সুরতুন বললো, জমি-জিরাত নাই, ধান কুড়ায়ে, বাড়াবানে কয়দিন চলবি। সে সময়ে দিন চলতো না।
হুম। মাধাই বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়ার মতো কথাটা উড়িয়ে দিলো বলতে বলতে, এই তো বেশ আছিস। রাঁধ, বাড়, খা।
বসে বসে খাওয়াবা?
আপত্তি কী? যেকয়দিন চাকরি করি খানা কেন্দুজনের খাওয়া-পরা আমার টাকায় চলে। টাকা দিয়ে আমার আর কোন কাম।
আহারপর্ব মিটলে সুরতুন বারান্দায় তার শয্যা বিছিয়ে নিচ্ছিলো। মাধাই বললো, আজ ফতেমা নাই, একা বাইরে শুবি কেন্।
কথাটায় সুরতুন বিস্মিত হলো। বহুদিন তারা বারান্দার আশ্রয়ে কাটিয়েছে। সব সময়েই ফতেমা থাকেনি। সে একা এই বারান্দায় অনেক শীত বর্ষার অন্ধকার রাত্রি কাটিয়েছে।
সুরতুন বললো, আমার কাঁথা পাটি ময়লা, কালো।
মাধাই হাসিমুখে বললো, তা ঠিক বলছিস, আমার ঘর সাহেবদের মতো মার্বেলের তৈরি। অবশ্য পরে নিজেই সে ভেবে পেলো না এতখানি আগ্রহ কেন সে দেখালো। নিজের মনের একটি অংশে এদের একান্ত আপনার বলে ভ্রম হচ্ছে। যেমন আকস্মিকভাবে হয়েছিলো একটা করুণার বোধ ফুলটুসির ছেলেদের দেখে।
পরদিন সকালে মাধাই বললো, আজ গাঁয়ে পলাবি নাকি?
না।
না যাস ভালোই হবি। রাত্তিরে সার্কাসে যাবোনে। সে যে কী জিনিস!
আচ্ছা।
তাইলে পলাসনে কৈল।
দুপুরের আহারাদির জন্য মাধাই ফিরবে। এখন সে ডিউটিতে গেছে। সুরতুন বসে চাল ঝাড়ছিলো। নিজের রান্নার সময়েও ফতেমা চাল ঝেড়ে পরিষ্কার করে নেয়। সুরতুন নিজের বেলায় অত হাঙ্গামা করে না। কিন্তু মাধাইয়ের জন্যও রান্না করতে হবে, সুতরাং একটু সতর্ক হতে হয়।
পায়ের শব্দে চোখ তুলে চেয়ে সুরতুন অবাক হয়ে গেলোসামনে দাঁড়িয়ে টেপি।শাদামাটা রঙিন একটা শাড়িতে তাকে গত সন্ধ্যার মোঝকঝকে দেখাচ্ছে না। চোখের কোলে অস্বাস্থ্যের কালো চিহ্ন। কিন্তু তবু তাকে বড়োঘরের ঝি বউয়ের মতো দেখাচ্ছে। হাতে সোনার চুড়ি, গলায় সোনার হার, এসব তো আছেই, পায়ে জুতোও আছে। বলা বাহুল্য, সোনা গিলটির তফাত জানতো না সুরো।
টেপি ভূমিকা না করেই বললো, তোর কাছে এক কাজের জন্যে আলাম। আমাকে একটু ওষুধ আনে দিতে হবি।
আমি? কও কী? আমি কি চিনি, কনে যাবো?
আমি তোকে দোকান দেখায়ে দিবো, টাকা দিবো।
তুমি নিজে যাও না কেন্? তুমি তো বাজারে ঘুরে বেড়াও। লোকের সঙ্গে কথা কও। কিন্তু ওষুধ কেন, কার অসুখ?
অসুখ না, ওষুধ আমারই লাগে।
সুরতুন ঘরের দরজায় চাবি দিয়ে টেপির সঙ্গে বার হলো।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে টেপি বললো, কাল তোকে মাধাইয়ের সঙ্গে বাজারে দেখে মনে হলো তোর কাছে আসার কথা।
টেপির কথায় সুরতুনের মনে একটু সাহস হলো প্রশ্নটা করার। প্রশ্নটা তার মনে কিছুক্ষণ। থেকে উঁকি দিচ্ছিলো। সে বললো, অমন মেমসাহেবের মতো সাজে কাল কনে যাওয়া হইছিলো?
টেপি সুরতুনের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে কী ভেবে নিয়ে বললো, তোকে কওয়া যায়। আমি আর চেকারের কাছে থাকি না। কাল যাক দেখছিস সে চেকার না।
টেপির প্রাণের ভিতরে কথাগুলি পুঞ্জীভূত হয়ে বহিঃপ্রকাশের জন্য চাপ দিচ্ছিলো। বলার লোক প্রতিবেশীদের মধ্যে নেই। সুরতুনের প্রশ্নে প্রকাশের বাধাটা দূর হতেই টেপি বলতে লাগলো, চেকার বদলি হয়ে গেছে তিনদিন হয়। যাবার সময় আমাকে বেচে দিয়ে গেছে। এক দোকান থিকে আমার জন্যে কাপড় জামা গয়না কিনতো। সাতশো টাকা ধার হইছিলো। তার যাওয়ার দিন দোকানের লোক আসে উপস্থিত। অনেক কথাবার্তাকয়ে শেষ পর্যন্ত দোকানদারের কাছে টাকার বদলে আমাকে জমা রাখে গিছে। ফিরায়ে নিবি মনে হয় না। কী করি কও, সুরে। দোকানদার পাঞ্জাবী। কেন যে কান্না পায়, ঘিন্না ঘিন্না করে।কাল পাঞ্জাবী সাজে বার হইছিলাম। চেকার গিছে আপদ গিছে, কিন্তুক, কও সুরো, কওয়ামাত্র অন্য আর একজনেক ঘরে আসবের দেওয়া যায়?
টেপির অজ্ঞাতসারে তার কথাগুলি বাষ্প গাঢ় হয়ে যাচ্ছিলো। সুরতুনের কাছে স্পষ্ট হলো না সবটুকু, তবু সে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে রইলো–দেখো দেখি মানুষ নাকি বেচা যায়!
টেপি বললো, আমি সময়ে যা পারবো, আজই তা পারবো কেন্। আমার এক বুড়ি পড়শি কইছে এই ওষুধ আনে মসুরদানার সমান হালুয়ায় মিশায়ে খাওয়ালে পুরুষ ঘুমায়ে পড়ে।
দুজনে নীরবে পথ অতিবাহিত করতে লাগলো। টেপির সমস্যা ফতেমা বুঝতে পারতো হয়তো, হয়তোবা সে আন্দাজ করতে পারতো টেপি আফিম কিনতে যাচ্ছে এবং এ পদ্ধতি যে কতদূর বিপজ্জনক তাও বলতে পারতো। সুরতুন টেপির জন্য একটা অনির্দিষ্ট সমবেদনা অনুভব করলো শুধু।
দূরে দাঁড়িয়ে আফিমের দোকান থেকে সুরতুনের হাত দিয়ে রতি-ভর আফিম কিনলো টেপি।
ফিরবার পথে টেপি বললো, সুরো, তুই আজকাল মাধাইয়ের কাছে থাকিস?
হয়, আছি কয়দিন।
টেপি একটু ইতস্তত করে বললো, সাহস হয়, একটা দুটো ছাওয়াল মিয়ে চায়ে নিস। মনে। কয় এমন করে তাইলে মিয়েছেলেক বেচে দেওয়া যায় না।
.
রাত্রিতে সার্কাস দেখার কথা ছিলো, সুরতুন তা ভুলে গিয়েছিলো। টেপির চালচলন কথাবার্তা কতবার যে সে ভাবলো তার ঠিক-ঠিকানা নেই। মাধাই সকাল সকাল ডিউটি থেকে ফিরে বললো, কি রে, রান্না হয়েছে?
সুরতুন তখনো উনুন ধরায়নি, সে বিব্রত মুখে বললো, ভাত নামাতে আর কত বেলা। আপনে ঘরে বোসো, এখুনি হবি।
