মিঃ এতরা, এটা জানার জন্যে আমাদেরকে শার্লক হোমস হবার প্রয়োজন হয় না। আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবার জন্যে দুজন গিয়েছিলেন ইতালি। তারা ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে জেনেছে আপনি ইংল্যান্ডের টিকিট কেটেছেন। আমি তাই এখানকার হোটেলগুলিতে খোঁজ করেছি। আপনি যদি অন্য কোনো নামে হোটেল রিজার্ভেশন করতেন, তা হলে অবিশ্যি আমার পক্ষে খুঁজে বের করা সম্ভব হত না।
আমি অন্য নামে সিট রিজার্ভ করব কেন?
কথার কথা বলছি মিঃ এতরা। অবিশ্যি ইচ্ছা থাকলেও আপনি তা পারতেন না। কারণ হোটেল সিট রিজার্ভেশনের সময় বিদেশী নাগরিকদের পাসপোর্ট দেখাতে হয়।
এতরা সিগারেট ধরাল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।
মিঃ এতরা, এখন কি আমি দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
না, এখন পারেন না। আমি খুবই ক্লান্ত। আপনাকে কাল আসতে হবে। রাত নটা আলোচনার জন্যে ভালো সময় নয়।
রেমন্ড কিন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, আমি কাল সকালে আসব। বিরক্ত করার জন্যে অত্যন্ত দুঃখিত।
দশটার পর আসবেন। আমি অনেক দেরি করে উঠি।
আমি আসব ঠিক সাড়ে দশটায়। ইতালি সম্পর্কে কিছু গল্পগুজবও করা যাবে।
ইতালি সম্পর্কে গল্পগুজব করার কিছু নেই।
থাকবে না কেন? আমি দুদিন আগের খবর জানি সেখানে জামশেদ নামের একটি লোক গ্রেফতার হয়েছে পুলিশের কাছে। এ নিয়ে ইতালিতে তুমুল উত্তেজনা।
এতরা চাপা স্বরে বলল, জামশেদ গ্রেফতার হয়েছে?
হ্যাঁ, হয়েছে। আমরা জামশেদের ব্যাপারেও উৎসাহী। অ্যানির ইনস্যুরেন্সের বিষয়ে ওকেও দরকার। কাজেই আমরা ওর ব্যাপারে খোঁজ রাখার চেষ্টা করছি। মিঃ এতরা!
বলুন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনিও জামশেদের ব্যাপারে বেশ উৎসাহী।
না, আমি উৎসাহী নই। আমি উৎসাহী হব কীজন্যে?
ও, সরি। আমারই ভুল হয়েছে। আচ্ছা মিঃ এতরা, আমরা কাল ভোরে কথা বলব।
দশটার পর।
ঠিক সাড়ে দশটায় আমি আসব। গুড নাইট।
এতরা টেলিফোনে ব্রুম সার্ভিসকে কফি দিতে বলল। তার দুমিনিট পরেই বলল কফি দেবার প্রয়োজন নেই। তার কিছুই ভালো লাগছে না। তার কেন জানি প্রচণ্ড ভয় করতে লাগল। ইংল্যান্ডে আসার পরিকল্পনাটি কাঁচা। তার উচিত ছিল দেশেই থাকা। দেশে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরো জোরদার করা যেত।
এখন ফিরে গেলে কেমন হয়? কাল সকাল দশটার আগেই রওনা হয়ে গেলে মন্দ হয় না। ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ঐ ছাগলটির সঙ্গে কোনো কথা বলার ইচ্ছে হচ্ছে না।
এতরা রাত তিনটায় হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এল। ভোর সাড়ে চারটায় ফ্রান্সের কনকর্ডের একটি টিকিট পাওয়া গেছে। সেখান থেকে বাসে করে ইতালি চলে যাওয়া যাবে। ভালো লাগছে না, কিছুই ভালো লাগছে না।
২২.
জামশেদ সমস্ত দিন শুয়ে রইল।
প্রচণ্ড খিদে। কিন্তু কোনো খাবার নেই। এক জগ পানি ছিল তা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। জামশেদের শুয়ে থাকা কিংবা বসে বসে বদ্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আরকিছু করবার নেই। চুপচাপ বসে থাকার ব্যাপারটি খুবই বিরক্তিকর। জামশেদ ঘুমুতে চেষ্টা করছে। কিন্তু ঘুম আসছে না। স্নায়ু উত্তেজিত। সে মনে-মনে পরবর্তী পরিকল্পনা ঝালিয়ে নিতে গিয়ে বাধা পেল। পরবর্তী পরিকল্পনা করাও অর্থহীন। এখান থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। অলৌকিক কোনো ব্যাপার বা সৌভাগ্য এসব জিনিসে জামশেদের বিশ্বাস নেই। কাজেই পরবর্তী কোনো পরিকল্পনা তৈরির আগে বরং মৃত্যুর জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নেয়াই ভালো।
কী হয় মৃত্যুর পর? মৃত্যুর ওপারেও কি কোনো জগৎ আছে? সুখী কোনো ভুবন? যেখানে কষ্ট নামক ব্যাপারটি মেই। ক্ষুধার কষ্ট নেই। গ্লানি ও বঞ্চনার কষ্ট নেই। আনন্দ ও উল্লাসের একটি অপরূপ ভুবন। ভাবতে ভাবতে জামশেদের ঘুম এসে গেল। অদ্ভুত একটি স্বপ্ন দেখল সে।
যেন অ্যানি ছুটতে ছুটতে আসছে, তার বদ্ধ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, এই ভালুক, তুমি এখানে আটকা পড়ে আছ কেন?
বুদ্ধির দোষে আটকা পড়েছি।
এমন বোকা কেন তুমি?
অ্যানি মাথা দুলিয়ে খুব হাসতে লাগল। রিনরিনে মিষ্টি গলায় হাসি। ঘুম ভেঙে উঠে বসল জামশেদ।
এখন কি দিন না রাত বোঝার উপায় নেই। ঘরে সবসময় বাতি জ্বলছে। কোনোরকম শব্দটও কানে এসে পৌঁছাচ্ছে না। ক্ষুধার তীব্রতাও ক্রমে ক্রমে মরে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে এই ধরে সে আছে আটচল্লিশ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। ত্রিশ ঘণ্টা পার হলে খিদে মরে যায়। শুধু তৃষ্ণা থাকে। তৃষ্ণাও কমে আসে পঞ্চাশ ঘণ্টায়।
না খেয়ে থাকার অভিজ্ঞতা জামশেদের আছে। একবার সে এবং বেন ওয়াটসন না খেয়ে সাত দিন ছিল। সে ছিল একটি ছেলেমানুষি ব্যাপার। বেন ওয়াটসন একদিন বলল, জামস, একটা বাজি ধরলে কেমন হয়?
কিসের বাজি?
না খেয়ে থাকায় বাজি। কে বেশি সময় থাকতে পারে।
কত টাকা বাজি?
পঞ্চাশ ইউ এস ডলার।
ঠিক আছে।
বেন ওয়াটসনের কাজই হচ্ছে বাজি ধরা। সবকিছুতেই সে একটা বাজি ধরে ফেলবে। এবং অবধারিতভাবে হারবে। না খেয়ে থাকার বাজিতেও তা-ই হল।
ত্রিশ ঘণ্টার মাথায় ওয়াটসন পঞ্চাশ ডলারের নোট এনে মুখ কালো করে বলল, আবার হারলাম। এসো এবার খানাপিনা করা যাক।
জামশেদ বলল, তুমি খাওয়াদাওয়া করো। আমি দেখতে চাই না-খেয়ে কতদিন থাকা যায়।
আর দেখাদেখি কী, তুমি তো জিতবেই।
বাজি-টাজি না। পরীক্ষা করতে চাই, না-খেয়ে কতদিন থাকা যায়।
