মেয়েটি একটু বোকা এবং অহঙ্কারী। মুখ দেখিয়া এটুকু বোঝা যায়। কাপড়ে পুঁটলি করা দেহটি দেখিয়া অনুমান করা যায় ভোতা, অনাড়ম্বর, নিষ্ক্রিয় প্রেমের সে উপযোগী। নীরবে অনেকটা নির্জীব পুতুলের মতো নিজেকে দান করার জন্য সে চব্বিশ ঘণ্টা প্রস্তুত হইয়া থাকিবে; ধীরেনের যখন খুশি গ্রহণ করিবে যখন খুশি করিবে না, তার দিক হইতে কখনো কোনো দাবি আসিবে না, কোনো সাড়া পাওয়া যাইবে না। স্বামীর সঙ্গে অন্তরালের জীবনটিও প্রথম হইতেই তার কাছে হইয়া থাকিবে প্রকাশ্য উঠা-বসা-চলা-ফেরার জীবনের মতোই বাঁচিয়া থাকার নিছক একটা অঙ্গ মাত্র, আবেগ ও রোমাঞ্চের বাড়াবাড়ি যাতে বিকারের শামিল। দাবি সে করিবে সুখ, সুবিধা ও অধিকার, কর্তৃত্ব সে করিবে অনেক বিষয়ে, সংসারে নিজের স্থানটি দখল করিতে কারো সাহায্যের তার দরকার হইবে না, তার হুকুমেই ধীরেন উঠিবে বসিবে। নিস্তেজ প্ৰাণহীন শুধু হইয়া থাকিবে। স্বামীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
মেয়েটির সম্বন্ধে আরো অনেক কিছু হয়তো স্পষ্টভাবে জানা যাইত, যদি–
মনের চোখে সেইভাবেই দেখিয়াছে। একটু বাড়াবাড়ি হইয়া যাইতেছে না, বিবাহের আসরে বন্ধুর কনেকে পর্যন্ত এরকম অভদ্ৰভাবে কল্পনা করা? এ দিকটা রাজকুমারের একবার খেয়ালও হয়। নাই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক আবেষ্টনীতে মেয়েটির জীবনে কি বৈশিষ্ট্য থাকিবে সেই অনুমানেই মশগুল হইয়া গিয়াছিল। কাপড়-ঢাকা দেহ দেখিয়া কতটুকুই বা বুঝিতে পারা যায়? দশ মিনিটের জন্য যদি ভগবান যেমন সৃষ্টি করিয়াছেন ঠিক তেমনি অবস্থায় মেয়েটিকে সে দেখিতে পাইত! বন্ধুর দাম্পত্য জীবনের সমস্ত ভবিষ্যৎ ইতিহাস তার জানা হইয়া যাইত।
এগারটার সময় সরসী কোথা হইতে আসিয়া বলিল, আমায় বাড়ি পৌঁছে দেবে চল।
ওরা?
ওরা পরে যাবে-শ্যামলের সঙ্গে।
ওরা দেরি করছে কেন?
আড্ডা দিচ্ছে, এখনো খেতেও বসে নি।
তুমি খেয়েছ?
সন্দেশ মিষ্টি খেয়েছি, আমি নেমন্তন্ন খাই না।
এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে আমার মিল আছে। আমি অবশ্য ঘরোয়া নেমন্তন্ন খাই, তুমি বললে তোমার বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসব। ভোজ কখনো খাই না।
কিছু খেয়েছ তো?
কই আর খেলাম? দুবার ডাকতে এল, আমি বললাম, সকলের সঙ্গে বসব না। ব্যস, কেউ আর টু শব্দটি করল না।
তুমি বড় ছেলেমানুষ রাজু। বিয়ে বাড়ি, পাঁচ-সাত শ লোক খাবে, প্রত্যেকের বিষয়ে অমন করে খোঁজখবর রাখতে পারে? বললে না কেন তোমায় কিছু এনে দিতে? আমি বসব না মশায়, আমায় একটা প্লেটে সামান্য কিছু এনে দিন, এ কথাটা আর মুখ ফুটে বলতে পারলে না!
কথাটা ওদের বলাই উচিত ছিল না?
তোমরাই আবার মেয়েদের সেন্টিমেন্টাল বল। সরসী হাসিয়া ফেলিল, আমি বলে দিচ্ছি, কিছু খেয়ে নাও। খিদে পেয়েছে নিশ্চয়?
নিশ্চয়?
রাজকুমারকে খাবার দেওয়ার কথা বলিতে সরসী কিন্তু যায় না, খোপা ঠিক করার অবসরে কত কি যেন ভাবিয়া নেয়।
তার চেয়ে আমার বাড়ি গিয়ে খাবে চল।
বাঁচালে সরসী। লক্ষ্মী মেয়ে। হাটে বসে খাবার গিলতে সত্যি আমার কষ্ট হয়, সেন্টিমেন্টাল বল আর যাই বল।
আমি কিন্তু এ সব হাটে বসে দশজনের সঙ্গেই খেতে ভালবাসি, রাজু। তোমায় মিছে। বলেছিলাম, আমি খুব নেমন্তন্ন খাই। তোমায় বাড়ি নিয়ে যাব বলে না খেয়ে ওদের আগে চলে এসেছি।
বল কি সরসী? আমায় তো সাবধান হতে হবে।
তুমি আবার অসাবধান কবে? বাস তো কর দুর্গে, সাবধান আবার হবে কি?
কিসের দুর্গ সরসী? কার দুর্গ?
তোমার নিজের দুর্গ। কিসের তা জানি না।
কথার কথা? কে জানে! বুঝিতে না পারিয়া রাজকুমার একটু বিরক্তি বোধ করিতে লাগিল। জিজ্ঞাসা করিয়া কথাটা স্পষ্ট করিতেও বাঁধ বাঁধ ঠেকিতে লাগিল। সরসীর ইঙ্গিত তার জিজ্ঞাসা করিয়াই বোঝা উচিত।
সরসীদের বাড়ির সকলেই বিয়েবাড়িতে গিয়াছিল, কেবল কেদার সকাল সকাল ফিরিয়া শুইয়া পড়িয়াছেন। রাত তিনটায় কাশিতে কাশিতে তার ঘুম ভাঙিবে, তার আগে ভদ্রলোকের আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়ার সম্ভাবনা নাই।
চাকর দরজা খুলিয়া দিয়া হুকুমের জন্য দাঁড়াইয়া রহিল। সরসী বলিল, তুই শো গে যা লছমন।
একটু পুরোনো ধাচের বড় চারকোনা বাড়ি, ঘরগুলি প্রকাণ্ড। নিচের হলটিতে রীতিমধ্যে সভা বসানো চলে। এই হলে রাজকুমারকে বসাইয়া সরসী খুঁজিয়া পাতিয়া নানারকম খাবার আনিয়া হাজির করিল।
পেট ভরেই খাও। এখন একবার খেয়ে বাড়ি গিয়ে আর খাবার দরকার নেই।
পেট ভরে না খেলেও বাড়ি গিয়ে আর খেতাম না সরসী।
এখনো তোমার হজমের গোলমাল হয়?
সাবধান থাকলে হয় না।
খুব গুণের কথা হল, না? এই বয়সে বুড়োদের মতো খাওয়ার বিষয়ে সাবধান হয়ে চলতে হবে? তুমি একেবারে একসারসাইজ কর না। সারা দিন শুয়ে বসে ঘরের কোণে কাটালে মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক থাকে?
সেজন্য খুব বেশি আসত যেত না সরসী। আসল কারণ হল, এক কালে খুব একসারসাইজ করতাম, হঠাৎ ছেড়ে দিয়েছি। চিরকালের আলসে লোকের শুয়ে বসে থাকাটা দিব্যি সয়ে যায়, হঠাৎ একদিন আলসে হলেই বিপদ।
ছাড়লে কেন? আবার তো ধরতে পার?
ধরব। শিগগির ধরব। দু-চার দিনের মধ্যে।
অতিরিক্ত আগ্রহের সঙ্গে রাজকুমারের কথা বলার ধরনে সরসী একটু আশ্চর্য হইয়া যায়। সে যেন সরসীর কাছে প্রতিজ্ঞা করিতেছে, দেহকে আর অবহেলা করিবে না, অবিলম্বে ব্যায়াম আরম্ভ করিবে। অপরাধের বিলম্বিত প্ৰায়শ্চিত্ত করার মতো। রাজকুমারের খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত সরসী আর কথা বলে না, নীরবে তাকে দেখিয়া যায়। সেটা বিস্ময়কর ঠেকে রাজকুমারের কাছে।
