ত্রিপুরার দূত এসে খবর দিলেন, রবির কাব্যটি মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের খুব পছন্দ হয়েছে, তিনি অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিন্তু রবির আর-এক বন্ধু প্রিয়নাথ সেনের একেবারেই ভাল লাগেনি এই কাব্য। বিহারীলালের অবশ্য। পছন্দ হল। সময়ে অসময়ে প্রায়ই বিহারীলালের কাছে চলে আসেন রবি। প্রায় রোজই দেখেন, পঙ্খের কাজ করা মেঝের ওপর উপুড় হয়ে কবিতা লিখছেন বিহারীলাল, লিখতে লিখতেই রবিকে দেখে খুশি হয়ে ডেকে নেন। অগ্রজ-অনুজ দুই কবির সারা দুপুর কেটে যায় কবিতার ছন্দ নিয়ে তর্কে।
কাদম্বরী ফিরে আসার পর ঠাকুরবাড়িতে আবার শুরু হল বসন্ত উৎসব অভিনয়ের উদযোগ। এবার নায়িকা লীলা সাজবেন কাদম্বরী, আর যে সন্ন্যাসিনীর কৃপায় লীলা তার প্রেমিককে ফিরে পেল, তার ভূমিকায় লেখিকা স্বর্ণকুমারী স্বয়ং। নায়ক জ্যোতিরিন্দ্র। রবি প্রতিনায়ক হয়ে টিনের তলোয়ার ঘুরিয়ে খুব যুদ্ধ করলেন।
অভিনয়ের দিন ঢালা বাগেশ্রী রাগিণীতে কাদম্বরী যখন গাইছিলেন– চন্দ্ৰশূন্য তারাশূন্য মেঘান্ধ নিশীথ চেয়ে/দুর্ভেদ্য অন্ধকারে হৃদয় রয়েছে ছেয়ে– তাঁর পিঠভরা খোলা চুলে, বড় বড় চোখে শোকাতুরা লীলার কল্পিত মূর্তি যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।
রবি, জ্যোতি, স্বর্ণকুমারীরা যতই কাদম্বরীকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করুন, বাড়ির মেয়েমহল কিন্তু কাদম্বরীকে ছেড়ে কথা বলল না। তরকারির আসরে এসে বসতে না বসতেই শুরু হয়ে যায় টীকা টিপ্পনী।
কেউ বললেন, কী গো নতুনবউ, এত নাটুকেপনা কেন? দুঃখকষ্ট তো সবার আছে, আমরা তো বাপু অমন করে বিষ খাইনি?
খেলেই যদি, অত অল্প করে খেলে কেন, সেই তো ফিরে আসতে হল। আমাদের মধ্যে! মাঝখান থেকে কর্তাদের যত ঝুটঝামেলা পোয়াতে হচ্ছে, বাইরে জ্যোতিঠাকুরকে নিয়ে কত কানাকানি। নিজের বরকে এমন বদনাম করে মুখ দেখাচ্ছ কী করে?
এত বিষ এদের জিভে, কালো হয়ে যায় কাদম্বরীর মুখ। সত্যি তার মরে যাওয়াই ছিল ভাল, কেন যে রবি বাঁচিয়ে তুলল! চোখ দিয়ে টপটপ ঝরে পড়ে রুপোলি বেদনা।
জ্ঞানদাও অসন্তুষ্ট তাঁর ওপর। এমনি করে বাড়ির লোকের বদনাম করা তিনি মেনে নিতে পারেন না। কাদম্বরীকে আঘাত দিয়ে বললেন, এখন কেঁদে কী হবে নতুনবউ? তুমি নিজের মুখ পুড়িয়েছ, আমাদেরও। এই কথা চাপা দিতে কত টাকা খরচ হয়েছে জানো? আর নতুনের মুখের দিকে তো তাকানো যাচ্ছে না, এত ভালবেসে এই প্রতিদান পেল সে!
রূপা আর চুপ থাকতে পারে না, বলে, মেজোবউঠান, তোমরা কেউ ওঁর দুঃখটা বুঝছ না, কেউ কি সাধ করে এমন করে? ওঁকে একটু সামলাতে দাও না।
জ্ঞানদা রুষ্টস্বরে বলেন, তুই চুপ কর রূপা, সব ব্যাপারে কথা বলিস না। আর নতুনবউ, তোমাকে বলি, জীবনে অনেক ঝড়ঝাঁপটা আসে, কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ নেওয়াটাই তো বেঁচে থাকা। আমি বিলেতে অসুস্থ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে রুগণ শরীরে একা একা কীভাবে দিন কাটিয়েছি, তুমি ভাবতেও পারবে না। আফিম খাওয়াটা ভীরুতা। নিজে জ্বলছ, নতুনকেও জ্বালাচ্ছ। আমি প্রথম থেকেই জানতাম, তুমি পারবে না। নতুনের মতো পুরুষকে বেঁধে রাখতে পারে না তোমার মতো মেয়েরা।
আমি কীরকম? জলভরা চোখে ফুঁসে ওঠেন কাদম্বরী। সব বুঝলাম মেজদি, কিন্তু আমি যেভাবে দিনের পর দিন নিজের স্বামীকে আগুনের দিকে ধাবমান পতঙ্গের মতো বাজারের নটীর দিকে ছুটে যেতে দেখেও হাসিমুখে সহ্য করেছি, সেটা কি তুমি পারতে?
এ তোমার মিথ্যে সন্দেহ নতুনবউ। জ্যোতির রূপগুণে নটীরা সবাই মাতোয়ারা, কিন্তু জ্যোতি তোমার প্রতি কোনও অবহেলা করেনি। আজও সে তোমাকে নিয়ে বেড়াতে যায়, তোমাকে নায়িকা সাজিয়ে গীতিনাট্য করে।
ও-সব লোকদেখানো, কাদম্বরী খুব নিচু গলায় বলেন, ও আর আমাকে ভালবাসে না। আমি আমার সেই জীবনসঙ্গীকে চিনতে পারি না আর।
সৌদামিনী এখন অন্দরের কত্রী। জলচৌকিতে বসে রুপোর পিকদানে পিক ফেলে বলেন, শোনো বাছা, একটা মিঠেপান মুখে দাও দেখি!
হঠাৎ পানের প্রস্তাবে কাদম্বরী তার দিকে তাকান। সৌদামিনী একটি পান এগিয়ে দিয়ে বললেন, শোনো, পুরুষেরা একটু বারমুখি হতে পারে, কিন্তু তুমি যদি সন্দেহবাতিক দেখাও, তা হলে জ্যোতি আর ঘরে ফিরতেই চাইবে না। ঠান্ডা মাথায় একটু কায়দা করে চলো, দেখবে সংকট কেটে যাবে।
পেছন থেকে মুখ লুকিয়ে কে যেন বলে ওঠে, বাঁজা বউয়ের আবার বায়নাক্কা কত! স্বামী তো ওইজন্যেই মুখ ফেরাচ্ছে। কোলভরে একটা ছেলে আনতে পারলে দেখতাম, বর ঘরে ফেরে কিনা!
অ্যাই, কে বললে গো? রূপা আবার ঝামটে ওঠে, আড়াল থেকে যা নয় তাই বলবে? যাদের খাচ্ছ পরছ, তাদেরই কথা শোনাও!
ও বাবা, এ যে নতুনবউ কালকেউটের ছানা পুষেছে! আবার পেছন থেকে কে বলে ওঠে। ঠাকুরবাড়ির অসংখ্য আশ্রিত মহিলাদের মধ্যে অনেকেই এই আসরে তরকারি নিয়ে বসে। তাদেরই কেউ কেউ টিপ্পনী কাটছে পেছন থেকে।
এক বয়স্কা বিধবা সামনাসামনিই বলে ফেললেন মনের কথা, নতুনবউ, কিছু মনে কোরো না, তুমি বাপু একটু অপয়া আছ। ঊর্মিলাটা তোমার কাছে ছিল, পড়ে গেল আর তোমার ঘুমই ভাঙল না; নিজের কোলেও ছেলেপুলে এল না; দোষ আছে, চুপচাপ থাকো। বেশ তো ছিলে ফুরুৎ ফুরুৎ গানবাজনা নিয়ে, এখন আবার এ-সব আফিম খেয়ে নাটক করা কেন?
তীব্র শোকের বিদ্যুৎ প্রবাহে মাথা টলে ওঠে কাদম্বরীর। ঊর্মিলার কথা মনে পড়ে জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। জ্ঞানদা তাড়াতাড়ি ধরে বসান তাকে। রূপাকে বলেন ওঁকে ঘরে নিয়ে যেতে। যেতে যেতেই রূপার ঘাড়ে মাথা রেখে কাদম্বরী পাগলিনীর মতো গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠেন মানময়ীর একটি গানের কলি– সজনী লো সজনী, কেন কেন এ পোড়া প্রাণ গেল না?…/এনে দে এনে দে বিষ, আর যে লো পারি না।
