ছেলেটা হি হি করে হাসল, বলল, “কানের উপর পাটকান না দিলেই হলো।”
“না। সেইটা কখনো দিবে না।”
“ঠিক আছে, আজকে বিকাল বেলা আসব।”
“খুঁজে পাবে?”
“জঙ্গলের মাঝে কী আর দশটা মাইক্রোবাসের ল্যাবরেটরি থাকবে? আমি খুঁজে বের করে ফেলব।”
“ঠিক আছে তাহলে।” আমি চলে যেতে যেতে থেমে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এখন কী করবে?”
“আমার আরো দুইটা ঝাঁকা পানির তলা থেকে তুলতে হবে। তারপর বাড়ি যাব।” ছেলেটা হঠাৎ থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কী করবে?”
“আমি একটু জায়গাটা ঘুরে দেখব।”
“তুমি সাঁতার জান?”
“জানি।”
“তাহলে তুমি আমার সাথে নৌকায় একটু ঘুরতে পার।”
“সত্যি?” আমি খুশি হয়ে বললাম, “নিবে আমাকে?”
“নিব না কেন? আস।”
আমি ছেলেটার সাথে নৌকায় উঠলাম। নৌকাটা একটু দুলে উঠল, মনে হলো পড়ে যাব কিন্তু শেষ পর্যন্ত পড়লাম না। ছেলেটা লগি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নৌকাটাকে নদীর মাঝে নিয়ে এসে বৈঠা হাতে নৌকা বাইতে শুরু করল।
আমি বললাম, “আমাকে নৌকা চালানো শিখাবে?”
“এর মাঝে শিখানোর কিছু নাই। চেষ্টা করবে শিখবে।”
“একটু চেষ্টা করি?”
“কর।” বলে সে নৌকার পিছনে বৈঠাটা রেখে সামনে চলে এলো, আমি সাবধানে পিছনে গিয়ে বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা বাওয়ার চেষ্টা করলাম। প্রথমে সেটা সামনে না গিয়ে ঘুরে যেতে লাগল। আমি বললাম, “কী হলো ঘুরে যায় কেন?”
ছেলেটা বলল, “আমি বলে দিতে পারি, কিন্তু তাতে লাভ হবে না। তোমার নিজের আবিষ্কার করতে হবে।”
কাজেই বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টা করে আমি নিজে আবিষ্কার করলাম কেমন করে নৌকা বাইতে হয়। যখন সত্যি সত্যি শিখে ফেললাম তখন এতো আনন্দ হলো সেটা আর কী বলব। তবে বৈঠা বাইতে যে এতো পরিশ্রম সেটা আমি জানতাম না। একটু খানি যেতেই মনে হলো জান বের হয়ে যাচ্ছে।
আমার অবস্থা দেখে ছেলেটা হাসল, মাথা নেড়ে বলল, “তোমাদের শহরের ছেলেদের এই হচ্ছে সমস্যা। গায়ে কোনো জোর নাই।”
আমি বললাম, “দিনরাত ঘরের ভিতরে বসে থাকলে জোর হবে কেমন করে? আমাদের স্কুলে খালি বিল্ডিং- একটা খেলার মাঠও নাই!”
“আমাদের উল্টা। খালি মাঠ। বিল্ডিং নাই।”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে আরো খানিকক্ষণ নৌকা বেয়ে নিলাম। তখন ছেলেটা বলল, “থামো এইখানে। আমার ঝাঁকাটা তুলি।”
আমি নৌকা থামালাম। ছেলেটা তার জায়গাটা খুঁজে বের করে নৌকাটাকে সেখানে নিয়ে গেল। লগিটা পুতে সে যখন পানিতে নামবে তখন আমি বললাম, “আমিও পানিতে নামি?”
“নামতে চাইলে নাম।”
“আমি দেখি পানির নিচে তুমি কী কর!”
“কিছুই দেখবে না। পানি ঘোলা আর পানির নিচে দেখা যায় না।”
“যেটুকু দেখা যায়!”
“ঠিক আছে।”
আমি শার্টটা খুলে ছেলেটার সাথে পানিতে নামলাম। নদীর পানি উপরে মোটামুটি কুসুম কুসুম গরম নিচে কনকনে ঠান্ডা। ছেলেটা মাথা নিচের দিকে দিয়ে তলিয়ে গেল আমি চেষ্টা করেও নিচে নামতে পারলাম না, যখনই চেষ্টা করি উপরের দিকে ভেসে উঠি। বুঝতে পারলাম পানির তলায় যাওয়া এতো সোজা না।
ছেলেটা মাছের খাঁচাটা তুলে আনল, ভেতরে বেশ কিছু মাছ। এবারে মাছের সাথে একটা কাঁকড়াও আছে। সাপের মতো দেখতে একটা মাছও ছিল কিন্তু এটাকে সে পানিতে ছেড়ে দিল। বাইম মাছের মতো দেখালেও এটা নাকি বাইম মাছ না, এটার নাম কুইচ্যা। কুইচ্যা মাছ নাকি খায় না! বাইম মাছ খাওয়া গেলে কুইচ্যা মাছ কেন খাওয়া যাবে না আমি বুঝতে পারলাম না।
নৌকায় উঠে আমিও ছেলেটার গামছা দিয়ে শরীর মুছে নিলাম। প্যান্টটা ভেজা তাই শার্ট না পরে ছেলেটার মতো খালি গায়ে বসে রইলাম। ছেলেটা আবার নৌকা ছেড়ে দিল। পরের ঝকার কাছে পৌঁছে সে আবার নৌকা থামাল। আমি বললাম, “এইবার আমি একা নামব। দেখি তোমার ঝকা তুলতে পারি কি না।”
ছেলেটা বলল, “ঠিক আছে। নামো।”
“জায়গাটা দেখিয়ে দাও।”
“এই লগিটা যেখানে পুতেছি, তার কাছে। যাও, নামো।”
আমি আগে আগে নামছিলাম সে আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিয়ে হি হি করে হাসতে লাগল। আমি তখন মাথা নিচে দিয়ে পানিতে ডুব দিলাম। যদি আমার বাসার কেউ দেখতে আমি নদীর পানিতে এভাবে ঝাঁপ দিয়ে পানির নিচে চলে যাচ্ছি তাহলে এতোক্ষণে নিশ্চয়ই ভয়ে চিৎকার করতে করতে হার্টফেল করে ফেলত! নিচে কনকনে ঠান্ডা পানি আমি বেশিদূর নামতে পারলাম না, ভুস করে ভেসে উঠলাম। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আবার নিচে নেমে গেলাম, এবার মনে হয় আরো নিচে নামতে পারলাম, হাত দিয়ে আঁকাটাকে খুঁজতে থাকি। নরম কাদার মাঝে হাত লাগল, মনে হলো পিছল মতন কিছু একটা হাতের উপর দিয়ে চলে গেল। অন্য কোনো সময় হলে নির্ঘাত ভয়ে চিৎকার করে উঠতাম, আজকে কিছুই করলাম না। হাতটা নাড়াতে থাকলাম, হঠাৎ করে একটা আঁকা হাতে লাগল। টেনে তোলার আগেই মনে হলো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাব, তাই আঁকা ছাড়াই উপরে উঠে এলাম। ছেলেটা একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী অবস্থা? পারবে? নাকি আমি নামব?”
“পারব। আর একবার।” আমি বড় বড় করে কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে আবার ডুবে গেলাম। এবারে সত্যি সত্যি খাঁচাটা একবারে পেয়ে গেলাম তারপর সেটা টেনে উপরে নিয়ে এলাম।
ছেলেটা আমাকে দেখে হাততালি দিয়ে বলল, “বাহ! বাহ্! এই তো শিখে গেছ!”
আমি খাঁচাটা নৌকার ওপর রেখে নিজেকে টেনে নৌকার ওপর তুলে খানিকক্ষণ নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, “দাও, আমি মাছগুলো বের করি।”
