ফতেমা ঘর থেকে বেরুলো। ভয়ে ভয়ে কিন্তু সুচিন্তিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বললো, হুজুর, ও আমার ছাওয়াল।
তোর ছেলে?
জে।
এমন সময়ে ঘরের পিছন থেকে রজব আলি আত্মপ্রকাশ করলো।
সেলাম।
কে? আরে তুমি রজব আলি না? কনক ঘোড়া থেকে নামলো। বেঁচে আছো? খুব খুশী হলাম তোমাকে দেখে। তোমার ছেলের আর কোনো খোঁজই পাওনি, না? বড়ো বুড়িয়ে গেলে তুমি। তোমার এখানে একটু বসি। না, না, ব্যস্ত হয়োনা। ইয়াজকে বললো কনক, ঘোড়াটাকে বাঁধ আর ওর জিনের তলা থেকে আলগা গদিটা খুলে আন।
ঘরের ছায়ায় জিন-এর গদিতে বুটপরা পা দুখানা ছড়িয়ে বসলো কনক। চুরুট টানতে টানতে সকলের খোঁজ খবর নিলো। ফতেমাকে উপদেশ দিলো, ছেলে ঘরে রাখতে হলে টুকটুকে বউ। এনে দিতে হবে।
সবচাইতে কৌতুকের খবর এই দিলো সে, যে তার এলাকা এখন অনেক বড়ো এবং সে এই এলাকার মধ্যে আরও অনেক সান্দারের খোঁজ পেয়েছে। তাদের মধ্যে এখনো কেউ কেউ চুরিচামারি করে ভালোই আছে, কিছু অন্য ধরনেরও আছে। সে নিজে স্থির করেছে তাদের মধ্যে যাদের পরিবার আছে তাদের কাউকে কাউকে এনে বুধেডাঙায় বসানো যায় কিনা চেষ্টা করবে। তারা এলে সান্দারদের আবার লোকবল হয়। কোনো বলই নেই, সেটা হলে তবু কিছু হলো।
প্রায় আধ ঘণ্টা পরে ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে কনকের বিবেকটা বোধহয় কামড়ালো। সে একটু ঝুঁকে পড়ে রজব আলিকে প্রশ্ন করলো, এদিকে একটা বড়ো ধরনের চুরি, মানে, লুঠ হয়েছে। নাকি?
লুঠ?
হ্যাঁ। এক গাড়ি তেল চিনি কাপড়।
রজব আলি বললো, লুঠ হয় নাই। লুঠ করবার মতো একজনই হইছিলো, সে ইয়াকুব। সে তো নাই।
কনক চলে যাওয়ার পর ইয়াজ বললো, সুরা, শুনলা না দারোগা সাহেব কী কলো? এ গাঁয়ে সত্যি নোক আসবি?
তা আনবের পারে কনকদারোগা।
ইয়াজ কী ভাবতে লাগলো। কয়েকদিন পরে ইয়াজ বললো, জমি লিবো একটু। সুরো, চরনকাশির বুড়া মিঞার কাছে আমাক একটু নিয়ে যাবা?
ফতেমা বললো, ট্যাকা লাগে। হাল বলদ কেনা লাগে।
ইয়াজের মুখ ফ্যাকাশে হলে গেলো।
পরিহাস করে সুরতুন বললো, মাছের ব্যবসা কর গা।
মাছের ব্যবসা?
ওই যে সেদিন কী বুনলি, তাই দিয়ে মাছ ধর গা।
বিদ্রূপটা ইয়াজ বুঝতে পারলো, ক্রোধে তার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
কিন্তু ইয়াজের যেন ইতিমধ্যে জ্ঞান হয়েছে, জমি ক্রোধের চাইতে মূল্যবান। সে রজব আলির কাছাকাছি গিয়ে তামাক সাজতে বসলো। বললো, নানা, জমি লিবো একটু।
‘নানা’ সম্বোধনটা রজব আলির কানে লেগেছিলো, একটুপরে বোধ হয় বুকে গিয়েও বিধলো। হাতের কাছে একটা বাখারি পড়ে ছিলো, সেটা উদ্যত করে সেশাসিয়ে উঠলো, শালা রে শালা! কোনকার কোন অনজাতের চারা। তুই কি সান্দার? তুই কি ইয়াকুবের ছাওয়াল!
তা নানা, একটু সরে বাখারির আওতার বাইরে বসে বললো ইয়াজ, তা নানা, ধরো যে আমি তোমার ইয়াকুবের ছাওয়াল না হলাম। ফতেমা আমার আম্মা কিনা শুধাও।
কথা বলতে বলতেই সেক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিলো,বললো, তাঁ, আজই তার ফায়সালা করা।
একটা উদাসীন নিস্পৃহভাব যেন রুক্ষ বুধেডাঙায় ইতস্তত ছড়ানো আছে। সেটা সুরতুনকে অধিকার করে কখনোবা কয়েক মুহূর্তের জন্য, কখনো দু-একটি দিন তার প্রভাব থাকে। কতকটা যেন দূরে সরে যাওয়ার মতো ব্যাপার। দূরে সরে এলে অনেকসময়ে কোনো কোনো বিষয়ের সমগ্র রূপটা চোখে পড়ে। সমগ্র বুধেডাঙা যেন একত্রে মনে ধরা যায়। কনকদারোগা বলে গেছে তার এক্তিয়ার থেকে সান্দার কুড়িয়ে এনে এনে এখানে জমা করবে। মানুষ যেন গাছের চারা। আগুনে পুড়ে গেছে, সেখানে লাগানোর জন্য অন্য জায়গা থেকে কুতি: আনা চারাগাছ লাগানো হচ্ছে, আর ইয়াজ যেন বাতাসে ভেসে আসা বীজ।
অন্য আর একদিন এই তুলনাটা পূর্বশ্রুত গল্পের মতো মনে পড়লো সুরতুনের। সে তখন নিজের কথা ভাবছিলো। আমনের চারার মতো সযত্নে মাধাইয়ের স্নেহে লালন করে কোনো এক বোকা চাষী তাকে এই কাশের খেতে বুনে দিয়েছে।
একটা বিরক্তিবোধ তাকে হিংস্র করলো। বনবিড়ালটার কথা মনে পড়লো তার। ধরতে গেলে ফ্যাঁসফ্যাঁস করে উঠেছিলো, শেষে তার হাত আঁচড়ে দিয়ে পালিয়েছে। ইয়াজ ব্যাপারটায় হো হো করে হেসে উঠেছিলো। পরে সে নিজেও সে হাসিতে যোগ দিয়েছিলো। যতদিন তার পা সারেনি অন্ধকারে মাচার তলে পড়ে থাকতো। কেউ দয়া করে আহার্য দিলে খেত। দিঘার ওদিকে কোন বনে জন্ম। বুধেভাঙা ও চিকন্দির জঙ্গলে কেউ তার পরিচিত নয়, কিন্তু সে কি একা একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে না?
কিন্তু আকস্মিকভাবে মনে পড়ে : আর মাধাই—
হায় মাধাই!
ময়লা আঁচলে চোখ মুছতে গিয়ে আর-কিছু বালি পড়লো চোখে। হায়, হায়! মাধাই তো আসমানের জুন!
আর সে নিজে তত বনবিড়াল নয়!
২৫. মাধাই ভেবেছিলো গাড়ি থেকে
মাধাই ভেবেছিলো গাড়ি থেকে সোজাসুজি গঙ্গায় গিয়ে নামবে। তার গাড়ি যখন গঙ্গার চড়ায় গিয়ে আটকালো তখন প্রভাতের সূচনা হচ্ছে। সারা রাত জেগে আসতে হয়েছে, চরে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা বাতাসে তার শীত শীত করে উঠলো। গঙ্গার বুকে কুয়াশার মতো দেখা যাচ্ছে। ওপারের পাহাড়ের গায়ে সিঁদুরে সূর্য ধাপে ধাপে পা ফেলে উঠছে। সেদিকে তাকিয়ে প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করার ইচ্ছা হলো তার। একবার মনে মনে সে বললো, সবই পবিত্র দেখি। কিন্তু উদীয়মান সূর্যের আলো তার চোখে বিধলো, জাগরণক্লান্ত চোখ করকর করে উঠলো।
