সরসীর ফিরতে দেরি হইতেছিল। এত রাত্রে তাকে একা বসাইয়া কি করিতেছে সরসী? আত্মসংবরণ করিতেছে? রাজকুমার নিজের কাছেই মাথা নাড়ে। যতই বিচলিত হোক সামলাইয়া উঠিতে সরসীর সময় লাগে না, নির্জনতার প্রয়োজন হয় না। নিচে তার যখন কান্না আসিয়াছিল তখনো এক মিনিটের জন্য উঠিয়া গিয়া কাঁদিয়া অথবা কান্না থামাইয়া আসিতে হয় নাই।
রাজকুমার মৃদুস্বরে ডাকে, সরসী?
পাশের ঘর হইতে সরসী সাড়া দেয়, আসছি।
কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হয় সরসীর গলা। নিচে অত সহজে যে কান্না সে আটকাইয়াছিল, ও ঘরে গিয়া সত্য সত্যই তবে কি সেই কান্নাই সে কাদিতেছে? রাজকুমার কাঠ হইয়া বসিয়া থাকে। রিণির কাছে তার খাপছাড়া প্রস্তাবের বিবরণ শুনিয়া এমন আঘাত লাগিয়াছে সরসীর মনে? রিণিকে কথাটা বলার আগে সে শুধু ভাবিয়াছিল, এসব কানে গেলে মালতী কত কষ্ট পাইবে। সরসীর কথা তার মনেও আসে নাই। শেষ পর্যন্ত আঘাতটা তবে পাইল সরসী?
রাজকুমার ভাবিয়াছিল, সরসী বাহির হইতে ঘরে আসিবে। শোবার ঘরের দরজা খোলার শব্দে সেদিকে চাহিয়া তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হইয়া গেল।
সরসী আগাইয়া আসিল আরো কয়েক পা।
রিণির মতো রং নেই, আমি কালো। তবু ভাবলাম, তুমি তো রং দেখতে চাও না—
তুমি কাঁপছ সরসী।
মনের জোরে কুলোচ্ছে না। কি মনে হচ্ছে জান? ছুটে গিয়ে খাটে তোশক গদির নিচে ঢুকে। পড়ি। কিছু ভাবা আর করার মধ্যে কত তফাত! তখন থেকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছি, তুমি না ডাকলে দরজা খুলতেই পারতাম না।
তুমি বড় সুন্দর সরসী।
চুপ। ওসব বল না। দম আটকে মরে যাব।
মরবে না, শোন। তোমার শরীর এমন সুন্দর বলে তোমার মনটাও সুন্দর। তোমায় এখন আমি প্রণাম করতে পারি, জান?
অনির্বচনীয় আনন্দে রাজকুমারের চিত্ত ভরিয়া যায়, নিরবসন্ন সক্রিয় শান্তির মতো এক অপূর্ব অনুভূতি জাগে। শক্তি ও সহিষ্ণুতার যেন সীমা নাই। শ্রদ্ধা, মমতা, কৃতজ্ঞতা আর সহানুভূতি মেশানো যে মনোভাব সরসীর প্রতি জাগে প্রেমের চেয়ে তা বোধহয় কম জোরালো নয়। সরসী তাকে বোঝে, বিশ্বাস করে। ব্যাখ্যা করিয়া সরসীকে তার কিছু বুঝাইতে হয় নাই, রিণির কাছে তার বক্তব্যের ভাঙাচোরা বিকৃত বিবরণ শুনিয়া সে যতটুকু বুঝিতে পারিয়াছে তাই মনে করিয়াছে যথেষ্ট। আর জেরা করে নাই, তর্ক তোলে নাই, নিজের হইয়া ওকালতি করার যন্ত্রণা তাকে দেয়। নাই, বিনা ভূমিকায় নিজের দেহটি তাকে দেখিতে দিয়াছে। সরসী ছাড়া আর কেউ তা পারিত না।
সরসীর মুখ বিবৰ্ণ হইয়াই ছিল, ধীরে ধীরে কখন আপনা হইতে তার চোখ বুজিয়া যায়, আর খোলে না।
এবার যাও সরসী।
তোমার কাজ হয়েছে? এসেছি যখন, মাঝখানে পালিয়ে গিয়ে লাভ হবে না। আর দু-তিন মিনিট কোনো রকমে সইতে পারব।
আর দরকার নেই।
সরসী শোয়র ঘরে গিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দেয়। কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না কিন্তু বোঝা যায় দরজার কাছেই সে দাঁড়াইয়া আছে। বোধহয় দম নিতেছে।
এবার তুমি যাও রাজুদা। আজ আর তোমায় মুখ দেখাতে পারব না।
আচ্ছা।
লছমনকে ডেকে দিয়ে যেও।
আচ্ছা। সরসী?
না-না-না। বল না রাজুদা। রাস্তায় নেবে গেলেই দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
এতক্ষণ পরে তোমার ভয় হল সরসী? সামনে থেকে সরে গিয়ে? আমি অন্য কথা বলছিলাম।
কি কথা?
আমি কাউকে ভালবাসি না।
সে তো আমিই তোমাকে বলেছি একটু আগে।
তুমি বললে কি হবে, আমি তো জানতাম না। আজ জানতে পেরেছি। তোমায় একটা সার্টিফিকেট দিয়ে যাই। তোমার শরীর আর মন শুধু সুন্দর নয়, তুমি ভালো, তোমার বেঁচে থাকা সাৰ্থক। তুমি আমাকে উঁচুতে তুলে দিয়েছ। তোমার সাহায্য না পেলে কোনোদিন হয়তো সেখানে উঠতে পারতাম না সরসী। তুমি আমার আরেকটা উপকার করেছ সরসী। গিরির ব্যাপারটা জান?
জানি।
ব্যাপারটা তুচ্ছ করে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছি কিন্তু শকটা কোনোমতে কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। একটা জ্বালা বরাবর থেকে গিয়েছিল। তুমি আজ জ্বালাটা দূর করে দিলে। মনে মনে কতখানি কষ্ট পাচ্ছিলাম এতদিন ভালো বুঝতে পারি নি, এখন মন শান্ত হয়েছে, এখন বুঝতে পারছি। কোনো মেয়ের সংস্পর্শে এলেই আপনা থেকে মনে হত, এও গিরির জাতের জীবন, এর মধ্যেও নিশ্চয় খানিকটা গিরির উপাদান আছে। তোমার সম্বন্ধে পর্যন্ত তাই মনে হত। যুক্তি দিয়ে। বুঝতাম অন্য রকম, কিন্তু কিছুতে চিন্তাটা ঠেকাতে পারতাম না। তুমি আজ আমার বিকারটা কাটিয়ে দিয়েছ সরসী।
একটু দাঁড়াও রাজুদা, যেও না।
কয়েক মিনিট পরে সাধারণ একটি শাড়ি পরিয়া ক্যাম্বিশের জুতা পায়ে দিয়া সরসী এ ঘরে আসিল।
জোরে জোরে মাইল খানেক হেঁটে আসি চল? আজ রাতে নইলে ঘুম আসবে না।
রাজকুমার ভাবে, কারো কাছে সে কি কোনোদিন কোনো অপরাধ করে নাই, পৃথিবী অথবা স্বৰ্গ অথবা নরকবাসী কারো কাছে? যে অপরাধের অনুভূতি তাকে যন্ত্রণা দিতে পারে, যার প্রতিক্রিয়ায় জীবজগতে স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে কারো উপরে একটু বিদ্বেষের জ্বালা অনুভব করিতে পারে?
রাগ নাই, অভিমান নাই। একটি মানুষের উপরেও নয়। জড়বস্তুকেও মানুষ কখনো হিংসা করে, হোঁচট লাগিলে অন্ধ ক্রোধে ইটের উপর পদাঘাত করে, পুতুল হইলে একটি পুতুলের মুখ তার পছন্দমতো নয় বলিয়া যতটুকু বিরক্তি বোধ করা চলিত, তাও সে বোধ করে না। মানুষের মনের অন্ধকার ও দেহের শ্ৰীহীনতার অপরাধ সে ক্ষমা করিয়াছে। মানুষ যে কৃপণ তাতে তার কিছুই আসিয়া যায় না, কারণ, মানুষের কাছে সে কিছু চায় না।
