এবার বিদায় নেওয়া যাক।
বোসো।
সেটা কি উচিত হবে? রাত কম হয় নি।
তুমি আমাকে উচিত অনুচিত শেখাতে এস না।
নিজেও সরসী বসে। বসার পর একসঙ্গে বেশিক্ষণ রাজকুমারের মুখখানা দেখিতে না পারায় এদিক ওদিক চাহিতে চাহিতে বার বার তার মুখের দিকে তাকায়। রাজকুমার নীরবে প্রত্যাশা করিয়া থাকে। সরসীর কিছু বলিবার আছে অনেক আগেই সে তা অনুমান করিয়াছিল। তার কাছে কিছু আশা করিয়া সরসী সুযোগ পাইয়া এত রাত্রে তাকে খালি বাড়িতে ডাকিয়া আনে নাই, সরসীর কাছে এসব হঠাৎ পাওয়া সুযোগ সুবিধার কোনো মানে নাই। সেরকম ইচ্ছা থাকলে কবে সকলে বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রণ রাখিতে গেলে বাড়ি কঁকা হইবে সে ভরসায় বসিয়া না থাকিয়া রাজকুমারকে দিয়াই হয়তো সে খালি একটা বাড়ি ভাড়া করার ব্যবস্থা করিত। কোনো কারণে তাকে আজ সরসীর দরকার হইয়াছে। খুব সম্ভব তাকে কিছু বলিবে সরসী এবং যতক্ষণ মুখ ফুটিয়া না বলিবে, কি যে সে বলিতে চায় কেউ কল্পনাও করিতে পারিবে না।
সরসীর প্রকৃতি আসলে খুব সহজ ও সরল। দরকারি নির্দোষ মিথ্যা সে অনর্গল বলিতে পারে, আজ সন্ধ্যায়ও অনায়াসে লাগসই কৈফিয়ত রচনা করিয়া নিজেকে সাক্ষী দাঁড় করাইয়া রুক্মিণীর কাছে তার লজ্জা বচাইয়াছিল। বুদ্ধি তার ধারালো, মানুষের কাছে কাজ আদায় করার কোনো কৌশল বোধহয় তার অজানা নাই, সস্তা আবেগ তার কাছে এতটুকু প্রশ্রয় পায় না।
কাল থেকে তোমার কথাই ভাবছি রাজুদা।
কেন?
তুমি যেন কেমন হয়ে যাচ্ছ দিনকে দিন।
কেমন হয়ে যাচ্ছি?
কি রকম অস্থির দিশেহারা হয়ে পড়ছ। বেঁচে থাকতেই তোমার যেন ভালো লাগছে না, সব সময় একটা কষ্ট ভোগ করছ। অনেকদিন থেকেই তোমার এ ভাবটা লক্ষ করছি। কি হয়েছে তোমার?
রাজকুমার নীরবে মাথা নাড়িল।
সরসী ভ্রূ কুঁচকাইয়া একটু ভাবিল।–কি হয়েছে বুঝতে পারা আশ্চর্য নয়। কিন্তু কিছু যে তোমার হয়েছে তাও কি বুঝতে পার না? অসুখ হলে তো সব সময় জানা যায় না কি অসুখ হয়েছে, শরীরটা শুধু খারাপ লাগে। নিজের ভেতরে সেই রকম কিছু বোধ কর না? অসুখের কথা বলছি না? মনে তোমার কোনো রকম অস্বস্তি আছে, টের পাও না?
এসব কথা জিজ্ঞাসা করছ কেন সরসী?
বললাম না তোমার জন্য আমার ভাবনা হচ্ছে? রিণির কাছে সব শুনে—
তাই বল।
তুমি যা ভাবছ, তা নয়। রিণির কাছে সব শুনে আমার ভাবনা হয় নি, তার অনেক আগে থেকেই তোমার সাধারণ চালচলন কথাবার্তার ধরন দেখেই ভাবনা হয়েছে। তবে রিণির ব্যাপারটা না জানলে আমি হয়তো চুপ করে থাকতাম। মানুষের কত কি হয়, বিশেষ করে তোমার মত যারা নিজের মনের মধ্যেই বেশি করে বাঁচে। তোমার ভেতর কোনো একটা গুরুতর পরিবর্তন ঘটেছে, আস্তে আস্তে আবার সামঞ্জস্য হয়ে যাবে মনে করেছিলাম। একবার ভেবেছিলাম, লভে পড়েছ বুঝি, ছেলেখেলা নয়, আসল লভ। তারপর দেখলাম সে সব কিছু নয়।
কি করে জানলে সে সব কিছু নয়।
সে রোগের সিমটম আলাদা, আমরা চিনতে পারি। একটা মেয়েকে ভালবাসার মানে জান? সকলকে ভালবাসা, জীবনকে ভালবাসা, বেঁচে থাকতেই মজা লাগা। তুমি কাউকে ভালবাস না, নিজেকে পর্যন্ত নয়। সব সময় তুমি ছটফট করছ, কি করলে একটু স্বস্তি পাবে। সর্বস্ব হারিয়ে গেলে মানুষ যেমন পাগলের মতো খুঁজে খুঁজে বেড়ায়, তুমিও ঠিক তেমনিভাবে কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছ। থিয়োরি? তুমি পাগল রাজুদা। দেহের গড়নের সঙ্গে মানুষের প্রকৃতির সম্পর্ক কি তাই টেস্ট করার জন্য কেউ এভাবে ব্যাকুল হয়? তোমার আরো সিরিয়াস কিছু হয়েছে, এ শুধু তার একটা লক্ষণ। আমার কান্না পাচ্ছে বুঝতে পারছ?
সেটা সহজেই বোঝা যাইতেছিল। গলা ভারি হইয়া চোখ জলে ভরিয়া আসিয়াছে। রাজকুমার তাড়াতাড়ি বলিল, কেঁদ না সরসী। কান্না আমি সইতে পারি না।
কান্না পেলেই আমি কাঁদি নাকি?
তাই তো তোমায় ভালবাসি।
ভালবাস না, ছাই। পছন্দ কর। ভালবাসলে তো বেঁচে যেতে।
রাজকুমার করুণভাবে একটু হাসিল। সরসীকে সে পছন্দ করে, স্নেহ করে, একটু ভয়ও। করে। নিজের সম্বন্ধে এই স্পষ্ট ও সহজ কথাগুলি সরসী ছাড়া কারো কাছে সে শুনিতে পাই না। অনেক দিন হইতেই সরসী জানে তার ভিতরে কিছু একটা গোলমাল চলিতেছে। নিজের সম্বন্ধে নিজে সে কখনো এভাবে চিন্তা করে নাই। যখন এ বিষয়ে কিছু ভাবিয়াছে, স্থূল বাস্তব জগতের আপেক্ষিকতার মাপকাঠিতে বিচার করিয়া বুঝিতে চাহিয়াছে, ব্যাপারখানা কি। নিজের সম্বন্ধে যত কেন জাগিয়াছে, তার সবগুলির জবাব খুজিয়াছে যে অভিধানে শুধু সাধারণ চলতি মানে পাওয়া যায়। মুদির হিসাবে যেন সুখ-দুঃখের হিসাব করিয়াছে। ভূমিকম্পের কারণ খুঁজিয়াছে মাটির উপরে। আরো যে অনেক উষ্ণ গহন স্তর আছে মাটির নিচে এ যেন সে ভুলিয়াই গিয়াছিল। আজ সরসী মনে পড়াইয়া দিয়াছে। গভীর কৃতজ্ঞতায় অনেকদিন পরে রাজকুমারের হৃদয়গ্ৰন্থিতে স্রাব হয় চোখের জলের মতো নোনতা সুস্বাদু রসের, শুকনো মন একটু ভিজিয়া ওঠে।
সরসী বলিল, এত বড় হলে বসতে ভালো লাগছে না? উপরে যাবে? চল।
উপরে দুটি পাশাপাশি ঘর সরসীর, একটিতে সে বসে, অপরটিতে শোয়। মাঝখানে একটি দরজা আছে, ঘর দুটির ব্যবধান বজায় রাখতে দরজাটি সে অধিকাংশ সময় বন্ধ করিয়া রাখে, সামনের বারান্দা ঘুরিয়া যাতায়াত করে এঘর হইতে ওঘরে।
বসিবার ঘরে রাজকুমারকে বসাইয়া সে বাহিরে চলিয়া গেল। একপাশে একটি চারকোনা টেবিলে সরসী লেখাপড়া করে, তার সভা-সমিতির কাগজপত্রেই টেবিলের অর্ধেকটা ভরিয়া আছে। ছোট একটি শেলফে বাছা বাছা বই, প্রত্যেকটি বই রাজকুমারের পড়া। নির্বিচারে ভালোমন্দ সব বই পড়ার সময় সরসীর হয় না। রাজকুমারের সঙ্গে তাই তার বন্দোবস্ত আছে, রাজকুমার নিজে পড়িয়া যে সব বই তাকে পড়িতে বলে শুধু সেই বইগুলিই সে পড়ে তার জ্ঞানবুদ্ধির আয়ত্তের বাহিরের বইগুলি ছাড়া। এ ঘরে প্রায়ই অনেক মেয়ে জড়ো হয়, সোফা চেয়ারে ঘরটি একটু ঠাসিয়া ফেলিতে হইয়াছে। জানালার কাছে গেরুয়া আস্তরণ ঢাকা একটি ইজিচেয়ার, সরসী ওখানে বিশ্রাম করে। আস্তরণে মাথার চুলের দাগ পড়িয়াছে টের পাওয়া যায়। সারাদিন ছোটাছুটির পর ওখানে চিৎ হইয়া শ্ৰান্ত সরসী না জানি কি ভাবে! দশজনের সঙ্গে সরসীর কারবার, সর্বদা সে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে, দু-চারজন সঙ্গিনী সারাদিন তার আছেই। সরসীকে এই ঘরে একা কল্পনা করিতে গিয়া রাজকুমারের মনে হয় সে যেন নিজেরই এক রহস্যময় ভাবপ্রবণতাকে প্রশ্রয় দিতেছে।
