ডক্টর জিল্লুর বললেন, এটা কোনো মগের মুলুক না। এখানে বিচার-আচার আছে। ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেওয়া কোনো বিচার না।
আতর বলল, সাঁতার জানেন না। স্যার?
না।
পানিতে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার। আপনি পানিতে নেমে সাঁতার শিখবেন। মাইনাস টু ফর্মুলা আপনাআপনি হয়েছে। আপনাকে দিয়ে হবে মাইন্যাস থ্রি ফর্মুলা।
যাত্রীরা মহা উৎসাহে চিৎকার শুরু করল, মাইনাস থ্রি। মাইনাস থ্রি।
ডক্টর জিলুর বললেন, এখানে বিচক্ষণ কেউ আছেন যিনি মাস হিস্টরিয়া বন্ধ করতে পারেন? প্লিজ হেলপ। প্লিজ।
তৃষ্ণা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি যাও। আতর মিয়া তোমার কথা শুনবে। আমি বললাম, এখনো সময় হয় নি।
তৃষ্ণা বলল, সময় কখন হবে? পানিতে ফেলে দেওয়ার পর?
হতে পারে।
মানুষ ধরে ধরে পানিতে ফেলবে। আর তুমি নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে?
আমি বললাম, মানুষের একটাই ভূমিকা। দর্শকের ভূমিকা। প্রকৃতি মানুষকে তৈরি করেছে শুধুই দেখার জন্যে। আশেপাশে নানা ঘটনা ঘটবে, সে দেখবে।
তৃষ্ণা বলল, মানুষ ঘটনায় অংশগ্রহণ করবে না?
না করাই বাঞ্ছনীয়।
কোঁকর কোঁ করে মোরগ ডেকে উঠল। আমরা চমকে তাকালাম। রশীদ খানকে ধরে আনা হয়েছে। তার পকেটের মোরগ ডেকেই যাচ্ছে।
রশীদ বুদ্ধিমান মানুষ। কী ঘটনা আঁচ করতে পারছে। ধনবান মানুষরা নিজের ধন রক্ষা করার প্রবণতাতেই সর্ব সমস্যায় আপোষে চলে যায়। রশীদ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমাকে কী জন্যে ডেকেছেন বলুন।
আতর বলল, আপনি সারা জীবনে যা যা পাপ করেছেন এইসব আমরা শুনব।
রশীদ খান বললেন, আপনারা ভালো কথা শুনবেন। খারাপ কথা কেন শুনবেন? বরং আপনি দুটা ভালো কথা বলেন আমরা শুনি।
আতর খানিকটা হকচকিয়ে গেল। রশীদ খান বললেন, লঞ্চ ড়ুবে যাচ্ছে এরকম একটা গুজব উঠেছে। এই গুজবের কারণে সবার মাথা এলোমেলো। লঞ্চ সত্যি সত্যি ড়ুবে গেলে আমরা কীভাবে সবাই বাঁচব এখন সেই চেষ্টা করা উচিত। কে কী পাপ করেছে এইসব নিয়ে আলোচনা না। পাপ তো সবাই করে। কেউ ছোট পাপ, কেউ বড় পাপ। পাপের বিচারের মালিক তো আপনি না। বিচার হবে রোজহাশরে। ঠিক বলেছি?
ড. জিলুর উঁচু গলায় বললেন, অবশ্যই ঠিক বলেছেন। Right words at the right time.
রশীদ খানের পকেটে আবারও কোঁকর কোঁ শুরু হয়েছে। তিনি পকেট থেকে মোবাইল বের করে পানিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেন, যা ব্যাট পানিতে ড়ুবে কোঁকর কোঁ করতে থাক।
তার এই নাটক ভালো কাজ করল। দর্শকদের অনেকেই হেসে উঠল। বোঝা যাচ্ছে রশীদ খান তার দিকের পাল্লা ভারী করছেন। মাস সাইকোলজি বলে, মহা বিপদে জনতার সিদ্ধান্ত অতি ক্ষুদ্র ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে বদলায়। বড় বড় ঘটনায় তেমন কিছু হয় না। মোবাইল পানিতে ফেলে দেওয়া ক্ষুদ্র ঘটনা কিন্তু তার প্রভাব বড়।
রশীদ খান বললেন, আমাদের মহা বিপদ। এর মধ্যে এক ভাইকে দেখি বন্দুক নিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। একে পানিতে ফেলবেন তাকে পানিতে ফেলবেন বলে হামকি-ধামকি। আরে ভাই, বন্দুক কি আপনার একার আছে? অন্যের নাই? আমি চারটা গার্মেন্টসের মালিক। আমি কোনো প্রকেটশন ছাড়া লঞ্চে উঠব? হামজা কই?
হামজা এগিয়ে এল। বাংলা সিনেমার ফাইটারদের মতো তার চেহারা। মাথা চকচক করে কমানো। গলায় রুমাল বাধা। পরনে জিন্সের শার্ট-প্যান্ট। রশীদ খান বললেন, আমার বডিগার্ড। এর পকেটে একটা লুগার পিস্তল আছে। পিস্তলটা আমার। লাইসেন্স করা। হামজা, পিস্তলটিা বের করে পাবলিককে দেখা।
হামজা ওস্তাদের আদেশ মান্য করল। ফ্যাসফ্যাস গলায় বলল, কারো উপর ফায়ারিং করতে যদি হয় ইশারা দিবেন।
রশীদ খান বললেন, এখন খুন-খারাবির সময় না। এখন জানে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আমি সবার সহযোগিতা চাই। আপনারা আছেন আমার সঙ্গে?
বিকট ধ্বনি উঠল, আছি! আছি!
শিশু এবং মহিলাদের বাঁচানোর চেষ্টা আগে করতে হবে। টিনের কিছু কাটা ড্রাম আমি লঞ্চে উঠার সময় দেখেছি। শিশুদের এইসব ড্রামে তুলে দেওয়া হবে। তাদের বাবা-মা ড্রাম ধরে ভাসবেন।
রুস্তম আবার উদয় হয়েছে। তার চোখেমুখে আনন্দের ঝালকানি। আহত নেতার প্রত্যাবর্তন।
রশীদ খান বললেন, লঞ্চে আমি বেশকিছু অতি বৃদ্ধ যাত্রী দেখেছি। তাদের বিষয়ে কী করা যায় সেটা নিয়ে আমি চিন্তা করছি। আপাতত তারা এক জায়গায় গোল হয়ে বসে দোয়া ইউনুস পড়তে থাকুন। এই দোয়ার কারণে ইউনুস নবী মাছের পেট থেকে নাজাত পেয়েছিলেন। আমরাও ইনশাল্লাহ লঞ্চের পেট থেকে নাজাত পাব।
আতর মিয়া পিছিয়ে পড়েছে। পিছিয়ে পড়া ছাড়া গতি নাই। তার আবারও উদয় হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়, যদি না বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটে।
ঝড়-বৃষ্টি দুটাই সাময়িক কমেছে। সাময়িক বলছি কারণ আকাশে মেঘের স্তুপ বাড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাতেই মেঘের স্তুপের দেখা পাওয়া যাচ্ছে।
আমি এবং তৃষ্ণা এখন কেবিনে। কেবিনের দরজা খোলা। বাতাসে ৰূপাং করে একেকবার দরজা আছড়ে পড়ছে। আবার বন্ধ হচ্ছে।
তৃষ্ণা বলল, একের পর এক নাটক হচ্ছে। আমার কী যে অদ্ভুত লািগছে! আমি নিজে এক ঝড়ের কারণে কী পরিমাণ বদলেছি ভেবে অবাক হচ্ছি। কী রকম বদলেছি শুনতে চাও?
চাই।
আমি ক্লাস নাইনে যখন পড়ি তখনই ঠিক করেছি। জীবনে কখনো বিয়ে করুব না। এখন কী আশ্চর্য বর সঙ্গে নিয়ে ঘুরছি।
বর বলছি কেন? বিয়ে তো এখনো হয় নি!
হয় নি, হবে। যে কাজি ভেসে চলে গেছে সে আবারও ভেসে ফিরে আসবে। আমার সিক্সথ সেন্স তাই বলছে। আমার সিক্সথ সেন্সের ব্যাপারটা তুমি তো বিশ্বাসই করো না। পীর কুতুধি ফিরে এলে বিশ্বাস হবে তো?
