সঞ্জয় মাটিতে মশারি টাঙিয়ে পুপুকে নিয়ে শুয়েছিল। বলল, ততক্ষণ একটু ঘুমিয়ে নেবেন ভাবছেন?
–না, এখনই ঘুমনো নয়। আগে রীণার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। বলে ব্যাগটা নিয়ে ডাক্তার রুদ্র ভেতরে গেলেন।
মিনিট দশেক পরে বাইরে এসে বসলেন। সঞ্জয়কে বললেন, একটা ইনজেকশান দিলাম। গভীর ঘুমের মধ্যে থাকুক। তেমন কিছু ঘটলেও জানতে পারবে না।
.
বারোটা বাজল।
ডাক্তার রুদ্র বইটা মুড়ে চেয়ারের ওপর রাখলেন। টেবিল থেকে প্রেসার মাপার যন্ত্রটা নিয়ে রীণার ঘরে ঢুকলেন।
পুপু উসখুস করছিল। পিঠ চাপড়ে ওকে আবার ঘুম পাড়িয়ে সঞ্জয় যখন বিছানা থেকে বেরিয়ে এল ডাঃ রুদ্র তখন রীণাকে পরীক্ষা করে ফিরে এসেছেন।
-কেমন দেখলেন?
–একই রকম। তবে ঘুমোচ্ছ। আচ্ছা, এবার তুমি ওর ঘরের আলোটা নিভিয়ে দাও।
–একেবারেই নিভিয়ে দেব, না নীল বালবটা
–না, একেবারে অন্ধকার করে দাও।
সঞ্জয় একটু অবাক হল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। আলো নিভিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল।
–এবার চলো আমরা বাইরে গিয়ে বসি।
–বাইরে? কেন?
–শোনো সঞ্জয়, আজ যখন রাত্তিরটা এখানে থেকেই গেলাম তখন একটু বিশেষ করে লক্ষ্য করতে চাই, সত্যিই কিছু ঘটে কি না!
এত মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যেও সঞ্জয় একটু হাসল। বলল, কিছু ঘটলেও তো আপনি আমি দেখতে পাব না।
–কি করে জানছ? এর আগে যখনই ঘটনা ঘটেছে তখন তোমরা ঘুমোও। জেগে থাকলে হয়তো কিছু দেখতে না পাও, বুঝতে পারতে।
সঞ্জয় আবার হাসল।তার জন্যে আমরা রীণাকে, পুপুকে একলা ফেলে বাইরে যাব? সেটা কি উচিত হবে?
হু, এ ঘরটাও খালি রাখতে হবে।
–এই শীতে আমরা বাইরে কোথায় বসব?
–ব্যালকনিতে, ঐখানেই আমরা বসব। বলে নিজেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বাইরে চলে এলেন। অগত্যা সঞ্জয়কেও আর একটা চেয়ার নিয়ে বসতে হল।
যাক, সিঁড়ি থেকে রীণার ঘর পর্যন্ত সব ফঁকা। ডাঃ রুদ্র যেন বেশ খুশি হলেন।
–আপনি কি ভেবে রেখেছেন তিনি এলে আমরা সিঁড়ির মুখেই জাপটে ধরব?
সঞ্জয়ের বলার ভঙ্গিটা বিদ্রপের মতো শোনাল।
–না, তা নয়। spirit যাতে বিনা বাধায় রীণার কাছে যেতে পারে তার জন্যেই এই ব্যবস্থা।
সঞ্জয় গরম চাদরে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে বলল, spirit যদি সত্যি আসতে চায় সে কি কোনো বাধা মানবে? রীণা যখন তাকে দেখেছিল ঘরের দরজা কি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল না?
রুদ্র বললেন, সে বাধা অন্য। আমি বলছি ঘরের মধ্যে একাধিক লোক জেগে বসে থাকলে স্পিরিট কিছুতেই আসে না। আমার মনে হয়, মানুষ যেমন প্রেতের ভয় পায়–প্রেতরাও তেমনি মানুষকে ভয় পায়। দুর্বল একাকী মানুষই তাই প্রেতের শিকার হয়। যাক, টচটা নিয়েছ তো?
–হ্যাঁ। বলে বড়ো টর্চটা রুদ্রের হাতে দিল।
কয়েক মিনিট দুজনেই চুপচাপ। ডাঃ রুদ্র একটা চুরুট ধরালেন। বললেন, এখনকার মতো একটা চুরুট খেয়ে নিই। এরপর আর খাওয়া যাবে না। চুরুটের আগুন এমনকি গন্ধও হয়তো স্পিরিটের আসার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
–আচ্ছা, spirit-এর আসার জন্যে আমরা ব্যাকুলই বা হচ্ছি কেন? সে তো আমাদের আনন্দদান করতে আসবে না।
ডাঃ রুদ্র বললেন, spirit যদি সত্যিই তার কথা রাখে তা হলে যা ঘটবার তা আজই ঘটে যাক। নইলে তো আবার অনিশ্চিন্তে আর একটা দিনের অপেক্ষা করতে হবে।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। হঠাৎ ঘরের ভেতরে মনে হল রীণা জেগে উঠেছে।
ও কি ডাকছে? সঞ্জয় গায়ের র্যাগ ফেলে রেখে ছুটল। পিছনে ডাক্তার রুদ্র।
সঞ্জয় আলো জ্বালল। দেখল রীণা উসখুস করছে আর মুখে অস্বস্তির একরকম শব্দ। লেপটা মাটিতে পড়ে গেছে।
সঞ্জয় লেপটা তুলে ভালো করে গায়ে ঢাকা দিয়ে কিছুক্ষণ রীণার কাছে বসে রইল।
–এবার এসো।
সঞ্জয় উঠে এল।
–আলোটা নিভোও।
অগত্যা সঞ্জয়কে আলো নিভিয়ে দিতে হল। বাইরের ঘরে এসে মশারির মধ্যে টর্চ ফেলে একবার পুপুকে দেখে নিল সঞ্জয়। না, পুপু নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।
দুজনে আবার বসল।
নিশুতি শীতের রাত থমথম করছে। পরিষ্কার নীল আকাশের গায়ে তারাগুলোর রহস্যময় নিঃশব্দ হাসি।
সঞ্জয় বলল, আমি এখনো এসব বিশ্বাস করি না। সত্যি কথা বলতে কি থ্রিল অনুভব করলেও জানি না এমন কেন মনে হচ্ছে যে, আমরা বড়োই অসহায়। তার ওপর নিরস্ত্র।
ডাক্তার রুদ্র হেসে বললেন, অশরীরীদের মোকাবিলা করতে রিভলভার কোনো কাজে লাগে না–এই টই একমাত্র অস্ত্র।
.
আরও কতক্ষণ কেটে গেল। নিচে কারো ঘরে দেওয়াল-ঘড়িতে ঠং করে শব্দ হল। সঞ্জয় চমকে উঠল। কটা বাজল? একটা না দেড়টা?
–দেড়টা। বলে ডাক্তার রুদ্র হাতের আড়াল দিয়ে আলগা করে টর্চের বোতাম টিপে রিস্টওয়াচটা দেখে নিলেন।
–দেড়টা! তা হলে একটা বাজল কখন?
ডাক্তার রুদ্র বললেন, তুমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলে।
সঞ্জয় লম্বা আলিস্যি ভাঙল।
–সত্যি আমি আর পারছি না। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। শুধু শুধু
সঞ্জয় কথা আর শেষ করল না। ডা
ক্তার রুদ্র গম্ভীর স্বরে বললেন, হোক শুধু শুধু। এছাড়া উপায়ও ছিল না। আজ এই শনিবারের রাত্রিটা ছিল রীণার পক্ষে মারাত্মক। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রীণার এতক্ষণ কী হত বলতে পারি না।
–তা হলে আপনি বলছেন, আমরা পাহারা দিচ্ছি বলে আজ আর কিছু হবে না?
–না হওয়াই স্বাভাবিক। যদি হয়ও মারাত্মক কিছু হবার আগেই আমরা গিয়ে পড়ব।
এমনি সময়ে দূরে বড়ো রাস্তায় একটা খ্যানখেনে বিকৃত গলার চিৎকার শোনা গেল।
