আমি টানা আধঘণ্টা হেঁটে গেলাম কিন্তু গাইগার কাউন্টার শব্দ এতটুকু বাড়ল না। আমি আস্তে আস্তে অনুমান করতে শুরু করলাম যে গাইগার কাউন্টারে কট কট শব্দ বেড়ে যাওয়ার কোনো চান্স নেই, বিষয়টা নিশ্চয়ই গুপ্তধন পাওয়ার মতন। আসলে তো আর কেউ সত্যি সত্যি গুপ্তধন খুঁজে পায় না শুধু এর গল্প শোনা যায়, আমারও সেই অবস্থা আমি খালি খুঁজে বেড়াব। কে জানে মামা হয়তো সেটা আগে থেকেই জানে, আমাকে ব্যস্ত রাখার জন্য কোনো একটা ফালতু যন্ত্র আমার হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। এটা হয়তো আসলে গাইগার কাউন্টারই না, অন্য কিছু। কিংবা কে জানে আসলে হয়তো গাইগার কাউন্টার বলে পৃথিবীতে কিছু নাই, মামা বানিয়ে বানিয়ে কিছু একটা বলে আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। পরে যখন বাসায় যাব তখন আমাকে কীভাবে বোকা বানিয়েছে সেটা নিয়ে সবার সাথে গল্প করে হাসাহাসি করবে। মামার অসাধ্য কিছু নাই।
যাই হোক, এখন সেটা নিয়ে কিছু করার নেই। হাঁটতে যখন বের হয়েছি তখন হেঁটেই যাই। কাজেই আমি হাঁটতে থাকলাম। হাতের গাইগার কাউন্টারটা শুরুতে হালকাই ছিল, কিন্তু যতই হাঁটছি এটা ততই ভারি হতে শুরু করেছে। যদি বেশি ভারি হয়ে যায় তাহলে আর হাতে করে টানা যাবে না। পিছনের ব্যাকপেকে রেখে দেব, সেখান থেকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে কটকট শব্দ শোনা যাবে। এটাকে যে হাতে রাখতেই হবে সেটা কে বলেছে? এর কটকট শব্দটা শুনতে পেলেই হলো।
শুধু যে গাইগার কাউন্টারটা আস্তে আস্তে ভারী হতে শুরু করেছে তা নয় রোদটাও কেমন যেন গরম হতে শুরু করেছে। প্রথম প্রথম মিষ্টি একটা রোদ ছিল। সেটা এখন আর যাই হোক মিষ্টি নেই, রীতিমতো ঝাল’ অর্থাৎ গরম!
আশেপাশে কেউ নেই তাই ইচ্ছে করলে শার্ট খুলে খালি গা হয়ে যেতে পারি। শুধু তাই না চিৎকার করে গানও গাইতে পারি কিন্তু আমি সেসব কিছু করলাম না, আমি ঘাড় গুঁজে হাঁটতে লাগলাম।
পুরো এলাকাটা ফাঁকা। মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুত জন্তু জানোয়ার দেখা যায়। ইঁদুরের মতো কিন্তু ইঁদুর নয় সেরকম একটা জন্তুকে তাদের বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। মোটাসোটা একটা গুই সাপ খুবই ধীরে সুস্থে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল, আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কিন্তু ভয় পেল বলে মনে হলো না। পুঁইসাপ যে একটু পরপর জিব বের করে আমি সেটা জানতাম না। জলা জায়গা অনেক ব্যাঙ, কাছাকাছি গেলে এক সাথে পানির মাঝখানে ঝাঁপ দেয়। গাছে অনেক পাখি কিচিরমিচির করছে, তবে পাখি থেকে বেশি মজার জিনিস বানর, এদের হাবভাব এতো মানুষের মতো যে দেখে অবাক হয়ে যাই। একটা বানর আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি দিল, বানর যে পাজি ছেলেদের মতো মুখ ভেংচি দিতে পারে আমি জানতাম না।
আমি গরমে ঘামতে ঘামতে হাঁটতে থাকলাম। একটা বড় হাওড় পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে ফিরে আসতে লাগলাম। মোটামুটি অনেকটুকু জায়গা দেখে ফেলেছি, এর মাঝে কোনো রেডিও একটিভিটি নেই। আমি এখন মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি যে কোথাও কিছু পাওয়া যাবে না। সাইন্টিস্টদের জীবনে কোনো আনন্দ নেই, উত্তেজনা নেই, আছে শুধু রোদের মাঝে হাঁটা, কী আশ্চর্য।
আমি কতক্ষণ হেঁটেছি জানি না, রোদ থেকে বাঁচার জন্য বড় একটা গাছের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার জন্য যাচ্ছিলাম তখন একেবারে ভূতের মতো হঠাৎ করে কোথা থেকে জানি একজন মানুষ বের হয়ে এলো। আমি তাকে দেখে যত অবাক হয়েছি মনে হলো সে আমাকে দেখে তার থেকে বেশি অবাক হয়েছে। সে চমকে উঠে প্রায় চিৎকার করে বলল, “কে? কে তুমি?”
মানুষটাকে হঠাৎ করে দেখে আমি নিজেও চমকে উঠেছিলাম, কয়েক সেকেন্ড লাগল শান্ত হতে। মানুষটার মাথায় টুপি, থুতনির মাঝে একুশ বাইশটা দাড়ি। (যার দাড়ি এতো কম সে কেন দাড়ি রাখে সেটা একটা রহস্য)। মানুষটার কাছে একটা ছাতা, আমাকে দেখে ছাতাটা অস্ত্রের মতো ধরে রেখেছে। বোঝা যাচ্ছে দরকার হলে সে এই অস্ত্র নিয়ে আমাকে আক্রমণ করে ফেলবে। মানুষটার চোখে মুখে কেমন জানি ভয়ের চিহ্ন, আমি তার অর্ধেক সাইজ আমাকে দেখে ভয় পাওয়ার কী আছে বুঝতে পারলাম না। মানুষটা তার ছাতাকে বন্দুকের মতো করে আমার দিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল, “বল, বল। কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ? এখানে কী কর?”।
আমি একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। মানুষটা আমাকে যে প্রশ্নগুলো করেছে তাকে খুশি করার মতো সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার জানা নেই। আমি যেটাই বলব এই মানুষটার কাছে তার কোনো অর্থ নেই। কিন্তু তবু কিছু একটা বলতে হবে, বললাম, “আমি এইখানে ঘুরতে এসেছি।”
মানুষটা উত্তর শুনে খুশি হলো কি না বুঝতে পারলাম না। ছাতাটা বন্দুকের মতো ধরে রেখে কেমন যেন কার্টুনের মতো ছোট ছোট লাফ দিয়ে বলল, “তোমার হাতে অস্ত্র কেন? খবরদার আমার দিকে অস্ত্র ধরবে না।”
আমি একবার খাবি খেলাম, আমার হাতে অস্ত্র? তখন বুঝতে পারলাম আমার হাতের গাইগার কাউন্টারের সামনে যেহেতু একটা টিউব আছে সেই জন্য এটাকে মানুষটা কোনো একটা অস্ত্রের নল ভাবছে। টিউবটা সামনের দিকে মুখ করে আছে তাই মানুষটা ভাবছে অস্ত্রটা তার দিকে তাক করে রেখেছি।
আমি গাইগার কাউন্টারের টিউবটা ঘুরিয়ে বললাম, “এইটা অস্ত্র না।”
