ডাক্তার রুদ্র চমকে উঠলেন।
সঞ্জয় হেসে বলল, ও কিছু নয়। একটা মাতাল যাচ্ছে। রোজই এই সময়ে যায়।
বলে ব্যালকনির ধারে গিয়ে দাঁড়াল।
ডাক্তার রুদ্র হেসে বললেন, কি দেখছ? রাতের কলকাতার শোভা?
সঞ্জয় বলল, না। মাতালটার গলা শুনেছি, দেখিনি কখনো। তাই
–দেখতে পেলে?
–হ্যাঁ, ঐ যে যাচ্ছে–ঠিক যেন একটা ছায়ামূর্তি।
মাতালটা চলে গেল। সঞ্জয় তবু দাঁড়িয়ে রইল।
নিস্তব্ধ রাত। বাড়ির পিছনে কম্পাউন্ডের গায়ে বনঝাপের মধ্যে রাতকানা একটা পাখির পাখা ঝাঁপটানো। ও দিকে যশোর রোডের মসৃণ দেহের ওপর দিয়ে গর্জন করতে করতে মাঝেমধ্যে ছুটছে লরি। স্ট্রীট-লাইটের আলোয় ঝলমল করছে রাস্তাটা।
গোটা বাড়িটা গভীর রাতে একটা রহস্যপুরীর মতো দাঁড়িয়ে। কত নিশ্চিন্তে নিচের তলায় মহিমাবাবু, অমৃতবাবুরা ঘুমোচ্ছেন। দোতলার ঘরে উদ্ভিন্নযৌবনা কিশোরীটি কি কোনো সুখস্বপ্ন দেখছে?
–আচ্ছা সঞ্জয়, বাড়িটার ওপর ওরকম মধ্যযুগীয় গম্বুজটা কেন ভেবেছ কখনো?
না। ও আর ভাবব কি? বাড়িওয়ালার শখ।
সঞ্জয় চেয়ারে বসল।
–কিন্তু কোন যুগের মানুষের এইরকম শখ ছিল?
–তা বলতে পারব না।
-সঠিক বলতে না পারলেও অনুমান করা যায় এ তল্লাটে এত পুরনো বাড়ি আর নেই। যদিও পরে অনেক অল্টারেশান হয়েছে।
–হ্যাঁ, তা হয়েছে। তবে তিন তলাটা এখনো ইনকমপ্লিট। আর সিঁড়িটা
সঞ্জয় প্রচণ্ড জোরে নিজের গালে একটা চড় মেরে বলে উঠল–উঃ! মশায় অস্থির করে দিল। এ অঞ্চলের মশা! এদের কামড়ই আলাদা।
–আচ্ছা, মিস থাম্পি বাড়িটা সম্বন্ধে কিছু বলেননি?
সঞ্জয় ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ বলেছেন। তাঁর মতে এখানে কিছু আছে।
উনি এ কথা বলেছেন?
সঞ্জয় হাই তুলে হালকা মেজাজে বলল, হ্যাঁ, উনি যেখানেই যান সেখানেই কিছুর সন্ধান পান বোধ হয়। মার এক বান্ধবীর বাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানেও অশরীরী আত্মা দেখেছিলেন।
–তাই নাকি?
–হ্যাঁ। তবে এখানে কিছু দেখার ভাগ্য তার হয়নি। বুঝতে পেরেছিলেন।
ডাক্তার রুদ্র চোখ বুজিয়ে কিছু ভাবতে লাগলেন। হঠাৎ একসময়ে তিনি চমকে উঠলেন।
–কিছু শুনতে পাচ্ছ? ডাঃ রুদ্রর স্বরটা কেমন চাপা।
মশার ঐকতান ছাড়া আর তো কিছু শুনছি না।
ডাক্তার রুদ্র চুপ করে রইলেন। সঞ্জয়ও আর কিছু বলল না। জোর করে একটা হাই তুলল।
আরো কিছুক্ষণ কাটল। ডাক্তার রুদ্র হঠাৎ র্যাগটা খুলে ফেললেন।
–কি হল? এই ঠাণ্ডায় র্যাগ খুললেন কেন?
কেমন একটা গরম হাওয়া বইছে না?
সঞ্জয় চোখ বুজিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল, গরম বা ঠাণ্ডা কোনো হাওয়াই তো পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীটা হাওয়াশূন্য হয়ে গেছে।
–কিন্তু, আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
যা ঘটছে তা শুধু রাত্রিজাগরণ।
ডাক্তার রুদ্র এবার হাই তুললেন। বললেন, তা বটে। আমারও এখন ঘুম পাচ্ছে।
সঞ্জয় ব্যালকনির পাঁচিলে দু পা তুলে চেয়ারে শরীরের আধখানা বিছিয়ে দিয়ে বলল, ঘুমোন তবে। ঘুমেই আরাম ঘুমেই শান্তি। ঘুমের তুল্য জিনিস নেই।
–আশ্চর্য, এত মনের জোর করেও ঘুম আটকাতে পারছি না। এমন কখনো হয় না। কিন্তু ঘুমোলে চলবে না। কটা বাজল? নিজেকে যেন নিজেই প্রশ্ন করলেন রুদ্র। সাবধানে টর্চের আলোয় ঘড়িটা দেখলেন।
–just two, কিন্তু নিচের ঘড়িতে দুটো বাজল না তো?
সঞ্জয় চোখ বুজিয়েই বলল–বোধহয় শুনতে পাইনি।
–কিন্তু–এইটেই সময়। ঠিক দুটোতেই তো—
রুদ্র উঠে দাঁড়ালেন।
রীণাকে একবার দেখে আসি।
সঞ্জয়ও উঠে পড়ল।
ঠিক সেই সময়ে ঘরের মধ্যে পুপু ককিয়ে কেঁদে উঠল। সেই কান্না শুনে সঞ্জয়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল কাকাবাবু, শীগগির–
বলে দৌড়ে ঘরের দিকে গেল।
দুটো ঘরই অন্ধকার। সঞ্জয় যখন বসার ঘরের সুইচ হাতড়াচ্ছে ডাক্তার রুদ্র ততক্ষণে ভেতরের ঘরে ঢুকে পড়েছেন।
ঢুকেই তিনি সুইচে হাত দিলেন। আলো জ্বলল না। দেওয়ালে ধাক্কা লেগে টচটা হাত থেকে কোথায় ছিটকে পড়ল।
–লোডশেডিং! সঞ্জয়, টচটা–শীগগির
সঙ্গে সঙ্গে সঞ্জয়ের হাতের টর্চের আলো ঝলকে উঠল। সেই আলো গিয়ে পড়ল রীণার বিছানায়। দেখল রীণার মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত ঝুলছে খাট থেকে। লেপটা পড়ে আছে মাটিতে।
কয়েক মুহূর্ত….।
সঞ্জয়ের পা দুখানা যেন মেঝের সঙ্গে আটকে গিয়েছে।
সঞ্জয়ের হাত থেকে টর্চটা ছিনিয়ে নিয়ে রুদ্র ছুটে গেলেন রীণার কাছে। এক হাতে টর্চ। অন্য হাতে কোনোরকমে তুলে ধরলেন মাথাটা।
তাড়াতাড়ি এসো।
সঞ্জয় এগিয়ে এল। ওর হাত দুটো তখন কাঁপছে।
–পা দুটো ধরো। ওদিক থেকে ধরো–dont get nervous.
সঞ্জয় বিছানার ওপর উঠে রীণার পা দুটো ধরল।
–এবার লম্বালম্বিভাবে শোওয়াতে হবে। দাঁড়াও-বালিশটা দিই-উঃ! আলোটাও এই সময়ে গেল! না, আলো তো দেখছি শুধু এ বাড়িতেই গেছে–ও কী! তুমি ওরকম করছ কেন? সরো। বলে ধমকে উঠলেন।
রীণাকে বিছানায় ঠিকমতো শুইয়ে দিয়ে রুদ্র নিজেই লেপটা তুলে রীণার গায়ে দিয়ে দিলেন।
লণ্ঠনটা জ্বালো। কী হল? দাঁড়িয়ে রইলে কেন?
–ও বোধহয় আর নেই।
কী যা-তা বকছু! ধমকে উঠলেন রুদ্র। আমার স্টেথস্কোপটা–লণ্ঠনটা জ্বালো না।
লণ্ঠনটা কোনোরকমে জ্বেলে দিয়ে সঞ্জয় বাইরের ঘরে গিয়ে পুপুর কাছে বসে রইল।
পুপু তখনো ফুলে ফুলে কাঁদছে।
ডাঃ রুদ্র স্টেথস্কোপ নিয়ে ঝুঁকে পড়লেন।
মিনিটের পর মিনিট কাটতে লাগল। রুদ্ধনিঃশ্বাসে সঞ্জয় বসে রইল অন্ধকারে।
