গ্রামবাসীরা ঘিরে দাঁড়ালো রামচন্দ্রকে, ছিদাম আর মুঙ্লা রামচন্দ্রর সম্মুখে কাদার উপরে। বসে পড়লো। একজন স্ত্রীলোকও এসে দাঁড়িয়েছিলো ভিড়ের মধ্যে। খাটো হলদে শাড়ি পরা, আঁটসাট দেহ, চুলগুলো খুব টেনে বাঁধা, বড়ো বড়ো চোখ। চাষীদের যদি ভাষাজ্ঞান থাকতো, বলতো, তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটি উপাসনার মতো কতকটা। সে শ্রীকৃষ্টর বৈষ্ণবী পদ্ম।
রজব আলি এতক্ষণ একবার খেতের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো, একবার পিছিয়ে যাচ্ছিলো, এবার সে রামচন্দ্রর পাশে বসে দুই হাঁটুর উপর দিয়ে হাত দুটি ধানের দিকে অগ্রসর করে দিয়ে খুঁতখুঁত করে হাসতে লাগলো।
ছিদাম বললো, কেন্ জেঠা, ধান কাটি?
রামচন্দ্রর হয়ে মুঙ্লা বললো, এবেলা না হয়, ওবেলা কাটাবো। ভাইসব, তোমরা সকলে আসবা। আমার সখার এই ধানে ভোজ হবি, আকাশে ছিটায়ে ছড়ায়ে দেবো।
কিন্তু রামচন্দ্র মাথা দোলালো। গোঁফে একবার চাড়া দিয়ে মনটাকে স্ববশে এনে সে কথা বললো, ধানে হাত দিবা না, ও ধান তোমার না।
‘তবে?
আগে বিচার করো, রাজার কাছে যাও, তার কথা শোনো। যদি রাজা বলে, ধান তুলবা।
রাজা তো এখন শহরে। উকিল দিয়ে মামলা করে তার কথা শুনতে চারমাস; ততদিনে ধান মাটিতে পড়ে নতুন করে গাছ হবি।-হরিশ বললো কথাটা।
গাঁয়ের রাজা সান্যাল আছে, তাদের কাছে যাও।
তোমার সে রাজা মহাজনের পক্ষ, মিহির সান্যাল খাইখালাসি কারবার করে।
রামচন্দ্র একটু থামলো, তারপর কথাটা বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বললো, যে খাজনা খায় তাকে রাজার কাজও করতে হবি। রাজা মহাজন এদের তো কওয়া হয় নাই আমরা দেনা খাজনার দায়িক হব না। না কয়ে বলে দেনা খাজনা বন্ধ করবের পিরবো না ভাই। যা করবো জানায়ে শুনায়ে।
রামচন্দ্র উঠে দাঁড়ালো। মুঙ্লা ছিদাম ও অন্যান্য সকলকে বিস্মিত করে সে বললো, আমি এই কাদা গায়ে সান্যালমোশাইয়ের কাছে যাতেছি, তিনি মহাজনের বিপক্ষে আয় দেয় কিনা দেখবো।
রামচন্দ্র খেত পার হয়ে সান্যালবাড়ির পথ ধরলো।
পদ্মর মনে হলো, কী ভীরু, কী ভীরু।
কিন্তু সেটা শেষ কথা নয়। আদর্শটা কী করে তৈরি হয় বলা শক্ত। মেয়েদের বেলায় বোধ হয় নিজের বাবাই আদর্শবীজ। বাবার মতো এমন শক্তিশালী কেউ নেই, বাল্যের এই বোধ পুরুষদের আদর্শের মূলে চিরকালের জন্য থেকে যায়। নিজের ভাইরা, নিকট পুরুষ-আত্মীয়রা এই আদর্শের পুষ্টি করে, এবং পরবর্তী জীবনে অপরিচিত যে পুরুষকে মেয়েটি গ্রহণ করে প্রথম ভাবালুতা কেটে যাওয়ার পর সেই পুরুষ তত বেশি নিকটে আসে যতখানি মেয়েটির পূর্ব পরিচিত আত্মীয়পুরুষগুলির সঙ্গে তার চরিত্রগত ঐক্য আছে। পদ্মর কল্পনায় এমন একটি পুরুষ কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। এটা সে এর আগে কোনোদিন অনুভব করেনি, এখনো তার চিন্তায় এ কথাগুলি ভেসে উঠলো না। এমন কালো তেল-চুঁইয়ে-পড়া রঙ, এমন পেশীবহুলতা, এমন ভারভারিক্কি গোঁফ, এমন পাকাকঁচায় মেশানো একরাশ চুল মাথায়–পদ্মর অনুভবেঅপূর্ব একটি একাত্মবোধ ফুটে উঠলো। নিজের মনের সঙ্গে সে সওয়াল জবাবে নামলোনা, ভীরু নয়, ভীরু নয়। পাঁচ-ছ’জন বাঙাল চাষীর সম্মুখে–তারাও নিরস্ত্র নয়, লাঠি হেঁসো ছিলো–যে হাঁক দিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় সে ভীরু নয়।
.
সংবাদটা গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে গেলো। খাইখালাসি আর বন্ধকী, বরগাদারী, কিংবা পত্তনি হঠাৎ যেন তার প্রতি দুর্ভিক্ষের আগেকার দিনগুলির মতো মমত্ব বোধ করলো চাষীরা।
সন্ধ্যার পরে চাষীরা শুনলো রামশিঙা বাজছে, খোলে ঘা পড়ছে, ঢোলকে আখর ফুটছে–
চিতিসাপ চাঁদ শাহে লাগলো বিসম্বাদ
শোনো শোনো দেশবাসী তাহার সম্বাদ
–চাঁদ হেন্তাল হাতে নিলো।
১১. তখন দুপুরবেলা
তখন দুপুরবেলা, মানুষের জ্ঞান আহারের সময়; কাদা মাখা, অজ্ঞাত, অভুক্ত একটি লোক আঙিনায় এসে দাঁড়িয়েছে দেখা করতে, এই সংবাদ পেয়েছিলেন সান্যালমশাই। শহরে যাদের দরোয়ান থাকে তাদের তুলনায় দরোয়ান। বরকন্দাজের সংখ্যা তার বাড়িতে বেশি, কিন্তু দরোয়ানের মুখে কথা দিয়ে লোককে ফিরিয়ে দেওয়ার অভ্যাস তার নেই; কেন নেই, সেটা অন্য কথা। সরাসরি অন্দরের আঙিনায় আসবার জন্য রামচন্দ্রর উপর সান্যালমশাই যৎপরোনাক্তি বিরক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তবু তাকে সামনে গিয়ে দাঁড়তে হয়েছিলো।
সান্যালমশাই সম্মুখে এসে দাঁড়াতেই রামচন্দ্র নিচু হয়ে বসে সেকালের কায়দায় তার হাতের লাঠিটা তার পায়ের কাছে রাখলো।
আছ্রয় চাই, আজ্ঞা।
কী করেছে?
অন্যাই করছি, আছ্রয় দেন, কবুল আপনার কাছে।
কী আশ্চর্য, রামচন্দ্র! তুমি অন্যায় করবে, আর তার প্রশ্রয় আমি দেবো, এমন আশা তুমি কোরো না; মারপিট দাঙ্গাহাঙ্গামা করে থাকো তার ব্যবস্থা আদালতে হবে। তুমি কি আমাকে ফৌজদারিতেও জড়াতে চাও! সান্যালমশাই বিরক্ত হলেন।
না, আজ্ঞা। গড় ছিরিখণ্ড এটা, তার জমিতে দাঁড়ায়ে আপনার কাছে কথা কতেছি।নীলকর সাহেব আমাদের জেরবার করছিলো, আজ্ঞা; আমাদের বাপ সান্যাল গুলি করে মারলো নীলকর সাহেবেক। ফৌজদারিতে কি হয়? পুলিস ক’লে ডাকাতি। আমরা জানি, হুজুর, দু-বিঘে জমির জন্যে অমন রাগ হয় না সান্যালদের। অনেক অপমান ছিরিখণ্ডের লোকরা সহ্য করছিলো, সেই সকলের রাগ ফাটে পড়লো ঐ দু বিঘে জমির ছুতা করে। লিন্ডোলসাহেব পাটের মহাজন ছিলো, তাক উচ্ছেদ করছিলেন স্বয়ং, আজ্ঞা।
