তুমি এখান থিকে যাও, যাও। আমাক বিপদে ফেলাবা।
সুরো, এক কাম করো। জয়নুল, কোলের মধ্যে লাফালি চড় খাবি কৈল। সুরো, তুমি এক কাম করো, তুমি জয়নুলেক একটুক রাখো, আমি সোভানেক নিয়ে আসি। সে আটকা পড়ছে।
কথাটা বলতে বলতে সম্ভবত সোভানের করুণ মুখখানা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো তার কাছে, জয়নুলকে সুরতুনের কোলে ঠেলে দিয়ে সে দৌড়ে চলে গেলো।
ইয়াজ চলে গেলে সুরতুন ভাবলো, সে তো ফতেমা নয়, সে কী করতে পারে। মোকামে যাওয়ার গাড়ির সময় হয়েছে, যদি এখনই ইয়াজ না আসে তার মোকামে যাওয়া হবে না। কিন্তু তার চাইতেও বড়ো কথা–পুলিস। এ সবের সন্ধানে পুলিস নিশ্চয়ই আসবে, এবং যদি তারা আসে তাকেও রেহাই দেবে না। সুরতুনের মনে হলো ইয়াজের তাকে চেনার কথা নয়। জয়নুলই নিশ্চয় তাকে চিনিয়ে দিয়েছে, তেমনি জয়নুলের উপস্থিতিই পুলিসকে নিশানা দিয়ে সাহায্য করবে।
সুরতুনের মোকামে যাওয়া হলো না। সে মনস্থির করার আগেই মোকামের গাড়ি চলে গেলো। অবশেষে টেপির মায়ের খোঁজে যাওয়াই উচিত বলে বোধ হলো তার। পুলিসের সঙ্গে কথা বলতে পারে এমন একজন পুরুষ অন্তত সেখানে আছে। জয়নুল ঠিক সেই মুহূর্তে যাত্রীদের কাছে ঘুরে ঘুরে পয়সা চেয়ে বেড়াচ্ছিলো। সুরতুন স্থির করলো এই সুযোগেই পালাতে হবে। ওভারব্রিজের উপরে কিছু দূরে উঠেই কিন্তু সে দেখতে পেলো জয়নুল তার পিছন পিছন ছুটে আসছে।
সে সন্ধ্যাতেও টেপির মা ফিরলোনা।বরং জয়নুলের খোঁজে ইয়াজ এলো সোভানকে নিয়ে।
সুরতুন বললো, এখানে আসছি জানলা কী করে?
ইয়াজ বললো, সে অনেকক্ষণ থেকেই সোভানকে নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে সুরতুনের দিকে লক্ষ্য রাখছিলো, সকলে একসঙ্গে ধরা পড়ার চাইতে যে কোনো একজন ধরা পড়া কম দুঃখের হবে বলেই সে কাছাকাছি আসেনি।
সুরতুন বললো, আমাক পুলিশে ধরবে কেন্?
তোমার সঙ্গে জয়নুল ছিলো। আর তা ছাড়া সেহারামি পুলিসেক কইছে, আমি তুমি জয়নুল সোভান সবই একদলের। ফতেমার নাকি দল।
উচ্ছ্রিত জানুর উপরে চিবুক রেখে নিঃশব্দে মুখোমুখি বসে রইলো ইয়াজ এবং সুরতুন। জয়নুল-সোভানের মুখেও কথা নেই।
সুরতুন একসময়ে প্রশ্ন করলো, যাক মারলা সে কে?
ইসমাইল কসাই। জয়নুলদের বাপ।
তাক মারলা কেন্? মারলাই যদি তবে তারই ছাওয়ালদের টানে বেড়াও কেন্? এরা তোমার কে?
এটাই ইয়াজেরও সব চাইতে গোলমাল লাগছে। ব্যাপারটা এই রকম : ফুলটুসির ছেলে সোভান-জয়নুল ইদানীং স্বাবলম্বী হয়েছিলো। প্ল্যাটফর্মে ঢুকবার পথের পাশে বসে তারা যাত্রীদের কাছে ভিক্ষা চায়। ভিক্ষালব্ধ পয়সায় তারা একটা হোটেলে খায়। এ সবের পরামর্শ ইয়াজই দিয়েছিলো। হোটেলের বাসি ভাত-তরকারি ফেলে দেওয়ার বদলে সস্তা দামে এই শিশু দুটির কাছে বিক্রি করা লাভজনক বলে হোটেলওয়ালা নজর মিঞা আপত্তি করে না। মদ চোলাই করার গোপন এক কন্ট্রাক্ট নিয়ে ইসমাইলের অবস্থা হলে একটু ভালো হয়েছে। পশ্চিমী রইসদের রক্ত তার শরীরে আছে এটা প্রমাণিত করা কঠিন নয় তার পক্ষে, এই হয়েছে তার বর্তমান মনোভাব। নজর মিঞার হোটেলে বসে কাল সন্ধ্যায় এরকম কথাই হচ্ছিলো। যদি আত্মগরিমার প্রচারমাত্র হতে ক্ষতি ছিলো না, কিন্তু গোলাপি নেশার আমেজে ইসমাইলের মনে হয়েছিলো উপস্থিত সকলকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে তারা তার তুলনায়। নীচস্তরের লোক।
নজর হাসতে হাসতে বলেছিলো, তা আর বলতে! ছাওয়ালরা যখন ভিক্ষে করে খায় তখন অযুধ্যার লওয়াব ছাড়া আর কী বলা যায়।
কী, আমার ছেলে ভিক্ষে করে খায়! দিশি ভাষায় এইটুকু বলে লাফিয়ে উঠলো খাঁ সাহেব। বাড়ি ফিরে সে জয়নুল-সোভানকে ধমকে দিলো, খবরদার, ভিমাবেনা।ব্যাপারটা জয়নুল সোভানের কাছে শুনে ইয়াজ বলেছিলো, কেন, খাতে দিবি বুঝি?
আজ সকালে জয়নুলরা ভিক্ষার কৌটা নিয়ে বেরুতে গিয়ে খাঁসাহেবের সম্মুখে পড়ে গিয়েছিলো। খাঁ সাহেব হেঁকে বললো, কাহা যাতা?
সোভান-জয়নুল হক শুনে উঠোনে থেমে গিয়েছিলো। শাসনের প্রথম কিস্তি হিসাবে দুজনের দু গালে দুটি চাটি মেরে ইসমাইল খাঁ খানদানি উর্দু ঝাড়লো, ইলিস কা বাচ্চা, কালি কুত্তিকি বেটা।
হাঁকাহাঁকিতে ইয়াজের ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো। চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এসে সে। বললো কৌতুক করে, খুব যে চুত্তপুস্ত। ব্যাপার কি?
চপ শালে বেতমিজ। তু শিখলায়া।
দ্যাখো, গাল দিয়ো না কয়ে দিলাম। ভিক্ষা করবি নে তো তুমি কি খাতে দিবা?
বেশখ।
সখ করে ও কাম কেউ করে না। ইয়াজ বললো।
চপ্ বেওকুফ।
ইয়াজ হাসবার চেষ্টা করলো কিন্তু তার আগে খসাহেব জয়নুল আর সোভানকে দ্বিতীয় কিস্তি শাসনে ভূমিসাৎ করো দিলো।
হঠাৎ কী হলো ইয়াজের, সেও লাফিয়ে পড়লো উঠোনে। ইসমাইল খাঁ তৃতীয় কিস্তি শাসনের জন্য একটা চেলাকাঠ হাতে করতেই ইয়াজও একটা লাঠি নিয়ে রুখে দাঁড়ালো। বহু দিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিলো ইয়াজের। আবাল্য নির্দয়ভাবে প্রহৃত হয়েছে সে। তার গরঠিকানা জন্ম নিয়ে চাঁচামেচি করেও যখন ইসমাইল থামলো না বরং চেলাকাঠটাকে ব্যবহার করার জন্য জয়নুলের দিকে এগিয়ে এলো, তখন ইয়াজ লাঠিটা দিয়ে খাসাহেবকে এক ঘা বসিয়ে দিলো।
সুরতুনের প্রশ্নে এটুকু বলে ইয়াজ নির্বাক হয়ে গিয়েছিলো। জয়নুল, সোভান, ফুলটুসি, ইসমাইল আর সে নিজে কী একটা গুঢ়সূত্রে একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। জয়নুল ও সোভান ফুলটুসি-ইসমাইলের সন্তান এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য বাল্যকালে ফুলটুসি ও ইয়াজ যাকে আম্মা বলতো সেই বৃদ্ধা ইসমাইলকে স্বামী হিসাবে স্বীকার করেছিলো।
