কাদম্বরী এরপর আর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে থাকতে চাইলেন না, জ্যোতি ও রবির সঙ্গে চন্দননগরের গঙ্গাতীরের একটি বাগানবাড়িতে এসে উঠলেন। কয়েকবছর আগেও এখানে এসে মুগ্ধ হয়েছিলেন ওঁরা, ঠাকুরবাড়ির কোলাহল থেকে দূরে গঙ্গার কোলে সেই বাড়ি যেন এক স্বপ্নরাজ্য।
ঘাটে বাঁধা থাকে একটা ডিঙি নৌকো। অক্ষয় এলে ডিঙি চড়ে মাঝনদীতে গিয়েও গানবাজনার পালা শুরু হয়ে যায়। দিনের পর দিন কেটে যায় অলস মায়ায়; সন্ধ্যা কাটে নদীর ঘাসে বসে গান গেয়ে; এমনকী কোনও কোনওদিন রাত হয়ে যায়, তবু গঙ্গার তীর থেকে নড়তে চান না কাদম্বরী।
এখানে এসে জ্যোতিকেও অনেক কাছে পেয়েছেন, যদিও প্রায়দিনই কলকাতায় যাওয়া-আসা করেন জ্যোতি।
.
কিছুদিন পর বাড়ি পালটে মোরান সাহেবের বাংলোয়। সেও গঙ্গার ধারে। কাদম্বরীর বিক্ষিপ্ত মনের ওপর দিয়ে গঙ্গার বাতাস যেন স্নেহের স্পর্শ দিয়ে ছুঁয়ে যায়। রবিও সতর্ক থাকেন যাতে বউঠানের মনে কোনও মেঘ না জমে। জ্যোতির অনুপস্থিতিতে সিগল্পে গানে কবিতায় ভরিয়ে রাখেন কাদম্বরীর অবসর।
সেখান থেকে কলকাতায় সদর স্ট্রিটের একটি ভাড়া বাড়িতে। ১৮৮১-৮২ সালের অনেকটা সময় জুড়ে জোড়াসাঁকোর বাইরেই কাটাচ্ছিলেন তিনসঙ্গী। কাদম্বরী জোড়াসাঁকোয় ফিরতে চান না। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের গঞ্জনা থেকে দূরে, তেতলার ঘরের নিঃসীম একাকিত্ব এড়িয়ে সদর স্ট্রিটের বাড়িটাই গুছিয়ে নেন তিনি। জ্যোতি সবসময়ে বাড়ি না এলেও রবি তো আছেই। রবি লেখার টেবিলে বসলে তার জন্য মৌসাম্বির শরবত এনে দেন কাদম্বরী, কখনও বা ছাদের আলিসায় সূর্যাস্তের আকাশের দিকে তাকিয়ে গল্প করতে করতে দিব্যি কেটে যায় দেওর বউদির।
এক-একদিন বই-মালিনী এসে হাজির হয় আশ্চর্য সব গল্পের ঝুলি নিয়ে। তাকে দেখলেই কাদম্বরী আজকাল আগের মতন জাদুগল্প শুনতে চান, তার যেন জাদুগল্পের নেশা ধরে গেছে। কিন্তু আগের মতো মালিনীর চোখের সামনে সবসময় ওরকম ম্যাজিক খেলে না।
কোনওদিন সে বলে, তার চেয়ে আগের মতো নতুন নতুন বই দেখাই বউঠান? দেখো না এই বইটা– সেদিন স্বর্ণদিদির খুব পছন্দ হয়েছে।
কাদম্বরীর মনে লাগে না, ও-সব নতুন বইয়ের খবর তো রবির কাছে, জ্যোতির কাছেই শোনা যায়, এখন তো তিনি আর নেহাত অন্তঃপুরচারিণী নন। মালিনী ছাড়াও তার বই জোগাড়ের অন্য পথ আছে। মালিনী কাছে এলেই তার বুক দুরুদুরু করে, না জানি কী রহস্যময় কাহিনি শোনা যাবে, যা প্রতিধ্বনির মতো তার জীবনের গূঢ় গোপনকে মনে করিয়ে দেয়, যা প্রতিবিম্বের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়!
বল না মালিনী, কাদম্বরী রোজ অনুনয় করেন, তেমন আশ্চর্য একটা গল্প, যা ছাপা হয়নি অথচ কোন অজানা ইথার তরঙ্গে লেখা হয়েছে।
একদিন মালিনী এল হাতে লেখা কয়েকটি ভূর্জপত্র নিয়ে, উদ্ভাসিত মুখে বলল, এবার তোমাকে অবাক করে দেব নতুনবউঠান। ঠোঁটে কৌতুক ছড়িয়ে সেই পুঁথির পাতা থেকে পড়ে শোনাতে থাকে সে–
অনেকদিন কোনও গান রচনা করা হয়নি, সেই জ্বরের ঘোরে রবি একটা গান বাঁধবার চেষ্টা করল। একটি দুটি লাইন ঠিক এসে গেল, তৃতীয় লাইনটা ভাবতে গিয়ে গুলিয়ে গেল প্রথম লাইনটা। কিছুতেই মনে পড়ে না। সেটা হাতড়াতে গিয়ে আবার তৃতীয় লাইনটা হারিয়ে যায়।
কপালে একটা হাতের ছোঁয়া লাগতে চমকে উঠল রবি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন কাদম্বরী। উরিখুরি চুল, চোখ দুটি ছলছলে, শরীরে একটা আটপৌরে হলুদ শাড়ি জড়ানো।
দুজনে পরস্পরের চোখের দিকে চেয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। এর মধ্যে রবি গিয়েছিল কাদম্বরীর কাছে ক্ষমা চাইতে, কাদম্বরী উদাসীনভাবে কাটাকাটা উত্তর দিয়েছেন, রবি বুঝতে পেরেছিল, ওঁর রাগ পড়েনি। তারপর কাদম্বরী অসুখে শয্যাশায়িনী হলেন, মনোর মা আর নিস্তারিণী দাসী তার ঘরে বসে থাকে, রবি সকাল-বিকেল দেখে এসেছে, অন্তরঙ্গ কোনও কথা হয়নি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ জমিদারির কাজে গিয়েছেন শিলাইদহে, জোড়াসাঁকো থেকে দুজন কর্মচারী এসে রয়েছে এ বাড়িতে।
রবি অস্ফুট স্বরে বলল, নতুনবউঠান!
কাদম্বরী বললেন, রবি। তোমার অসুখ হয়েছে, আমাকে খবর দাওনি?
রবি কাদম্বরীর ডান হাতখানি ধরল। সে হাত খুব উষ্ণ। কাদম্বরীর মুখ দেখলেও টের পাওয়া যায় জ্বরের ঝঝ।
রবি বলল, তোমারও তো বেশ জ্বর, তুমি উঠে এলে কেন?
কাদম্বরী বললেন, মেয়েমানুষের জ্বর হলে কিছু হয় না। সরকার মশাইকে। জানাচ্ছি, নীলু ডাক্তারকে ডেকে আনুক তোমার জন্য। এত জ্বর, তোমার কপালে জলপটি দেওয়া হয়নি
রবি বলল, এখুনি ডাক্তার ডাকার দরকার নেই। মোটে একদিনের জ্বর, আমার এমনই ঠিক হয়ে যাবে।
কাদম্বরী বললেন, তুমি চুপটি করে শুয়ে পড়ো। এক্ষুনি আসছি।
রুপোর বাটিতে ঠান্ডা জল আর পরিষ্কার একটুকরো কাপড় নিয়ে একটু পরেই ফিরে এলেন কাদম্বরী। একপাশে বসে রবির কপালে জলপট্টি দিলেন। যত্ন করে।
রবি বলল, এ তোমার ভারী অন্যায়, নতুনবউঠান। তোমার এখন শুয়ে থাকার কথা। তুমি জলপট্টি নাওনি কেন?
কাদম্বরী বললেন, তোমার এই মাথায় কত কী চিন্তা করতে হয়। বেশি গরম হলে ক্ষতি হতে পারে। আমাদের মাথার আর কী দাম আছে!!
রবি বলল, চিন্তা সব মানুষই করে। তবে তোমার মনের মধ্যে কী যে চলে, তার আমি কোনও হদিশ পাই না।
