জামশেদ ঝুলে রইল সাতদিন পর্যন্ত। বেন ওয়াটসন চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। সামান্য বাজি ধরা থেকে এ কী ঝামেলায় পড়া গেল! শেষমেশ পাঁচশো ডলার নিয়ে সাধাসাধি, যেন জামশেদ কিছু-একটা মুখে দেয়। ইস, কীসব দিন গিয়েছে!
সে বিছানায় উঠে বসল। আবার শুয়ে পড়ল। উঠে বসা এবং শুয়ে থাকা এই দুটি মাত্র কাজ তার। প্রথম দিকে খানিক হাঁটাহাঁটি করা যেত, এখন আর যায় না। শোয়ামাত্রই ঝিমুনি এসে গেল জামশেদের। আর প্রায় তার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল অ্যানি দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মুখ কেমন যেন বিষণ্ণ। কথা বলছে টেনে টেনে।
বুড়ো ভালুক।
উঁ
খুব কষ্ট হচ্ছে?
তা হচ্ছে, অ্যানি।
মানুষের এত কষ্ট কেন বুড়ো ভালুক?
কী জানি অ্যানি।
আমি কারোর কষ্ট দেখতে পারি না। খুব কান্না পায়।
জামশেদের মনে হল অ্যানি কাঁদতে শুরু করেছে। সে হাত বাড়াল অ্যানিকে সান্ত্বনা দিতে, তখনই তন্দ্রা কেটে গেল। আবার সেই আগের ছোট্ট ঘর। চল্লিশ পাওয়ারের হলুদ একটা বাতি। জামশেদের পেটে পাক দিয়ে উঠল। বমি হবে বোধহয়। হয়, এরকম হয়। একটা সময় আসে যখন শরীর বিদ্রোহ করতে শুরু করে। চোখ কিছু দেখতে চায় না। পা চলতে চায় না। মস্তিষ্ক স্থবির হয়ে আসে। জামশেদ মেঝেতে বমি করল।
.
বস ভিকানডিয়া ঠাপ্তস্বরে বলল, একটি লোক হাওয়া হয়ে যেতে পারে না।
ফাজিন জবাব দিল না।
লোকটি নিশ্চয়ই কোনো মন্ত্রটন্ত্র জানে না। নাকি তোমরা বলতে চাও সে অলৌকিক ক্ষমতাধর কোনো মানুষ?
সে খুব সম্ভব ইতালিতে নেই। ইতালিতে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তাকে খোঁজা হয়নি। আমার ধারণা সে জীবিত নেই।
এরকম ধারণা হবার কারণ কী?
কোনো কারণ নেই, আমার মনে হচ্ছে এরকম।
কারণ ছাড়াই যারা বিভিন্ন জিনিস ভাবে ওরা ছাগল সম্প্রদায়ভুক্ত বলেই আমি মনে করি।
ফাজিন কিছু বলল না।
ভিকানডিয়া তিক্তস্বরে বলল : ওর বন্ধু ওয়াটসন কী বলছে?
ও কিছুই বলছে না।
বলাবার চেষ্টা করেছ?
হ্যাঁ করেছি। পেন্টাথল ইনজেকশন দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ও কিছু জানে না। জানলে বলত।
কী বলে সে?
সে বলে যে ওর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে জামশেদ ওর সঙ্গে দুরাত ছিল।
সেই দুরাত ওদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে?
বিশেষ কোনো কথাবার্তা হয়নি। জামশেদ কথা বলে কম।
ভিকামডিয়া চুরুট ধরাল।
ফাজিন বলল, ওয়াটসনকে নিয়ে এখন কী করব?
আমাকে জিজ্ঞেস করছ? এইসব ছোট জিনিস নিয়ে কেন তোমরা আমাকে বিরক্ত কর? যদি দেখ ওকে ধরে রেখে আর কোনো লাভ নেই তা হলে আপদ বিদেয় করো। বস্তায় ভরতি করে ফেলে দাও সমুদ্রে।
.
ভিকির অবস্থা খারাপ হয়েছে। খাওয়াদাওয়া বন্ধ। রাতে ঘুমুতে পারে না। সমস্ত রাত বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে থাকে। রুন দিশাহারা হয়ে গেল। ডাক্তাররা তেমন কিছু ধরতে পারেন না। মানসিক অসুস্থতার কোনো লক্ষণ নেই। ডাক্তারদের সঙ্গে কথাবার্তা সহজ স্বাভাবিক মানুষের মতো। কিন্তু রুনের সঙ্গে কথা বলার সময় কথা জড়িয়ে যায়। একটি কথা শুরু করে অন্য একটি কথায় চলে যায়। রুন কয়েকবার চেষ্টা করেছে ভিকিকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডের দিকে যেতে। বাইরে হয়তো অন্যরকম হবে। আবার হয়তো ভিকি আগের মতো হয়ে উঠবে।
ভিকির ব্যবসা নষ্ট হয়ে গেছে তাতে কিছুই যায় আসে না। ব্যবসা আবার হবে। রুনের নিজের যথেষ্ট টাকা আছে। কোনোকিছু না করেই সে-টাকায় নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। অবিশ্যি পুরুষমানুষ বসে থাকতে পারে না। পুরুষমানুষদের কিছু-একটা করতে হয়। কাজেই আবার যাতে ভিকি উঠে দাঁড়াতে পারে রুন সে-চেষ্টা করবে।
রুন দেখল ভিকি উঠে আসছে। পা ফেলছে এলোমেলোভাবে। রুন এগিয়ে গিয়ে ভিকিকে ধরে ফেলল।
একটা অন্যায় করেছি, রুন। তোমাকে আজ সেটা বলতে চাই।
রুন বলল, অন্যায় করে থাকলে করেছ। আমরা সবাই কখনো-না-কখনো ভুল করি।
আমি যা করেছি সেটা তোমার শোনা দরকার।
আমি কিছুই শুনতে চাই না। আমি চাই তুমি আগের মতো হও।
রুন প্লিজ, আমার কথা শোনো।
না, কোনো কথা শুনতে চাই না আমি।
রুন ভিকিকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরল। ছেলেমানুষের মতো চেঁচিয়ে কাঁদতে লাগল ভিকি।
২৩.
জামশেদ তুমি বেঁচে আছ?
জামশেদ চোখ মেলল। পরিষ্কার কিছু দেখা যাচ্ছে না। সব যেন ঘোলাটে লাগছে।
আমি ক্যানটারেলা। তোমার জন্যে খাবার এনেছি। নাও, খাও। প্রথম খাও ফলের রস। তারপর দুখ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। শরীরে একটু শক্তি হোক আমি আবার আসিব।
জামশেদ কথাবার্তাও ঠিক বুঝতে পারছে না। তবুও সে উঠে বসতে চেষ্টা করল।
নড়াচড়া করবে না, শুয়ে থাকো। আমি দুঃখিত যে তোমাকে ছদিন না-খেয়ে থাকতে হল! উপায় ছিল না। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে গেলেই তোমাকে ওরা খুঁজে বের করে ফেলত। তবে আমি জানতাম ছদিনে তোমার কিছুই হবে না।
ক্যানটারেলা কমলার রস জামশেদের মুখের কাছে ধরল। মৃদুস্বরে বলল, একসঙ্গে বেশি খাবে না, অল্প কিছু মুখে দাও। তারপর কিছু সময় বিশ্রাম করো। আবার কিছু খাও। একজন ডাক্তার নিয়ে এসেছি, সে বোধহয় তোমার শিরা দিয়ে কিছু খাবারদাবার ঢোকাবে।
জামশেদের মনে হল ক্যানটারেলার পাশে যেন অ্যানি দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। সে যেন বলছে, খাও, বুড়ো ভালুক, খাও। এমন বোকার মতো তাকিয়ে থেকো না।
