একসময়ে ধান গেলো ফুরিয়ে, বীজধানও ধরে রাখলো না কোনো চাষী। হাতে নগদ টাকা নিয়ে চৈতন্য সাহার নির্বুদ্ধিতার কথা উল্লেখ করে হাসাহাসি করেছিলো তারা। কিন্তু শহর থেকে খাবার চাল আনতে গিয়ে তাদের হাসি শুকিয়ে গেলো। দু দিনেই যেন শহরের সব দোকানদার খবর পেয়ে গেছে, তাদের ঘরে খাবার নেই। দু’একজন দোকানদার তো মুখের সামনেই বলে দিলো–বিক্রি করবো কি? কিনবো।
এরপরই চাষীদের ছুটোছুটি শুরু হলো, হায়, হায়, চাল কোথায়! জমি ঘর যার যা সম্বল ছিলো দুর্ভিক্ষের মুখে গুঁজে দিতে লাগলো। আল ভেঙে গেলে চাষীরা যেমন দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ফাটলের মুখে নিজের বস্ত্রখণ্ড পুরে দিও জল বাঁধবার চেষ্টা করে, তেমনি করে তারা চেষ্টা করলো। জমির দাম অকিঞ্চিৎহয়ে গেলো। প্রথমে বড়োচাষীরা ছোটোচাষীদের জমি ধরার চেষ্টা করলো, তারপর তারাও প্লাবনে ভেসে গেলো। চৈতন্য সাহা এসে দাঁড়ালো ক্রেতা হয়ে; এবার যেন সে সব কিনবে, পৃথিবী পায় তো তা-ও কিনবে। কোথায় ছিলো এত টাকা তার কে জানে! কিন্তু সে যেন পাগলও হয়েছে। এক বিঘা ধানের জমির দাম দশ টাকা বলে সে, শুনে প্রথম প্রথম চাষীরা না-হেসে পারেনি। দেড় টাকার ধান বারোতে কিনেছে, একশোর জমি দশে চায়। কিন্তু এদিক-ওদিক ঘুরে তার ঘরেই ফিরে এলো চাষীরা, পনরো টাকা হয় না? এক বিঘা দো ফলা জমি?
তা তুমি যখন বলছে, দশের উপরে আর আট আনা দিতে পারি।
তাই দাও, তাই দাও। ছাওয়াল মিয়ে খায় নাই।
নিজের পাঁজরার একখানা হাড় খুলে রেখে দশ টাকা আর কতগুলি খুচরো নিয়ে চলে গেছে চাষীরা। বুড়ো সিন্ধুসিংহের মতো চাষীদের নাক বেয়ে চোখের জল নেমেছিলো; অনাহারে কষ্টে কিংবা জমির শোকে তখন তারা তা বুঝতে পারেনি।
নগদ দামে, রেহানে, খাইখালাসি বন্দোবস্তে চৈতন্য সাহারা চাষীদের দশ আনা জমি গ্রাস করেছে। চৈতন্যর সঙ্গে সহযোগিতা করলো গ্রামের কয়েকজন জোতদার।
গান থামলে রামচন্দ্র বললো–এ তোরা শিখলি কোথায়?
গুরুর নিষেধ, কবের পিরবো না।
এ গান শুনলি লোকে কী কবি?
ছিদাম কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিলো, কিন্তু লোকে কী বলবে, তার মীমাংসা করে দিলো আর একজন লোক। এদের গানের সময়ে পথচলতি দু’চারজন লোক জড়ো হয়েছিলো, তাদের মধ্যে একজন বললো, কেন ভাই, গায়েন, আমাদের গাঁয়ে একদিন গান শুনাবা না?
কোন গাঁ তোমাদের?
চরনকাশির পর মাধবপুর।
তা যাবো একদিন।
যায়ো ভাই, যায়ো, আমার বাড়িতে যায়ো; সেখানে জলসা হবি। আমার নাম যাদো ঘোষ।
তোমরাও কি চিতি সা-কে চেনো?
হয়। সে গোরুও কিনেছে আমাদের ঘোষেদের কাছে।
যাবো ভাই, যাবো।
লোকটি চলে গেলে রামচন্দ্র আবার প্রশ্ন করলোতোরা কি এখন গাঁয়ে গাঁয়ে এমন সব গান গায়ে বেড়াবি?
হয়। নীলের গাজন ইস্তক এই করব আমরা। আপনেরাও ভগোমানের নাম করেন, আমরাও করি।
এ কি তোদের ভগোমানের নাম, চিতি সা কি তোদের ভগোমান?
একটু থেমে কথাটা গুছিয়ে নিয়ে ছিদাম বললো, ও আমাদের সব খালো, আর আমরা বললিও দোষ।
কয়ে কী হয়? রাস্তার লোকেক মুখ ভ্যাংচায়ে কী হয়, নিজের মুখে ব্যথা।
ছিদাম মাথা চুলকাতে লাগলো।
মুঙ্লা বললো–এখানো গান বাঁধা শেষ হয় নাই, মিহির সান্যালের নামেও গান বাঁধা হবি।
রামচন্দ্র বললো, সাবোধান। দ্যাশের মালিক, রাজা।
কীসের রাজা, আমরা তার জমি রাখি না।
কস কী! হাজার হলিও সান্যালবংশ, রাজবংশ। এর জমি না রাখো, তার রাখো। কোনা না কোনো সান্যালের জমি রাখো। তুমি কি মনে করছে মিহিরবাবুর নামে গান বাঁধলি, নোসল্লা করলি সান্যালমশাই খুশি হলো। কি কও, শ্রীকৃষ্টভাই?
ঠিক কইছেন মণ্ডল,বললো শ্রীকৃষ্ট, মিহিরবাবু কী ক্ষতি করছে তোমাদের?
আমাদের গ্রাম ছাড়া করতিছে। সে সময়ে যারা আমাদের ঠকায়ে জমি নিছে সকলেই চিতি সাপ।
তোমাদের গাঁ ছাড়া করিতেছে তোমাদের বাপরা জানলো না?
আমাদের না হউক, শাঁখারিদের–বললো মুঙ্লা।
শাঁখারি আর তোমরা এক হইছে?
এক হওয়া লাগবি। মরার সময়ে আগে তারা, পরে আমরা মরছি। মরে এক হইছি–বললো ছিদাম।
রামচন্দ্র বললো–আচ্ছা, এক যদি হওয়া লাগে, বাপরা এক হোক। তোমরা ছাওয়ালরা এসব করবা না।
ছিদাম ও মুঙ্লা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাঁইগুঁই করতে লাগলো। রামচন্দ্র মণ্ডল নিষেধ করলে ভাবতে হয়।
সে সন্ধ্যায় কীর্তন জমলো না। যারা এলো তারা এই গানের কথাই বলাবলি করলো। কেউ বললো, ঠিকই করেছে ছাওয়ালরা, বেশির ভাগই বিষয়টির আকস্মিকতায় মুগ্ধ হলো। যারা ল্গানের পদগুলি শোনেনি তারা পাশের লোককে জিজ্ঞাসা করে জানতে লাগলো।
অন্ধকার পথে বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে গানের পদগুলি রামচন্দ্রর মনে পড়লো। ছেলেদের ছেলেমানুষির সম্মুখে আসা উচিত নয়, হাসিকে দমন করার জন্য গোঁফ চারিয়ে দিয়েছিলো সে। কিন্তু হাসি নয় সবটুকু। আবার তার সেই অনুভব হলো। বুকের ভিতর চাপা আগুন হাঁ-হাঁ করে জ্বলে উঠলো। সেখানে আগুনলাগা বাড়ির মতো কী যেন একটা ভেঙে পড়বে। তার মেয়ের মৃত্যুর সঙ্গেও কি গৌণভাবে চৈতন্য সাহাদের অদ্ভুত ব্যবসার যোগ নেই? লার কাছে আটকে যাওয়া কান্নায় রামচন্দ্রর বুকপাট ফোঁপানোর মতো দুলে দুলে উঠলো।
এর আগেও চৈত্রসংক্রান্তির জন্য গ্রামে গান বাঁধা হতো। এই গ্রামে ছিলো নবীন, সে নিজের পরিচয় দিতো—নব্নে বুড়ো গাঁয়ের খুঁড়ো। সে-ই বাঁধতে গান। দুর্ভিক্ষের প্রায় প্রথম গ্রাসে সে গিয়েছে। আর কেউ গান বাঁধেনি গত বছর। নবীন বুড়োর গানের বৈশিষ্ট্যও ছিলো, জমিতে স্ত্রীজাতির দোষগুণ, দুর্বলতা, সোহাগ-প্রিয়তা আরোপিত করার রীতি সে-ই প্রথম এই অঞ্চলে চালু করেছিলো।
