটা অক্সিডাইজড হওয়ার কারণে কালো হয়ে গেছে। ভিতরে ঠিক আছে।”
আমার অবশ্য ভিতরটাকেও বেশি ঠিক মনে হলো না কেমন যেন ক্যাতক্যাতা নরম। তবে মামাকে খুশি করার জন্য সেটা খেয়ে ফেললাম।
মামা দ্বিতীয় কাপ আলকাতরার মতো চা নিয়ে সেটা খেতে খেতে বলল, “টোপন, তোকে বলেছি আজকে তোর তিনটা কাজ।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী কী কাজ?”
“দুইটা রিসার্চ আর একটা ম্যানেজমেন্ট।”
আমি বাকিটা শোনার জন্য মামার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মামা বলল, “ম্যানেজমেন্টের কাজ হচ্ছে কাছাকাছি গ্রামের একটা দোকান খুঁজে বের করে ডেইলি সাপ্লাই কিনে আনা।”
