একটু পরেই ছেলে আর মেয়েটি নিজেদের ভিতরে কথা বলতে শুরু করল। আমরা যেন বুঝতে না পারি সেইজন্য ইংরেজিতে বলছে, ছেলেটা বলল, “এদের কতো টাকা ভাড়া দিতে হবে?”
মেয়েটা বলল, “জানি না।”
“আগে থেকে ঠিক করে নেয়া উচিত ছিল। পরে অনেক বেশি চাইবে।”
“চাইলে চাইবে।”
আমি বললাম, “এই ছেলে আর মেয়ে। তোমরা ইংরেজি ছাড়া আর কোনো ভাষা জানো?”
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল, “কেন?”
কারণ, “আমরা ইংরেজি জানি। তোমরা কী বলছ আমরা বুঝতে পারছি।”
নাদুসনুদুস ছেলে আর টিসটাস মেয়ে কেমন যেন চমকে উঠল, নৌকা বাইতে বাইতে আমাদের হেড মাঝি হা হা করে হেসে বলল, “তোমাদের কোনো টাকা দিতে হবে না। আমরা টাকার জন্য তোমাদের মনি কাঞ্চন নিয়ে যাচ্ছি না।”
নাদুসনুদুস ছেলেটা বলল, “তাহলে কী জন্যে নিয়ে যাচ্ছ?”
আমি বললাম, “হাওড়ের মাঝখানে নিয়ে তোমাদের ছিনতাই করার জন্য।”
মেয়েটা হেসে ফেলল, বলল, “যাও। ঠাট্টা করো না।”
আমাদের হেড মাঝি বলল, “তোমাদের নিয়ে যাচ্ছি কারণ তোমরা বিপদে পড়েছ সেইজন্য।”
ছেলেটা মুখ গোঁজ করে বসে রইল, মেয়েটা বলল, “থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।”
আমি বললাম, “আগেই এতো থ্যাংক ইউ দিও না। তোমাদের মনি কাঞ্চনের গার্ডেরা নাকি মেশিনগান হাতে নিয়ে পাহারা দেয়। দূর থেকে আমাদের দেখে মেশিনগান দিয়ে গুলি না করে দেয়।”
আমার কথা শুনে মেয়েটা আবার হি হি করে হাসল। মেয়েটা হাসিখুশি, ছেলেটা ভোতা। নৌকা করে যেতে যেতে মেয়েটা আমাদের সাথে কথাবার্তা বলল, আমরা যে আসলে মাঝি না তাদের মতো স্কুলে পড়ি ব্যাপারটা টের পেয়ে একটু লজ্জাও পেল। আমি এখন জঙ্গলে একটা মাইক্রোবাসের ভিতরে ল্যাবরেটরিতে থাকি শুনে খুব অবাক হলো। জায়গাটা ঠিক কোথায় জেনে নিল। বেশ কয়েকবার বলল, সে দেখতে আসবে। নাদুসনুদুস ছেলে অবশ্য কোনো উৎসাহ দেখাল না।
নদীর বাঁকটা ঘুরতেই আমি দূরে মনি কাঞ্চন দেখতে পেলাম। দূর থেকে একেবারে রাজপ্রাসাদের মতো মনে হয়। পুরো এলাকাটা ঘিরে মনে হয় অনেক রকম গার্ড, নিশ্চয়ই বাইনোকুলার দিয়ে দেখে। দূরে আমাদের নৌকাটা দেখামাত্র তারা সেই বেয়াদব স্পিডবোটে করে আমাদের দিকে রওনা দিল, স্পিডবোটে একজন একটা অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হয় সত্যিই গুলি করে দেবে। স্পিডবোটটা কাছাকাছি আসার আগেই তাদের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল যেন ঢেউয়ের জন্য ঝামেলা না হয়। কাছাকাছি এসে গার্ডগুলো টিসটাস মেয়ে আর নাদুসনুদুস ছেলের খোঁজ খবর নিল। তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা জানতে চাইল। তারপর খুব সাবধানে তাদেরকে স্পিডবোটে তুলে নিল। আমাদের দুইজনের দিকে একবার ঘুরেও তাকালো না, আমাদেরকে দেখেছে কিনা সেটাও বুঝতে পারলাম না।
স্পিডবোটটা যাবার সময় পুরো ইঞ্জিন চালিয়ে গর্জন করে চলে গেল, তার ঢেউয়ে আমাদের ছোট নৌকা দুলতে লাগল, দুলতে দুলতে ডুবে গেলেও এখন তাদের আর সমস্যা নেই। তাদের মনি কাঞ্চনের গেস্টদের তারা তুলে নিয়েছে। ঢেউ কমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমরা আবার বৈঠা তুলে নিয়েছি। দূর থেকে স্পিডবোটের মেয়েটা একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল, আমিও হাত নাড়লাম। হেড মাঝি ছেলেটা হাত নাড়ল না, চাপা গলায় বলল, “বড় লোক হওয়ার কত সমস্যা দেখছ?”
সমস্যাটা কী আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, কিন্তু তারপর মাথা নেড়ে মেনে নিলাম যে বড় লোক হবার অনেক সমস্যা।
ঠিক যেখান থেকে আমি নৌকায় উঠেছিলাম ছেলেটা আমাকে সেখানে নামিয়ে দেল। আমি আবার ব্যাকপেকটা নিয়ে ঠিক চলে যাবার আগে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নামটা জানা হয় নাই। হেড মাঝি ডাকব নাকি আরো নাম আছে?”
ছেলেটা হাসল, বলল, “হেড মাঝি ডাকতে পার, সমস্যা নাই। তবে আমাকে সবাই মাহবুব ডাকে। তোমার?”
“আমার নামটা খুবই জঘন্য। এসিস্টেন্ট মাঝিই ভালো।”
ছেলেটা আবার হাসল, তারপর বলল, “জঘন্য নামটাই শুনি।”
“টোপন।”
“টোপন? কী সুন্দর নাম, জঘন্য বলছ কেন?” আমি আর কিছু বললাম না। এইভাবে আমার সাথে হেড মাঝি মাহবুবের পরিচয় হলো।
০৫. বিকাল বেলা একটা ছেলে
০৫.
বিকাল বেলা একটা ছেলে মামার মাইক্রোবাসের কাছে হাজির হলো। ছেলেটার ফিটফাট পোশাক চোখে চশমা, চুল পরিপাটি করে আচড়ানো, পায়ে জুতো মোজা, পিঠে একটা ব্যাকপেক। জঙ্গলের ভিতরে খুঁজে খুঁজে সে মামার মাইক্রোবাসটা বের করে ফেলেছে। মামা মাইক্রোবাসটার ভিতরে কাজ করছে, আমি পিছনে পা ঝুলিয়ে বসে আছি। ছেলেটা আমার কাছে এসে হাসিমুখে দাঁড়াল, যেন সে আমার কত দিনের পরিচিত। সে কাকে চায় জিজ্ঞেস করতে গিয়ে আমি থেমে গিয়ে চিৎকার করলাম, “আরে হেড মাঝি!”
মাহবুব মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ আমি।”
“তোমাকে আমি চিনতে পারি নাই! চশমায় অন্যরকম লাগছে।” আসলে শুধু চশমা না সবকিছু মিলিয়ে অন্যরকম লাগছে! তাকে আর বলতে পারলাম না গ্রামের ছেলে হলেই লুঙ্গি পরে থাকবে, খালি গায়ে থাকবে এরকম একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল।
“মাছ ধরতে গেলে বাড়িতে চশমা রেখে যাই।”
মামা ভিতর থেকে বলল, “কে এসেছে, টোপন?”
আমি বললাম, “ঐ যে মাহবুবের কথা বলেছিলাম, যে আমাকে নৌকা চালাতে শিখিয়েছে।”
মামা বলল, “যে নিউটনের সূত্রের ভুল বের করেছে?
মাহবুব লজ্জা পেয়ে বলল, “না না, নিউটনের ভুল না, মনে হয় আমার বুঝতে ভুল।”
