আয়না মজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, পারেন।
কাকে আনতে চাই জানতে চান?
না।
পুলিশের কাউকেও তো নিয়ে আসতে পারি। যেমন কবীর সাহেব। উনি ভালো খাওয়াদাওয়া পছন্দ করেন। তবে তার জন্যে খাবার শেষে টকা দৈ লাগবে।
আয়না মজিদ তাকিয়ে আছে। এর তোকানোয় বিশেষত্ব আছে। বিশেষত্বটা আগে ধরতে পারছিলাম না, এখন ধরলাম। আয়নী মজিদ যখন তাকায় তখন চোখে পলক ফেলে না। চোখে পলক ফেলার সময় হলে চোখ ফিরিয়ে নেয়। পলক ফেলার অংশটি সেই কারণে চোখে পড়ে না।
হিমু!
জি।
আপনার যাকে ইচ্ছা তাকে আনতে পারেন। আমি বুঝতে পারছি আপনি খেলা খেলতে চান। আপনি ভালো খেলোয়াড়। আমিও কিন্তু খারাপ না।
আমি বললাম, ডিনার কখন দেয়া হবে? কটায় কাটায় সেই সময় আসব। আগেও না পরেও না।
রাত দশটায়। যাকে আনবেন তার জন্যেই আমি তৈরি থাকব।
আয়না মজিদের কথাবার্তায় কাঠিন্য চলে এসেছে। কথাও বলছে দ্রুত। সে এক ধরনের টেনশন বোধ করছে। খেলার জন্যে সে তৈরি। ভয়ঙ্কর কোনো খেলাই সে আশা করছে। তাকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না।
পাঠক, অনুমান করুন তো আমি আয়না মজিদকে ভড়কে দেবার জন্যে কাকে নিয়ে ডিনার খেতে আসব? দেখি আপনাদের অনুমান শক্তি।
যেসব পাঠক নাটকীয়তা পছন্দ করেন তারা ধরেই নিয়েছেন আমি ডিএসবি ইন্সপেক্টর কবীর সাহেবকে নিয়ে আসব। এতে হাইড্রামা তৈরি হবে ঠিকই, তবে সম্ভাবনা একশ ভাগ যে এই ড্রামা হাতের মুঠো থেকে বের হয়ে যাবে। Out of COntrol Situation. তাছাড়া আয়না মজিদ। এই নাটকীয়তার জন্যে তৈরি থাকবে। কবীর সাহেবকে এনে তাকে চমকানো যাবে না।
অতিথির সন্ধানে বের হয়েছি। Guess who is coming to the dinner?
এক ঠেলাওয়ালা পেলাম। সে তার ঠেলা লাইটপোস্টের সঙ্গে তালাচাবি দিয়ে আটকাচ্ছে। ঠেলাওয়ালার চেহারা ইন্টারেস্টিং। অবিকল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। জ্বলজ্বলে তীক্ষ্ণ চাখ, গাল ভাঙা। আব্রাহাম লিংকনের মতোই রোগা এবং লম্বা। আমি দরাজ গলায় বললাম, কেমন আছেন ভাই?
ঠেলাওয়ালা গভীর সন্দেহ নিয়ে আমাকে দেখছে। আব্রাহাম লিংকন এভাবে তাকাতেন না।
রাতের খাবার আমার সঙ্গে খাবেন? ভালো আয়োজন আছে।
না।
না, কেন?
পুলাপানে বইসা আছে, আমি মাংস পাকাব্য তারা খাইব।
মাংস কিনেছেন?
হুঁ।
ঠেলার ভেতরই খবরের কাগজে মোড়া মাংস। একটা তেলের শিশি। আরেকটা পোটলা দেখা যাচ্ছে, মনে হয় চাল।
আপনার পুলাপান কয়জন?
খামাখ্যা এত কথা জিগান ক্যান? আপনে কে?
ঠেলাওয়ালা দাঁড়াল না। হনাহন করে যাচ্ছে। আমি তার পেছনে পেছনে যাচ্ছি। মানুষের অদ্ভুত স্বভাবের একটি হলো অনুসরণ। ঠেলাওয়ালা দাঁড়িয়ে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় বলল, আপনের মতলব তো ভালো ঠেকতাছে না। পিছে পিছে আসেন ক্যান? আর এক পাও আইছেন কি ইটের চাক্কা দিয়া ঢেলা দিমু।
আমাকে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। ঘণ্টাখানিক হাঁটাহাটি করে একজন রাতের অতিথি পাওয়া গেল। চার থেকে পাঁচ বছর বয়েসী মেয়ে, নাম বকুল। সে তার দাদার সঙ্গে গান গেয়ে ভিক্ষা করে। বকুলের দাদা একটা গানই জানে, পীরিতি করবায় সুমনে। দাদার তিনদিন ধরে জুর। ভিক্ষায় যেতে পারে নি। বকুলের খাওয়া প্রায় বন্ধ। এ নিয়ে বকুলকে তেমন চিন্তিত মনে হচ্ছে না। সে তিন-চারটা পাথর যোগাড় করেছে, তাই নিয়ে নিবিষ্ট মনে খেলছে। পাশেই তার দাদা সারা শরীর চাদরে ঢেকে শুয়ে আছে। খোলা আকাশের নিচে যে শুয়ে আছে তা-না। মাথার উপর নীল পলিথিনের ছাদ। এক কোনে ইটের চুলা। কিছু হাঁড়িকুড়ি। লাল রঙের প্লাষ্টিকের বালতি। বকুল এবং বকুলের দাদা আমার পরিচিত। তাদের পলিথিনের ঘরে একবার ডালভর্তা দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম।
বকুল, কী করো?
খেলি।
রাতে খাওয়া হয়েছে?
না।
চল আমার সঙ্গে, তোর দাওয়াত।
বকুল পাথর ফেলে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। চাদরের ভেতর থেকে তার দাদা বলল, হিমু ভাইজান, এরে নিয়া যান। আমি আর পারতেছি না। অপারগ। আপনে অনেক দয়া করেছেন। আরেকটু করেন। আপনের পায়ে ধরি।
শরীর কি বেশি খারাপ?
জে। মরণ রোগে ধরেছে। মরণ রোগে ধরলে পানি তিতা লাগে। আমার লাগিতাছে। কলের পানি মুখে দিলে মনে হয় চিরতার পানি। হিমু ভাই, আপনার সাথে কি টেকা পয়সা কিছু আছে?
দশ টাকার একটা নোট আছে।
একটা গান গাই। গান শুইন্যা দশটা টেকা দিয়া যান।
গাও।
বৃদ্ধ চাদরের ভেতর থেকে গান ধরল—
পীরিতি করবায় সুমনে। ও সখী, পীরিতি করবায় সুমনে।
আয়না মজিদ বকুলকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে উঠল। আমাকে বলল, এ আপনার গেষ্ট!
আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম।
আয়না মজিদ বকুলকে বলল, এই তোর নাম কী? বকুল সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমার নাম বকুল। আপনের নাম কী? বলেই সে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল টাইগারের উপর। যেন অনেক দিন পর সে তার পুরনো বান্ধবের দেখা পেয়েছে। ঝাঁপঝাঁপি আদর মনে হয়। টাইগারের পছন্দ হয়েছে। সে পেটের ভেতর থেকে ঘড়ঘড় শব্দ বের করছে। বকুল এখন ঘোড়ার মতো কুকুরটার পিঠে চড়ার চেষ্টা করছে। টাইগারের তাতে তেমন আপত্তি আছে বলেও মনে হচ্ছে না। আয়না মজিদ তাকিয়ে আছে বকুলের দিকে। তার চোখের দৃষ্টিতে পরিবর্তন লক্ষ করলাম। এখন সে ঘনঘন পলক ফেলছে।
বকুল আয়না মজিদের দিকে ফিরে বলল, এই কুত্তাটার নাম আছে?
মজিদ বলল, না। বকুল বলল, আমি এর নাম দিলাম ভুলু। এই ভুলু, গান শুনবি? ভুলু ঘোৎ জাতীয় শব্দ করতেই বকুল গান শুরু করল—
