মামা তখন মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো। মাহবুবের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার পিঠে এতো বড় ব্যাকপেকে কী?”
মাহবুব ব্যাকপেকটা ঘাড় থেকে খুলে বলল, “আমার মা আপনাদের জন্য একটু খাবার রান্না করে পাঠিয়েছেন।”
মামা চোখ বড় বড় করে বলল, “খাবার রান্না করে পাঠিয়েছেন, সত্যি?”
মাহবুব মাথা নাড়ল, বলল, “বেশি কিছু না। আজকে টোপন আর আমি যে মাছ ধরেছি তার একটু ঝোল। সবজি ডাল এইসব, সাথে একটু
মাহবুব ব্যাকপেকের ভেতর থেকে প্লাস্টিকের কৌটা বের করতে করতে কথা শেষ না করে থেমে গেল।
মামা জিজ্ঞেস করল, “সাথে একটু কী?”
“আপনারা খাবেন কি না জানি না, আমি না করেছিলাম, মা তবুও দিয়ে দিল।”
“কী না করেছিলে?”
“একটু চেপা ভর্তা।”
মামা আনন্দের মতো শব্দ করল, “চেপা ভর্তা! সত্যি?”
“আপনারা খান?”
“টোপনের কথা জানি না, সে তত ভদ্রলোকের বাচ্চা, আমি খাই। ঝাল দিয়ে লাল করে চেপা ভার্তা, আহা, বেহেশতি খাবার।”
মাহবুব হাসল, “তাহলে তো ভালো।”
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “মামা, যে খাবারে পচা গন্ধ সেইটা বেহেশতি খাবার হয়ে কেমন করে? বেহেশত কী দুর্গন্ধের জায়গা?”
মামা ধমক দিল, বলল, “যেটা বুঝিস না সেইটা নিয়ে কথা বলিস না।”
তাই আমি আর কথা বললাম না। মাহবুব মাইক্রোবাসের ভিতরে উঁকি দিয়ে একেবারে হতবাক হয়ে গেল। মাথা নেড়ে বলল, “ইয়া মাবুদ! এতো যন্ত্রপাতি? আপনি কী নিয়ে গবেষণা করেন?”
মামা উত্তর দেওয়ার আগেই আমি বললাম, “পরিবেশ দূষণ।”
মাহবুব ভুরু কুচকালো, “পরিবেশ দূষণ?”
“হ্যাঁ। বিভিন্ন জায়গার সেম্পল নিয়ে তারপর সেইগুলো পরীক্ষা করে দেখা হয় তার ভিতরে কী আছে।”
“সেইজন্য এতো যন্ত্রপাতি লাগে?” সে তখনো ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছে না।
মামা মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ, অনেক সময় লাগে।”
মিথ্যা কথা বলতে বেশি ভালো লাগে না, মামাও স্বস্তি পাচ্ছিল না তাই কথা ঘোরানোর জন্য বলল, “নিউটনের সূত্র নিয়ে তোমার সমস্যাটা কী?”
মাহবুব একটু লাজুক মুখে বলল, “আমাদের ক্লাসে সেটা নাই আমি ক্লাস নাইনের বইয়ে দেখেছি। মনে হয় বুঝতে পারি নাই।”
“কী বুঝতে পার নাই?”
“সূত্রে লেখা আছে যে কোনো ভরে বল প্রয়োগ করলে তার ত্বরণ হয়। কিন্তু ভরটা যদি অনেক বড় হয়ে তাহলে কী আমি ধাক্কা দিলে ত্বরণ হবে? সেটা নড়বে? নড়বে না।”
মামা হাসি হাসি মুখে বলল, “নড়বে না?”
“না। আমি কী একটা ট্রাককে ধাক্কা দিয়ে নড়াতে পারি? কোনোদিন নড়াতে পারব না।
মামা হাসল, “ঠিকই পারতে যদি কোনো ফ্রিকশান না থাকতো। ট্রাকটা যদি পুরোপুরি পিছলে একটা জায়গায় থাকতো তাহলে তুমি ঠিকই নড়াতে পারতে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। সত্যি।”
তারপর মামা তার অভ্যাসমতো বকবক করা শুরু করে দিল। নিউটনের সূত্র বোঝায় তারপর হাত পা মাথা নেড়ে উদাহরণ দেয়। তারপর আরো কথা বলে। মাহবুব ছেলেটা এমনিতে চালাক চতুর কিন্তু সে মামার সামনে রীতিমতো বোকামি শুরু করল। শুধুমাত্র হু হা করে মাথা না নাড়িয়ে উল্টো প্রশ্ন করতে লাগল। মামাকে তখন পায় কে! আরো উত্তেজিত হয়ে আরো বেশি কথা বলতে লাগল।
মামাকে কেমন করে থামানো যায় যখন সেটা চিন্তা করছি ঠিক তখন আমি মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম, মনে হলো তার মাঝে একটা মেয়ের গলার স্বরও আছে। আমি মাইক্রোবাস থেকে নেমে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি তখন দেখলাম আজকে দুপুরে দেখা হওয়া টিসটাস মেয়ে আর ভোতা ছেলেটা এদিকে আসছে। তাদের পিছনে একজন বড় মানুষ, এই দুইজনের বা একজনের বাবা চাচা কেউ একজন হবে।
আমাদেরকে দেখে মেয়েটা একটা আনন্দের মতো শব্দ করল এবং তখন মামা তার বিজ্ঞান নিয়ে বকর বকর থামিয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
মেয়েটা বলল, “এই তো পেয়ে গেছি। বলেছিলাম না, একটা মাইক্রোবাসের ভিতর ল্যাবরেটরি!
তারপর আমার আর মাহবুবের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, “তোমরা? তোমাদেরকে চিনতে পারি নাই।”
আমি মুখ শক্ত করে বললাম, “কেন চিনতে পার নাই?”
“শার্ট পরে আছ তো সেইজন্য! আমি ভেবেছিলাম তোমরা সবসময় খালি গায়ে থাক!” তারপর হি হি করে হাসল। মেয়েটার মনে হয় হাসির রোগ আছে।
তাদের সাথের বড় মানুষটা বলল, “সব সময় ঠাট্টা করবি না। ডোরিন।”
মেয়েটার নাম ডোরিন। সে বড় মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আব্বু, এই যে এরা দুইজন নৌকা করে আমাদের পৌঁছে দিয়েছিল।” তারপর আমাকে দেখিয়ে বলল, “এই যে ছেলেটা বলেছিল হাওড়ের মাঝখানে নিয়ে আমাদের ছিনতাই করবে। টনি সেটা বিশ্বাস করে যা ভয় পেয়েছিল!” মেয়েটা আবার হি হি করে হাসতে শুরু করে।
ভোতা ছেলেটার নাম নিশ্চয়ই টনি, সে মুখটা আরো ভোতা করে বলল, “আমি ভয় পাই নাই।”
“পেয়েছিলি। তোর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল।”
“বোঝা যাচ্ছিল না–”
“এইখানে যে মাইক্রোবাসের ভিতরে ল্যাবরেটরি আছে তুই সেইটাও বিশ্বাস করিস নাই। এখন বিশ্বাস হয়েছে?”
মেয়েটার আব্বু একটু এগিয়ে এসে বলল, “ওয়েল ডোরিন, টনিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সেটা তো আমিও ঠিক বিশ্বাস করিনি! আসলেই তো এই মাইক্রোবাসের ভিতরে দেখি রীতিমতো হলিউডের সাইফাই ল্যাব।”
মামা তখন এগিয়ে এসে ডোরিনের আব্বুর সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, “না না! সেরকম কিছু না। স্ট্যান্ডার্ড যন্ত্রপাতি। ছোট জায়গার মাঝে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে বলে এরকম লাগছে।”
