এখন সন্ধ্যা।
আমি দাঁড়িয়ে আছি আয়না মজিদের বাসার সামনে। আমার সঙ্গে টাইগার। তাকে অনেক ঝামেলা করে উদ্ধার করতে হয়েছে। মিউনিসিপালটির কুকুর ধরা গাড়িতে তাকে ভরে ফেলা হয়েছিল। গাড়ির ড্রাইভার এবং তার অ্যাসিসটেন্টকে টাকা খাইয়ে বাদল কুকুর উদ্ধার করেছে। টাকার পরিমাণ কত বাদল বলছে না। মনে হয় বেশি। গাড়িতে টাইগার যে ভঙ্গিতে বসেছিল এখনো সিড়ির গোড়ায় সেই ভঙ্গিতে (হিজ মাস্টার্স ভয়েসের কুকুরের মতো) থাবা গেড়ে বসে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে মোৎসার্টের কোনো মহান সঙ্গীত শুনছে। সঙ্গীত ভেসে আসছে বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে। আমি খানিকটা দ্বিধাগ্ৰস্ত–দরজার কলিংবেলে। হাত রাখব কি রাখব না। কলিংবেল নতুন লাগানো হয়েছে। নতুন কলিংবেল বলে দেয় ভাড়াটে বদল হয়েছে।
আয়না মজিদ টাইপ লোকজন জলেভাসা কলমির মতো এক জায়গায় কখনো থাকবে না। তাদের ভাসতে হবে। কলিংবেলে হাত রাখতে হলো না, দরজা খুলে গেল। আয়না মজিদ বললেন, ভেতরে আসুন।
আমি ঘরে ঢুকলাম। টাইগারও আমার গা ঘেসে ঘরে ঢুকল। বেচারা ভালো ভয় পেয়েছে। এখন সে আমাকে ছাড়বে না। আয়না মজিদ বললেন, টেলিভিশনে যাকে দেখেছি। এই কি সে?
আমি হ্যা-সূচক মাথা নাড়লাম। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। বাতি জ্বালানো হয় নি। কোনো কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। এই অন্ধকারেও আয়না মজিদের চোখে কালো চশমা। সে কোনো দিকে তাকাচ্ছে না; বাঁ আদৌ তাকাচ্ছে কি-না বুঝতে পারছি না।
বসুন।
আমি বললাম, কোথায় বসব?
মেঝেতে বসুন।
আমি টাইগারের পাশে বসলাম এবং টাইগারের মতোই থাবা গেড়ে বসলাম। অন্ধকারে এই দৃশ্য রহস্যময় লাগার কথা। তবে কালো চশমার কারণে আয়না মজিদ কিছু দেখবে বলে মনে হয় না। আমি বললাম, ঘর অন্ধকার কেন?
কারেন্ট নাই এইজন্যেই অন্ধকার। আমি ঘর অন্ধকার করে লুকিয়ে বসে থাকার মানুষ না।
মোমবাতি নাই?
থাকার কথা। কোথায় আছে জানি না।
যে জানে। সে কোথায়?
আয়না মজিদ। জবাব দিল না। আমি আয়োজন করে কাধে ঝুলানো চটের ব্যাগ থেকে মোমবাতি এবং দেয়াশলাই বের করলাম। আমার ব্যাগে একেক সময় একেক জিনিস থাকে। আজি আছে মোমবাতি-দেয়াশলাই, এক কোটা গোলমরিচ, থােম্বার জয় নামের জনৈক পদার্থবিদের একটা বই, নাম Ultimate Nothing.
আমাকে ব্যাগ থেকে মোমবাতি বের করে জ্বালাতে দেখেও আয়না মজিদ কিছু বলল না। অন্য যে-কেউ প্রশ্ন করত— আপনি কি সব সময়ই ব্যাগে মোমবাতি দেয়াশলাই রাখেন?
আয়না মজিদ শান্ত গলায় বলল, আপনি কি আপনার এই কুকুরটা আমার কাছে বিক্রি করবেন?
করব।
দাম কত?
আমি বললাম, দামের ব্যাপারটা পরে আলোচনা করব। আগে ঠিক করুন এই বিপজ্জনক কুকুর আপনি চান কি-না। এই কুকুর সর্বক্ষণ আপনার সঙ্গে থাকবে। লোকজন তখন আপনাকে ডাকবে কুকুর মজিদ। আপনার জন্যে সম্মানহানীকর।
লোকে আমাকে কী ডাকল তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। কুকুরটা আমি রাখতে চাই।
রেখে দিন।
মালিকানা বদল কি সে সহজে মানবে?
আমি বললেই মানবে।
এখনই বলুন।
টাইগারের দিকে তাকিয়ে আমি গম্ভীর গলায় বললাম, টাইগার, এখন থেকে আয়না মজিদ তোমার মাস্টার। যাও মাষ্টারের কাছে গিয়ে বসো।
টাইগার এই কাজটা করল। কেন করুল সে-ই জানে। কুকুর মানুষের কথা বুঝতে পারে না। বোঝার কোনো কারণ নেই। তবে জগতে অনেক কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। ঘটে বলেই জগৎ এত রহস্যময়।
আয়না মজিদ বলল, এই কুকুর কি আপনার কথা বুঝতে পারে?
আমি জবাব দিলাম না। নৈঃশব্দ্য রহস্যময়। প্রকৃতিও রহস্যময়তা পছন্দ করে। আয়না মজিদ বলল, আপনি কি রাতে আমার সঙ্গে ডিনার করবেন?
হুঁ।
কী খেতে চান?
বিয়েবাড়িতে যেমন ঝোল ঝোল করে বড় বড় পিসের খাসির মাংসের
রেজালা করে সেরকম রেজাল।
সঙ্গে আলু থাকবে?
হ্যাঁ থাকবে। চাক চাক করে বড় বড় আলু।
রেজালা কী দিয়ে খাবেন? চিকন চালের ভাত, না পোলাও?
অবশ্যই পোলাও।
কলিজা দিয়ে আলুর চপের একটা প্রিপারেশন আছে। প্রচুর ধনে পাতা দিয়ে করা হয়। পোলাওয়ের সঙ্গে খেতে ভালো হয়। করব?
করুন।
বোরহানি করব?
না।
তাহলে সালাদ করি? টমেটো, কাচামরিচ, আর পেয়াজের সালাদ।
করুন। ঘরে নিশ্চয়ই বাজার নেই। টাকা দিন বাজার করে নিয়ে আসি। আমার সঙ্গে টাকা থাকে না।
আপনাকে বাজার করতে হবে না। ভালো মাংস আপনি চিনবেন না। আমার পরিচিত। কসাই আছে, মাংস দিয়ে যাবে।
আমি তাহলে হাঁটাহাঁটি করে ক্ষুধা চাগিয়ে আসি।
আসুন।
আপনি কি ইংরেজি পড়তে পারেন?
কেন জিজ্ঞেস করছেন?
আপনার জন্যে একটা ইন্টারেটিং বই নিয়ে এসেছিলাম। বইটা ইংরেজিতে লেখা, নাম Ultimate Nothing. ইংরেজি পড়তে পারলে বইটা আপনাকে দিতাম।
ইংরেজি পড়তে পারি। বইটার বিষয়বস্তু কী?
বিষয়বস্তু হচ্ছে বিশাল এই বস্তুজগৎ আসলে শূন্য। শূন্যের বেশি কিছু না।
তার মানে?
পড়ে দেখুন। আপনি বই পড়তে পছন্দ করেন এই তথ্য আমি জানি।
আমার বিষয়ে আর কী জানেন?
আপনি অতি ভয়ঙ্কর এই তথ্য জানি। তথ্যটা কি ঠিক আছে?
ঠিক আছে।
কে বেশি ভয়ঙ্কর— আপনি না। লম্বু খোকন?
প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিসিটি চলে এলো। টাইগার বসেছিল। চারপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গা ঝাকা দিল। আয়না মজিদ চোখ থেকে সানগ্লাস খুলল। তার চোখ ঝকঝকি করছে। প্রথম যখন দেখেছি তখন চোখ ঝকঝকে দেখি নি।
আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম, আমি কি রাতে খাবার সময় একজন গেস্ট নিয়ে আসতে পারি?
