তখন ডোরিনের বাবা নিজের পরিচয় দিল, মামা তার পরিচয় দিল। তারপর বড় মানুষেরা নিজেদের ভিতরে যেভাবে কথা বলে সেভাবে কথা বলতে লাগল। কে কী করে, কোথায় থাকে, কোথায় লেখাপড়া করেছে। এইসব বেদরকারি কথা। কিন্তু এমনভাবে মুখ গম্ভীর করে কথা বলে যে মনে হয় এই কথাগুলো বুঝি খুবই দরকারী কথা। আমরা একটু অধৈর্য হয়ে যাচ্ছিলাম, একটু সরে গিয়ে নিজেরা কথা বলব কী না চিন্তা করছিলাম, তখন মামা আর মেয়েটার বাবা একটু থামল। মেয়েটা তখন মামার মাইক্রোবাসের ভিতরে উঁকি দিয়ে বলল, “এত যন্ত্রপাতি!” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এই সব যন্ত্রপাতি চিনো?”
যদি আশেপাশে মামা না থাকতো তাহলে মুখ গম্ভীর করে বলতাম, ‘হ্যাঁ চিনি। তারপর কোন যন্ত্র কী কাজে লাগে সেটা বানিয়ে বানিয়ে বলতে শুরু করতাম। কিন্তু মামা কাছে দাঁড়িয়ে আছে আমি তো আর সেইটা করতে পারি না। কীভাবে উত্তর দেওয়া যায় চিন্তা করছি তখন মামা বলল, “হ্যাঁ টোপন সব চিনে। টোপন হচ্ছে আমার এসিস্টেন্ট, আমার অনেক যন্ত্র সে অপারেট করতে পারে।”
ডোরিন নামের মেয়েটা চোখ কপালে তুলে বলল, “ও মাই গড! তার মানে তুমিও একজন সায়েন্টিস্ট?”
আমি বললাম, “না, না, আমি সায়েন্টিস্ট না।”
মামা বলল, “আসলে টোপন ছোটখাটো একটা সায়েন্টিস্ট, আমার কাজকর্মে একজন এসিস্টেন্ট দরকার সেইজন্য টোপনকে নিয়ে এসেছি। টোপন খুবই স্মার্ট ছেলে”
আমি মামার দিকে তাকালাম, মামা কেন এভাবে বলছে বুঝতে পারলাম না। আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে কী না কে জানে! কিন্তু গলার স্বরে তো ঠাট্টা করার কোনো ভাব নেই।
মামা গম্ভীর গলায় বলল, “আসার সময় একটা রোড একসিডেন্ট ভিক্টিম ফেমিলি পেয়েছিলাম, সবাইকে আমরা হাসপাতালে নিয়েছি, টোপন খুবই দায়িত্বশীল মানুষের কাজ করেছে।”
ডোরিনের বাবা বলল, “হাউ নাইস!”
মামা থামল না, বলতে থাকল, “আজ দুপুরে টোপনকে পাঠিয়েছি এলাকাটা সার্ভে করে আসতে, সে ফিরে এসেছে ভিজে কাপড়ে! তার মানে পানিতেও নেমেছে। নৌকা চালানো শিখে এসেছে। শুধু তাই না, এলাকার ছেলে পিলেদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে এসেছে। এমনই চমৎকার ফ্রেন্ডশিপ যে একজনের মা রান্না করে খাবার পাঠিয়েছেন। কমপ্লিট উইথ চেপা ভর্তা।”
ডোরিনের বাবা বলল, “চেপা ভর্তা? হাউ ওয়ান্ডারফুল!”
“তার মানে বুঝতে পারছেন? আজ রাতে আমাদের শুকনা রুটি আর ডিম সিদ্ধ খেতে হবে না! আমরা সত্যিকারের খাবার খাব। সব টোপনের সৌজন্যে।”
ডোরিনের বাবা বলল, “সময় পেলে আমাদের রিসোর্টে চলে আসবেন। আমরা এক সাথে লাঞ্চ কিংবা ডিনার করতে পারি।” তারপর আমার আর মাহবুবের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা দুইজন অবশ্যই আসবে। ভিতরে চমৎকার একটা ফ্যামিলি পুল আছে, তোমরা পছন্দ করবে!”
ডোরিন খুশিতে হাততালি দিল, টনি নামের ভোতা ছেলেটার মুখটা আরো একটু ভোলা হয়ে গেল! ডোরিন হাততালি দিতে দিতে বলল, “পুলের পাশে সন্ধ্যাবেলা বারবিকিউ করে, খুব মজার কাবাব তৈরি করে।”
ডোরিনের বাবা বললেন, “হ্যাঁ, তোমরা এসো। আমার ছেলেমেয়েরা রিসোর্টের ভেতর একা একা অধৈর্য হয়ে উঠছে। তোমাদের সাথে একটু সময় কাটালে ভালো লাগবে।”
ডোরিন হঠাৎ ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “টোপন তুমি এখন কী সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট করবে?”
আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, “সেটা তো এখনো জানি না। আমার মামা যেটা বলবে–”
ডোরিন তখন মামার দিকে তাকাল, বলল, “সায়েন্টিস্ট আংকেল, টোপন এখন কী এক্সপেরিমন্টে করবে?”
মামা খুবই সহজ গলায় বলল, “শুরু হবে সেম্পল কালেকশন দিয়ে। ভোরবেলা এই এলাকায় বের হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে সেম্পল নিয়ে আসবে।”
“কী রকম সেম্পল?”
“অনেক রকম হতে পারে।” বালু, পানি, কখনো গাছ, গাছের পাতা, মাছ।”
“আমরা কী টোপনের সাথে সাথে সেম্পল কালেক্ট করতে পারি?”
“তোমরা?” মামা এবারে একটু অবাক হলো, তারপর বলল, “কাজটা মোটামুটি পরিশ্রমের, রোদে হেঁটে হেঁটে সেম্পল আনতে হবে। তোমরা শুধু শুধু কেন কষ্ট করতে চাচ্ছ?”
“আমাদের পরিশ্রম করতে কোনো আপত্তি নাই।”
টনি অনেকক্ষণ পর একটা কথা বলল, নাক দিয়ে ঘোঁৎ করে একটা শব্দ করে ভোতা মুখে বলল, “আমি রোদে হাঁটাহাঁটি করতে পারব না।”
ডোরিন মুখ শক্ত করে বলল, “তুই আসতে না চাইলে আসিস না। আমি আসব।”
মাহবুব বলল, “আমারও এখন স্কুল ছুটি। আমিও আসতে পারি।”
মামা বলল, “ভেরি গুড। তোমাদের গার্জিয়ানদের যদি আপত্তি না থাকে তোমরা এসে টোপনকে সাহায্য করতে পার।” মামা তখন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে টোপন? তোর কোনো আপত্তি নাই তো?”
মামা এমন ভান করল যেন আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এবং আমি পারমিশন না দেওয়া পর্যন্ত কেউ আসতে পারবে না। আমি বললাম, “না, না, আমার কোনো আপত্তি নাই।”
ডোরিন আবার আনন্দে হাততালি দিল। এই মেয়েটা খুব অল্পতেই আনন্দ পায়। তার ভাইটা ঠিক তার উল্টো। সবকিছুতেই তার সমস্যা।
ডোরিন, টনি আর তার আব্বু আরো কিছুক্ষণ থাকল, তারপর কালকে কখন কোথায় কীভাবে আসবে সেটা ঠিক করে চলে গেল। মাহবুব আরো কিছুক্ষণ থাকল মামার সাথে। আরো কিছুক্ষণ কথা বলে গেল, সবই বিজ্ঞানের কথা। মামা সবাইকে চা বানিয়ে খাওয়ালো। কালো কুৎসিত চা, মুখে দিলে মনে হয় চা নয় বিষাক্ত আলকাতরা খাচ্ছি। সবাই অবশ্যি কোনো আপত্তি না করে মুখ বুজে খেয়ে নিল।
