এ-সবের মধ্যে দিন কাটছিল আনন্দেই। কিন্তু রবির ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যেন জ্ঞানদা তখনও ভাবছেন। জ্ঞানদার ইচ্ছে রবি আবার বিলেত যাক। এখানে কাদম্বরীর মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে অনেক বড় একটা পৃথিবী আছে। রবি সেখানে গিয়ে নিজের অসমাপ্ত পড়া সম্পূর্ণ করুক। সত্যেনেরও তাই ইচ্ছে। তারকনাথ মহর্ষিকে সেই অনুরোধ জানান, রবি এবার বিলেত গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করুক।
রবির ইচ্ছেও সেরকম। পড়া শেষ না করে ফিরে আসায় স্বজনবন্ধুরা কেউই খুশি হননি। যখন সবে তার পড়ায় মন বসেছিল, তখনই বাবা ডাক পাঠালেন। অসমাপ্ত কাজ সমাধা করতে তিনিও মহর্ষির কাছে বিলেত যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। প্রতিমাসে বিলেত থেকে তাকে একটি করে চিঠি লিখবেন, এই শর্তে দেবেন্দ্রনাথ অনুমতি দিলেন। কিন্তু রবির যাওয়া হল না। তার কারণ কাদম্বরী।
.
কলকাতায় ফিরে গানবাজনার পাশাপাশি জ্যোতি আবার বিনোদিনীর কাছে যাওয়া শুরু করেছেন। কাদম্বরী কিছুদিন কান্নাকাটির পর একদিন ডাক পাঠালেন মালিনীকে।
বইয়ের বোঝা নামিয়ে মালিনী মেঝেতে বসে পড়ে। নতুনবউঠান, তোমার ঘরে একটা অন্যরকম গন্ধ আছে, এলেই কেমন উদাস উদাস লাগে।
অধীর কাদম্বরী কাজের কথায় আসেন, চল মালিনী, একদিন নাটক দেখতে যাই। বিনোদিনী নাকি গিরিশ ঘোষের একটা নতুন থিয়েটার করছে।
দেখবে, বউঠান? মালিনী সতর্ক হয়, দেখো আবার ধরা পড়ে যাব না। তো। এখন আবার বাড়িতে মেজোবউঠান আছেন, সবদিকে তার নজর।
পড়লে পড়ব, কাদম্বরী মরিয়া, তুই টিকিট কাটার ব্যবস্থা কর। সেবারের মতো, আমি, তুই আর রূপা।
রূপাও উৎসাহী, ছটফট করে বলে, নতুনবউঠান, রবিদাদাকে চুপিচুপি সঙ্গে যেতে বলো না! বেশ মজা হবে।
কাদম্বরী ভাবেন, মন্দ না কথাটা। কিন্তু রবি যদি রাজি না হয়! কিংবা রাজি হবেই বা না কেন, সে তো শকুন্তলার মুগ্ধ হরিণশিশুর মতো আমার পায়ে পায়ে ঘোরে!
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়াচ্ছিলেন কাদম্বরী। আনমনে বললেন, সে বলা যায়, কিন্তু রবিকে তো সবাই চিনে ফেলবে, আর জল্পনা করবে ওর সঙ্গে ঘোমটা ঢাকা মহিলাটি কে?
সে যার যা খুশি ভাবুক না, রূপা পরোয়া করে না। তোমার মুখ তো কেউ দেখতে পাবে না!
কাদম্বরী অতটা বেপরোয়া হতে পারেন না, বলেন, না না সে ঝুঁকি নেওয়া। যায় না। ধরা পড়ে গেলে রবির খুব বিড়ম্বনা হবে। লোকে সন্দেহ করবে আমাকেই।
সেই নাটক দেখতে যাওয়াই কাল হল কাদম্বরীর। মানময়ীর অভিনয়ের পর সকলের বাহবা পেয়ে তার ধারণা হয়েছিল কোনও নটীর থেকে অভিনয়ে তার নৈপুণ্য কোনও অংশে কম নয়। তারা পতিতা হয়ে যতটা উত্তরণ ঘটাতে পারে তার চেয়ে অনেকগুণ ডানা মেলতে পারে কাদম্বরীর শিক্ষিত রুচির অভিনয়।
কিন্তু সেদিন তাঁকে স্তম্ভিত করে দিল বিনোদিনী। মঞ্চে তার অনায়াস চলাফেরা যেন সম্রাজ্ঞীর মতো। রূপের মাজাঘষা মহিমায়, কণ্ঠের নিয়ন্ত্রিত স্বরক্ষেপণে, গিরিশের পরিমার্জনায় এবং দর্শকদের ঘনঘন করতালিতে তার। জ্যোতির্ময়ী উপস্থিতি। কাদম্বরীর মনে হল ওই মঞ্চে উঠে দাঁড়ালে তিনিও এমন মোহগ্রস্ত করে দিতে পারেন দর্শকদের। তখন সেই বিপুল জনতার এনকোর ধ্বনিতে ভাসমান তাদের প্রিয়নায়িকাকে দেখে জ্যোতিরিন্দ্র কী। করবেন? ভালবাসবেন তো? নাকি তার ঈর্ষা হবে, হবে চণ্ডালের মতো রাগ!
পরক্ষণেই নেতিয়ে পড়ে কাদম্বরীর সুখকল্পনা। সাদামাটা ধনেখালির আড়ালে ঢাকা নিজের শরীরটাকে বিনোদিনীর পাশে নেহাতই তুচ্ছ মনে হয়।
তখনই তিনি জ্যোতিকে দেখতে পেলেন। সামনের সারিতে বসেছিলেন, পেছন থেকে বুঝতে পারেননি কাদম্বরী। এখন উঠে দাঁড়িয়ে মঞ্চে বিনোদিনীর দিকে ফুলের মালা ছুঁড়ে দিয়ে সাধু সাধু বলে চেঁচিয়ে উঠতেই কাদম্বরীর চোখে অন্ধকার নেমে আসে। রূপার কাঁধে অবশ দেহে এলিয়ে পড়েন। তিনি। কোনওরকমে একটু সুস্থ বোধ করতেই রূপা ও মালিনী বেরিয়ে পড়ল কাদম্বরীকে নিয়ে।
জোড়াসাঁকোয় ফিরে কাদম্বরী রুপোর কৌটোয় বহুদিনের জমানো আফিমের গুলি বার করে অনেকগুলি খেয়ে নিলেন। রবি রাতের দিকে কী একটা নতুন গান শোনাবেন বলে ঘরে ঢুকে দেখলেন ছিন্নলতার মতো মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন নতুনবউঠান, ঠোঁটের দুপাশে গাজলা।
পরের তিনদিন ঠাকুরবাড়ির সবকাজ শিকেয় তুলে সারিয়ে তোলা হল কাদম্বরীকে। এই ভয়ংকর আঘাত রবিকে এলোমেলো করে দিল। বিপন্ন বিষণ্ণ নতুনবউঠানকে খাদের কিনারায় ফেলে রেখে রবি কিছুতেই বিলেত চলে যেতে পারলেন না।
বিপর্যয় সামলাতে জ্যোতি কাদম্বরীকে নিয়ে গেলেন পশ্চিমের পাহাড়ে। নতুনবউঠানের ছেড়ে যাওয়া তেতলার ফাঁকাঘরে বসে রবি তখন কবিতায় খাতায় বেদনা মন্থন করে লিখছিলেন তারকার আত্মহত্যা– জ্যোতির্ময় তীর হতে
চিঠি লিখছিলেন নতুনবউঠানকে, আমার বড় ইচ্ছা ছিল যে, তুমি বলবে– অমুক জায়গায় আমি একটি সুন্দর উপত্যকা দেখলুম; সেখেনে একটি নিৰ্বর বোয়ে যাচ্ছিল, জায়গাটা দেখেই মনে হল, আহা ভা (ভানু) যদি এখানে থাকত তা হলে তার বড় ভাল লাগত।
.
এদিকে ভগ্নহৃদয় পাঠকমহলে আলোড়ন তুলল, রবিকে নিয়ে তরুণদল বাংলার শেলি বলে নাচানাচি শুরু করলেন। তার বড় চুল, তার পোশাক, চশমা সবকিছুই হয়ে উঠল অনুকরণযোগ্য ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
