নতুন কোনো চাল দিয়ে আতর মিয়ার হাত থেকে ক্ষমতা কীভাবে নেওয়া যায় তা-ই রুস্তমের একমাত্র চিন্তা! মাথায় তেমন কোনো বুদ্ধি আসছে না।
লঞ্চের রেস্টুরেন্টের সামনে কিছু জায়গা খালি করা হয়েছে। এটাই এখন মঞ্চ বাঁ জনতার আদালত। মঞ্চে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আতর মিয়া।
আতর বলল, ভাইব্রাদার সবাই মন দিয়ে শুনেন। আমরা মহা বিপদে আছি। মাইনাস টু ফর্মুলা ঘটে গেছে। পীর সাহেব এবং ওসি সাহেব পানিতে পড়ে গেছেন। আপনারাও প্রস্তুত হয়ে যান। লঞ্চ অচল। শুরু হয়েছে ঝড়। এই ঝড় এখনো পাতলা। পাতলা ভাব থাকবে না। ঘন হবে। একতলায় বড় বড় সেগুন কাঠের টুকরা আছে। সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করবেন। দুজন দুজন করে একটা টুকরা বেছে নিবেন। হামলা হামলি বন্ধ। এক টুকরা পানিতে ফেললাম, পঞ্চাশজন তাতে ঝাপায়ে পড়বেন—তা হবে না। ক্লিয়ার?
কেউ কোনো শব্দ করল না।
রুস্তম বলল, আমার একটা কথা আছে।
আতর বলল, কী কথা?
আপনি এক নির্দেশ দিবেন, সেই নির্দেশে সবাই কাজ করবে তা তো হবে না। একটা কমিটি হবে। নির্দেশ যাবে কমিটির মাধ্যমে।
কমিটিটা করবে। কে?
জনগণ করবে। কমিটিতে আওয়ামী লীগ থেকে একজন থাকবে, বিএনপির একজন থাকবে। সুশীল সমাজ থেকে একজন থাকবে। নকল পিস্তল নিয়ে ফলাফলি করলে নেতা হওয়া যায় না।
আতর বলল, চুপ! আরেকটা শব্দ করলে গুল্লি। এই দেখা পিস্তল। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখ আসল। আমি নকলের কারবার করি না।
গুলি করবেন?
অবশ্যই করব। আমার চোখের দিকে তাকা। তাহলেই বুঝবি আমি যা বলি স্বতা-ই করি; যা বলি না। তাও করি।
রুস্তম সমর্থন আদায়ের জন্যে এদিক-ওদিক তাকাল। সবাই খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। সমর্থন পাওয়া গেল না। রুস্তম বলল, আপনি আপনার মতো কাজ করেন। আমি লঞ্চের ডেকে আছি। তেমন কোনো প্রয়োজন হলে ডাকবেন।
আতর বলল, কানো ধর। কানে ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যা। আর আসবি কানো ধরব?
কানে ধরব।
অবশ্যই কালে ধরবি।
যাত্রীদের একজন বলল, কানো ধরতে বলছে কানে ধরে চলে যান। ঝামেলা করেন কী জন্য? আছি বিপদে এর মধ্যে শুরু করেছেন ঝামেলা।
যাত্রীদের একটা বড় অংশ বলল, কানো ধরা। কানো ধর।
রুস্তম কানে ধরতেই হো হো হাসির শব্দ উঠল। বিপদের সময় ছোটখাটো মজাও অনেক মজাদার মনে হয়। কানে ধরে লিডারশ্ৰেণীর একজন মানুষ যাচ্ছে। দেখতেই ভালো লাগছে। একজন হাততালি দিল। তার দেখাদেখি অন্যরাও হাততালি দিতে লাগল।
আতর মিয়া হুঙ্কার দিল, হাততালি দেওয়ার মতো কিছু হয় নাই। বলেন, আল্লাহু আকবার। গলার ব্লগ ফাটায়ে চিৎকার দিবেন।
বিকট চিৎকার শোনা গেল, আল্লাহু আকবার!
আতর বলল, এই লঞ্চে কিছু দুষ্ট লোক আছে। এইসব দুষ্ট লোকের কারণে আল্লাহপাক আমাদের উপর নারাজ হয়েছেন। দুষ্টরা সবাই এক এক করে আসবে। জীবনে বড় পাপ কী করেছে নিজের মুখে বলবে। তারপর তওবা করবে। রাজি?
বিকট আওয়াজ উঠল, রাজি।
সবার আগে আমরা প্রফেসর সাহেবকে দিয়ে শুরু করব। প্রফেসর সাহেব চার নম্বর কেবিনে আছেন। তাকে ধরে নিয়ে আসেন। কেবিনের সব যাত্রী এখানে চলে আসবে। আজি সব এক। কেবিনের যাত্রী ডেকের যাত্রী বলে কিছু নাই। পূর্ণ সমাজতন্ত্র। বলেন, আলহামদুলিল্লাহ।
সবাই বলল, আলহামদুলিল্লাহ।
আতর বলল, মহা বিপদে লিড়ার লাগে। একজন। দুই-তিনজন লিডার মানে দুই-তিন রকম চিন্তাভাবনা। মহা বিপদে আমাদের একটাই চিন্তা—বাঁচতে হবে। ] চিৎকার দিয়ে বলেন, বাঁচতে হবে।
লঞ্চ কঁপিয়ে চিৎকার, বাঁচতে হবে! চিৎকারের কারণেই হয়তো লঞ্চ ডানদিক থেকে বাঁ দিকে কত হলো।
অধ্যাপক ডক্টর জিলুর খান পিএইচডি (গ্লাসগো) হতাশ চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। তাঁর ফ্রেঞ্চকািট আগেই খানিকটা ঝুলে ছিল, এখন আরও স্কুলে পড়ল। দুজন তাঁকে দুপাশ থেকে ধরে ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল।
জিলুর খান বললেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনারা আমার কাছে কী চান।
আতর মিয়া বলল, বড় বড় পাপ কী করেছেন সেটা বলবেন। তারপর তওবা করবেন।
Why?
সমাজের এইটাই সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত না মানলে লিখি দিয়ে পানিতে ফেলে। দেওয়া হবে। এইটাও সমাজের সিদ্ধান্ত।
সমাজটা কী? আমরাই সমাজ। দেরি করবেন না। তাড়াতাড়ি বলেন।
আমি অপরাধ করার মানুষ না। টুকটাক মিথ্যা হয়তো বলেছি, এর বেশি কিছু না।
এর বেশি কিছু না?
অবশ্যই না।
তাহলে স্যার কিছু মনে করবেন না। আপনাকে এখন আমি লাখি দিয়ে পানিতে ফেলব। কেউ যেন মনে না করে সমাজ একজন নির্দোষ মানুষকে শাস্তি দিচ্ছে। এই জ্ঞানী প্রফেসর অসামাজিক কার্যের জন্য তার এক ছাত্রী নিয়ে এসেছে। ছাত্রী নিজের মুখে কী ঘটনা ঘটেছে বলবে, তারপর সমাজ সিদ্ধান্ত নিবে। ছাত্রীর নাম সীমা। সীমা সিস্টার উপস্থিত আছেন। সিস্টার আসেন কিছু বলেন।
সীমা আতরের কাছে এগিয়ে গেল।
আতর বলল, আপনার ভয়ের কিছু নাই। আপনি আপনার স্যারের ফান্দে পড়েছেন। ভুল করেছেন। এখন বলেন। আপনি কি ভুল করেছেন?
সীমা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। আমরা যদি প্রফেসর সাহেবকে পানিতে ফেলে দেই আপনার আপত্তি আছে? সীমা চুপ করে রইল।
আতর বলল, সিস্টার, আমরা আপনার স্যারকে দুদিক থেকে ধরে রাখব। আপনি ধাক্কা দিয়ে আপনার স্যারকে পানিতে ফেলবেন। পারবেন না?
সীমা ভীত চোখে তাকিয়ে রইল। জবাব দিল না। আতর বলল, চোখ বন্ধ করে পীর বদরের নামে এক ধাক্কা। যাত্রীরা মহা উৎসাহে বলা শুরু করল, ধাক্কা ধাক্কা ধাক্কা।
