“পারবে?”
“কেন পারব না?”
“ছেলেটা ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল, ভেতরে মনে হয় একটা শিং মাছ আছে। শিং মাছ ঘা দিলে কিন্তু খুব ব্যথা। বিষাক্ত।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোনটা শিং মাছ?”
“ঐ যে কালো মাছটা। দুই পাশে বিষাক্ত কাটা। দাঁড়াও এইটা আমি বের করে দিই। তুমি অন্যগুলো বের করো।”
ছেলেটা খুব কায়দা করে শিং মাছটার মাথাটা কীভাবে জানি চেপে ধরে টেনে বের করে ঝুপড়ির ভেতর রেখে দিল। আমি অন্য মাছগুলো বের করলাম। একটা দুইটা মাছের রং কী সুন্দর। ছেলেটা বলল, এই মাছগুলোর বিয়ে হচ্ছে তাই নাকি তাদের এতো সুন্দর রং। কী আশ্চর্য, মাছদেরও বিয়ে হয়! গায়ে হলুদ হয়!
একদিনে কতো কী মজার জিনিস জেনে গেলাম।
সব মাছ বের করার পর ছেলেটা খাঁচাটা আবার পানির নিচে রাখার জন্য নদীতে ঝাঁপ দিল। আমি তার গামছা দিয়ে শরীরটা মোছার চেষ্টা করছি ঠিক তখন একটা মেয়ের গলা শুনতে পেলাম, “এই যে মাঝি।”
আমি চমকে উঠলাম, কে কথা বলে? নদীর তীরে তাকিয়ে দেখি সেখানে একটা নাদুসনুদুস ছেলে আর একটা টিসটাস মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনই আমাদের বয়সী কিংবা এক দুই বছর বড়। দুজনেই ফর্সা কিন্তু নিশ্চয়ই রোদে হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস নাই, তাই রোদে, গরমে, ঘামে লাল হয়ে আছে। আমি অবাক হয়ে তাকালাম, আমাকেই মাঝি বলে ডাকছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আমার জীবনে আমাকে অনেক কিছু বলে ডাকা হয়েছে (যার বেশির ভাগই মোটামুটি অসম্মানজনক) কিন্তু এর আগে কখনোই কেউ আমাকে মাঝি বলে ডাকে নাই। আমি নিজের দিকে তাকালাম, সারা শরীরে কাদা, খালি গা, মাথায় শার্টটা বেঁধে রেখেছি, জামা কাপড় ভিজা। কাজেই কেউ যদি আমাকে মাঝি বলে ডাকে অবাক হবার কিছু নাই।
মেয়েটা আবার ডাকলো, “মাঝি, এই মাঝি।”
আমি বললাম, “আমাকে ডাকছ?”
নাদুসনুদুস ছেলেটা মুখ ভ্যাংচে বলল, “আর কাকে ডাকব? আর কে আছে এইখানে?”
খুবই সত্যি কথা। এইখানে অবশ্য আরো একজন আছে যে এই মুহূর্তে পানির নিচে খাঁচাটা বসাচ্ছে সেটা অবশ্য তাদের জানার কথা না। সেই মুহূর্তে ছেলেটা পানির নিচ থেকে ভুস করে ভেসে উঠল, নাদুসনুদুস ছেলে আর টিসটাস মেয়েটা একটু চমকে উঠল। পানির নিচে কেউ এতক্ষণ ডুবে থাকতে পারে সেটা তাদের জানার কথা না। আমি নিজেও আগে জানতাম না।
ছেলেটা ভেজা শরীরে নৌকায় উঠে একবার আমার দিকে তাকালো তারপর তীরে দাঁড়ানো নাদুসনুদুস ছেলে আর টিসটাস মেয়ের দিকে তাকাল, তারপর আবার আমার দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার?”
আমি বললাম, “এরা মাঝির সাথে কথা বলতে চায়।”
ছেলেটার চোখে কৌতুক ঝিলিক করে উঠল। নৌকাটায় উঠতে উঠতে নাদুসনুদুস ছেলে আর টিসটাস মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি হেড মাঝি।” আমাকে দেখিয়ে বলল, “এ হচ্ছে আমার এসিস্টেন্ট। বল, কী বলতে চাও।”
মেয়েটা বলল, “আমরা হারিয়ে গেছি।”
আমার কেন জানি হাসি পেয়ে গেল, কষ্ট করে হাসি থামিয়ে বললাম, “কে বলেছে তোমরা হারিয়ে গেছ? এই যে তোমরা আমাদের সামনে! স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।”
মোটাসোটা ছেলেটা গরম হয়ে বলল, “ঠাট্টা করবে না। আমরা মনি কাঞ্চন যাচ্ছিলাম এখন রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না।”
মনি কাঞ্চন শুনেই আমাদের হেড মাঝি তার মাথা মোছা বন্ধ করে আমার দিকে অর্থপূর্ণভাবে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টির অর্থ যা কিছু হতে পারে, আমি ধরে নিলাম সে বলছে, “এরা হচ্ছে সেই বড়লোকের বাচ্চা যারা পঞ্চাশ হাজার টাকার হোটেলে থাকে। এদের শরীরের চামড়া মাখনের মতো নরম, জোছনার আলোতে সেই চামড়া পুড়ে যায়।
ছেলেটা অধৈর্য হয়ে বলল, “মনি কাঞ্চন কীভাবে যেতে হয় জান?”
“জানি। যদি হেঁটে যেতে চাও অনেক দূর। কমপক্ষে তিন চার কিলোমিটার। নৌকায় গেলে কাছে। এই বাঁকটা পার হলেই হাওড়, হাওড়ের পাড়ে।”
মেয়েটা বলল, “আমাদের নৌকা করে মনি কাঞ্চনে পৌঁছে দাও।”
আমি একটু অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকালাম, অনুরোধ নয় আবার আদেশও নয়। একটা দাবী। আমাদের উপর যেন তার একটা অধিকার আছে। আমি ভেবেছিলাম আমাদের হেড মাঝি সরাসরি না বলে দেবে কিন্তু সে না বলল না। আমার দিকে একবার তাকালো তারপর নাদুসনুদুস ছেলে আর টিসটাস মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, “সাঁতার জান?”
মেয়েটা বলল, সুইমিং পুলে জানি।”
“নৌকা ডুবে গেলে সাঁতরাতে পারবে?”
নাদুসনুদুস ছেলেটা কেমন যেন ভয় পেয়ে বলল, “নৌকা কেন ডুবে যাবে?”
“আমি বলি নাই ডুববে, বলেছি যদি ডুবে যায়।”
মেয়েটা বলল, “কেন ডুবে যাবার কথা বলছ?”
“দেখ, আমার নৌকা ঘোট। তোমাদের যদি নৌকায় উঠার অভ্যাস না থাকে, ওঠে যদি নড়াচড়া করো নৌকা কাত হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া তোমাদের মনি কাঞ্চনের একটা বেয়াদব স্পিডবোট আছে, সেটাতে মাস্তানেরা ঘুরে বেড়ায়। সেটার বিশাল ঢেউ হয়, সেটা যদি নৌকার গা ঘেষে যায় তবে যা কিছু হতে পারে। সেই জন্য”
মেয়েটা কোনো কথা বলল না। নাদুসনুদুস ছেলেটা বলল, “আমরা খুব সাবধানে থাকব।”
ছেলেটা লগি দিয়ে নৌকাটাকে তীরের কাছে নিয়ে বলল, “নাও। উঠো নৌকায়।”
ছেলেটা আর মেয়েটা জুতা খুলে পানিতে পা ভিজিয়ে নৌকায় উঠল। তারা নৌকার মাঝামাঝি বসেছে, আমি পিছনে বসেছি।
ছেলেটা লগি দিয়ে ঠেলে নৌকাটাকে নদীর ভেতরে দিয়ে বৈঠা হাতে তুলে নিল। নৌকার গলুইয়ে আরো একটা বৈঠা ছিল আমি সেটা হাতে নিয়ে নৌকা বাইতে সাহায্য করতে লাগলাম।
