আজ দ্বিতীয়বার পড়তে গিয়ে কনক চুরুট ধরালো। এজাহারে অন্তত একটি বিষয় আছে-মহাজনের বিরুদ্ধে চাষীদের সঙঘবদ্ধ প্রতিকূলতা। আপাতদৃষ্টিতে খাজনার জন্য। মহাজনের উপরে চাপ দেওয়া জমিদারের পক্ষে স্বাভাবিক, সেটির সঙ্গে চাষীদের প্রতিকূলতার কোনো যোগাযোগ খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু এক্ষেত্রে কনক যোগাযোগের সূত্রটি কল্পনা করে নিলোসান্যালমশাইয়ের সে ছেলেটি তবে গ্রামে ফিরেছে। অন্তরীণ অবস্থা থেকে ইচ্ছামতো বেরিয়ে আসা তার রীতি। এজন্য সে দুবার জেলও খেটেছে।
দশ মিনিটের মধ্যে কনক ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো চিকন্দির দিকে। চিকন্দির গাছগাছড়া ঢাকা পথে তখনো রোদ কড়া হয়ে ওঠেনি, কিন্তু এতখানি পথ জোরে ছুটে এসেদুপুরের রোদে পোড়া ঘর্মাক্ত একজন দারোগার মতো দেখাচ্ছে তাকে। এরকম চেহারা নিয়ে সান্যালবাড়ি যাওয়া চলে না। ঘোড়া থামিয়ে কনক তার প্রকাণ্ড রুমালখানি বার করে ঘাম মুছলো, সিগারেট ধরালো, খানিকটা সময় স্থির হয়ে রইলো; তার ও তার ঘোড়ার নিশ্বাসে সমতা এলে আবার সে চলতে আরম্ভ করলো।
আর খানিকটা যাবার পর কনক, দেখতে পেলো, একজন স্ত্রীলোক ও একটি পুরুষ আসছে। স্ত্রীলোকটির পরনের শাড়িটি দামী নয়, কিন্তু পরিচ্ছন্ন এবং উজ্জ্বল রঙের। উভয়ে পরস্পরের কোমরে হাত রেখে চলেছে। এ বয়সে এরকম চলা প্রথম প্রণয়ী সাঁওতালদের পক্ষে হয়তো সম্ভব। এই ভাবলো কনক এবং জিজ্ঞাসা করলো, দ্যাখো, তোমরা এই গ্রামে থাকো?
হ্যাঁ। পুরুষটির চাইতে স্ত্রীলোকটি সপ্রতিভ; সে-ই এগিয়ে দাঁড়ালো।
তোমরা বলতে পারো, এ গ্রামের লোকদের সঙ্গে চৈতন্য সাহার বিবাদ লাগলো কেন?
বিবাদ লাগেনি, লাগলে ভালো ছিলো। স্ত্রীলোকটি বললো।
তুমি তো এ দেশের লোক নও বাপু, তোমার কথাগুলো তার প্রমাণ।
গোলমাল একটু আছে আমার কথায়।
তুমি বলতে পারো, রামচন্দ্র কেন চৈতন্য সাহাকে মারলো?
কখন মারলো? এই শুনলাম সব মিটে গেছে। কখন মারলো রে মুঙ্লা?
তা তো জানিনে। মুঙ্লা বললো।
যখন দরকার তখন পলায়ে থাকলো, আর এখন মারলো?
তোমার যেন খুব ভালো লাগলো সংবাদটা,কনক বললো, রামচন্দ্র চৈতন্য সাহাকে মারপিট করলে তুমি খুশি হও, কেমন?
এখন আর তার দরকার নেই। নীলের গাজন গেছে, আউসের চাষ হয় নাই; বৈশাখ যায়, কছু একটা করতে হবে। এখন তো সকলকেই খাটতে হবে। পদ্ম হাসলো।
তাহলে মারপিট হলে তুমি খুশি হতে?
শুধু আমি কে, ভগোমানও হতো।
কনক স্থির করলো এ গ্রামে যদি কোনদিন কোনো গোলমাল হয়, এই মেয়েটিকে আগে খুঁজে বার করতে হবে। কনক ঘোড়া ছেড়ে দিলো, কিন্তু আবার তাকে থামতে হলো। শহরের
কানো মেয়ে নয় তো, পুলিসের চোখের আড়ালে বেড়াচ্ছে।
অ্যাই, শোন!
আজ্ঞে।
পদ্ম কাছে এলে কনক এবার পুলিসি দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো। শহরের পলাতক যে কয়টি মেয়ের ছবি তার কাগজপত্রে আছে, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে মনে মনে তুলনা করলো। বৈষ্ণবী ঈষৎ সংকুচিত হয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আচ্ছা যাও। কনক চিন্তা করতে করতে লাগাম আলগা করে দিলো।
কনক চলে গেলে মুঙ্লা বললো, শ্বশুরকে ধরতে আইছে, কেন পদ্মমণি?
পদ্ম বললো, তুই বাড়ি যা।
কী করবো?
সাহস দেবা, আমি একটু সান্যালবাড়ি যাবো। ছোটোবাবুকে খুঁজে বার করবো।
নোদিন সে বাড়ি গিছ? সারাদিন ধরে খুঁজলিও তাক খুঁজে পাবা না। আর পালেও কী কবা?
তোক যা কলাম, কর।
মুঙ্লা চলে গেলো। তারা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো সেটা সান্যালদের বাগিচার সীমা। সেখান থেকে ঘোড়ার পথে সদর দরজায় যেতে অন্তত দশ-বারো মিনিট, কিন্তু বাগিচার আড়াআড়ি আম গাছগুলোর তলা দিয়ে ছুটতে পারলে খিড়কির পুকুরের জঙ্গলকে অগ্রাহ্য করতে পারলে পাঁচ-সাত মিনিটে অন্দরে পৌঁছানো যাবে। নিচু হয়ে কাঁটাতারের বেড়া গলে পদ্ম সান্যালবাড়ির দিকে ছুটলো।
কনক সান্যালদের কাছারি-ঘরে ঢুকে দেখলো, দশ বারোজন চাষী বসেছে মেঝেতে গোল হয়ে। একজন জরাজীর্ণ প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। ফরাশের উপরে বৃদ্ধ নায়েব, তার চারিপাশে গুটিকয়েক আমলা। তারা খাতাপত্র, কাগজ কলম নিয়ে ব্যস্ত।
নমস্কার, নায়েবমশাই।
নমস্কার। আসুন, বসুন।
পঞ্চায়েত নাকি? কনক হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলো।
তা একরকম। চৈতন্য কৃষকদের সঙ্গে একটা আপোষ করে ফেলছে। ইনি চৈতন্য সাহা, চেনেন বোধ হয়?
ইনি-ই?
কনকের পুলিসি দৃষ্টি ও নায়েবমশাইয়ের পদোপযুক্ত হাসির সম্মুখে চৈতন্য সাহা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো।
এখানে রামচন্দ্রও আছে নাকি? কনক জিজ্ঞাসা করলো।
কৃষকদের মধ্যে স্থূলকায় একজন নড়েচড়ে বসে গোঁফে হাত দিলো।
বেশ। কিন্তু, ব্যাপার কী? রামচন্দ্র চৈতন্য সাহাকে হত্যার চেষ্টা করলো কেন?
রামচন্দ্র ও চৈতন্য সাহার মুখের অবস্থা দেখে মনে হলো কনকমাস্টার তাদের দুজনের মাথা ঠুকে দিয়েছে লেখাপড়ায় অবহেলার জন্য।
নায়েবমশাইয়ের অনুসন্ধানী দৃষ্টি পর্যায়ক্রমে রামচন্দ্র ও চৈতন্য সাহার মুখের উপরে পড়তে লাগলো।
না, না। তা করবি কেন। রামচন্দ্র আমার বন্ধু। ছোটকালে আমরা খেলছি একসাথে। কেন রামচন্দ্র, খেলি নাই? চৈতন্য প্রাণপণ করে বললো।
কিন্তু থানায় মিথ্যা এজাহার দিলে কী হয়, তা বুঝি আপনি জানেন না? কনক চোখ পাকালো।
