রবির কানে কথাগুলো মনে হয় হেকেটিদেবীর বেদনাসংগীত। এই প্যাথস থেকে জন্ম নেয় তার নতুন কবিতা।
জ্যোতির মনে হয়, এই রে, কাদম্বরী আবার এ-সব প্রলাপ শুরু করেছে। কলকাতার জনমোহিনী জীবন থেকে, নাট্যরঙ্গ থেকে দূরে সরে এসেছেন তিনি, স্ত্রীর মনখারাপ সারিয়ে তুলবেন বলে। এখানে এসেও কি ওর মন ভাল হবে না?
তিনি বলেন, নতুনবউ, তুমি কি শান্তিনিকেতনের এই উদাত্ত পরিবেশেও কোনও আনন্দ খুঁজে পাচ্ছ না?
আমি কি আর নতুন আছি? তোমার চোখে আমি তো এখন পুরাতন, কাদম্বরীর অভিমান যায় না, আরও কত নতুন এসে গেছে তোমার জীবনে!
রবির চমক লাগে, কে যেন বাতাসে ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে হেথা হতে যাও পুরাতন, কে বলল, কে!
না গো, হেকেটিদেবী, রবিও রহস্য করেন, তুমি বুঝি সত্যি বুঝতে পারছ এ-বই কার চরণকমলে অর্ঘ্য দিতে চাই?
চরণে দিনু গো আনি– এ ভগ্নহৃদয়খানি
চরণ রঞ্জিবে তব হৃদিশোণিতধারা
কিন্তু সে কার চরণকমলে? কাদম্বরী বুঝেও বোঝেন না যেন।
সেই তার, রবি বলেন, বিলেতে গিয়েও যার ছায়া ঘাড় থেকে নামাতে পারিনি, যেখানে যাই, যার ছায়া পিছু ধাওয়া করে!
তা হলে এবার সে তোমার ঘাড় মটকাবে, কাদম্বরী হাসতে হাসতে বললেন। হাসি যেন রবির সারা গায়ে জুইফুলের মতো ঝরে পড়ল।
রবি অফুটে উচ্চারণ করেন, আঁধার হৃদয়মাঝে দেবীর প্রতিমা-পারা।
.
প্রথম বেরোল ভারতী-তে, তারপর ভগ্নহৃদয় বই হয়ে বেরোল ১৮৮১-র জুন মাস নাগাদ। তখন থেকেই শুরু শ্রীমতী হে-কে নিয়ে নানা জল্পনা। অলীকবাবু নাটকে একবার হেমাঙ্গিনী সেজেছিলেন কাদম্বরী, আবার ঘনিষ্ঠজনেরা তাকে হেকেটি বলে ডাকেন, তবে তিনিই কি শ্রীমতী হে?
জ্ঞানদাও বলতে ছাড়েন না, বই হাতে নিয়ে তার প্রথম কথা, শেষে কাদম্বরীকে উৎসর্গ করতে হল রবি, এমন আড়াল করে কবিরা তো স্বপ্নের নারীকে উৎসর্গ করে জানতাম!
রবির মনখারাপ হয়, মেজোবউঠানের সব ভাল, শুধু কেন যে নতুনবউঠানকে দেখতে পারেন না! দুজনের মধ্যে যেন অদৃশ্য রেষারেষি। মুখে অবশ্য বলেন, তুমি কী করে জানলে কাকে উৎসর্গ করেছি, কবিদের সব কথা প্রকাশ হয়ে গেলেই বিপদ। তবে নতুনবউঠান যে আমার অনেক কবিতার মিউজ, এ-কথা অস্বীকার করব না। আমার কাছে তিনি যত না। রক্তমাংসের মানুষ, তার চেয়ে বেশি একটি আইডিয়া।
কী জানি বাপু, জ্ঞানদা স্পষ্টতই বিরক্ত হন, কী যে আহামরি দেখেছ ওর মধ্যে? ভেবেছিলাম বিলেত ঘুরে এলে ওর ভূতটা ঘাড় থেকে নামবে, এখনও তোমার ছেলেমানুষি গেল না।
ফিরে আসার পর জ্ঞানদার মহলে অনেক নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। তার ছেলেমেয়েরা খোদ বিলিতি কাটিংয়ের পোশাক পরে। ধুমধাম করে কেক কেটে তাদের জন্মদিন পালন হয়। সুরেন ভরতি হয়েছে সেন্ট জেভিয়ার্সে আর বিবি লোরেটোয়। রামা চাকরের সঙ্গে রোজ বিকেলে বেড়াতে যায় সুরেন বিবিরা। অন্য বাচ্চাদের কাছে এটা রীতিমতো ঈর্ষার বিষয়। ঠাকুরবাড়িতে ছোটরা কেউই এত মনোযোগ পায় না, সেখানে জ্ঞানদার আদরযত্নে সুরেন বিবির বিচরণ যেন রাজপুত্র রাজকন্যার মতো।
জ্ঞানদা নিয়ম করেছেন, প্রতিদিন বাড়ির একজন করে বাচ্চা ওদের সঙ্গে হাওয়া খেতে যাবে। ছোটরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করে কবে তার পালা।
বিবি সুরেনের পিঠোপিঠি বয়স সরলার। তার মায়ের বাচ্চা মানুষ করায় আগ্রহ বা সময় কোনওটাই নেই। দাসীর হেফাজতে এবং গুরুমশায়ের কড়া শাসনে দিন কাটে। যেদিন তার বেড়াতে যাওয়ার পালা, সেজেগুজে বেরতে গিয়েই বাধা। গুরুমশায় দেখে ফেলে যেতে দিলেন না, তার অশ্রুভারাক্রান্ত চোখের সামনে দিয়ে সুরেন বিবিরা বেরিয়ে গেল, উড়ে গেল তার বাইরে বেরোনোর স্বপ্ন।
বালিকাদের মধ্যে বিবি, সরলা ও প্রতিভার গলায় খুব সুর। রবি মহা উৎসাহে বাড়ির গানবাজনায় ছোটদেরও টেনে আনছেন। সারাদিন ঘরের বাতাসে দিশি-বিলিতি সুরের উচ্ছল আমেজে শুরু হয়ে যায় মাঘোৎসবের প্রস্তুতি। আগে দায়িত্ব নিতেন দ্বিজেন, সত্যেন বা জ্যোতি। এবার রবিই গানবাজনার দায়িত্বে, নতুন নতুন ব্রহ্মসংগীত লিখছেন, ওস্তাদদের বন্দিশ থেকে সুর নিয়ে ভেঙে নতুন সুর তৈরি করছেন, শেখাচ্ছেন। প্রতিবার মাঘোৎসবের দিন গানের বই বেরোয়, এবার আগেই আদি ব্রাহ্মসমাজ প্রেস থেকে বিশ-পঁচিশটি প্রুফ তুলে গানগুলি হাতে হাতে ছড়িয়ে দিলেন রেওয়াজের জন্য। আগেকার গানের চেয়ে রবির গানে নানা সুর, নানা ভাবের খেলায় আনন্দ যেন অনেক বেশি। কিছু বুঝুক না বুঝুক, বাচ্চাদের মনেও যেন সেই আনন্দের ছোঁয়া লাগে।
জ্যোতি তো বলেই ফেললেন, আমাদের গানে উপনিষদের গাম্ভীর্যের ভাবটা বেশি ছিল, শ্রীমান রবির আমলে ব্রহ্মসংগীত যেন পূর্ণতা পেল।
কিন্তু পিয়ানোর মধ্যে ওস্তাদি গানগুলিকে ফেলে, যথেচ্ছ মন্থন করে জ্যোতি যে সুর নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন সেইসময়, রবি ছিলেন তার সে-কাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এইসব এক্সপেরিমেন্ট ব্রহ্মসংগীতে ব্যবহার করা হয়নি কিন্তু বিদ্বজ্জন সমাগম উপলক্ষে লেখা ও অভিনীত বাল্মীকিপ্রতিভা নৃত্যনাট্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল সুরবিপ্লব। অপেরা নয়, রবির ভাষায় সেটা ছিল সুরে-নাটিকা।
বাল্মীকির ভূমিকায় রবি স্বয়ং অসাধারণ অভিনয় করলেন, তবে সবাইকে মুগ্ধ করে দিল সরস্বতীর সাজে হেমেনের বালিকাকন্যা প্রতিভা। গানে, সুরে, অভিনয়ে রবির এমন মুনশিয়ানা এই প্রথম বাইরের অতিথিদের কাছে প্রতিষ্ঠিত হল। বঙ্কিমচন্দ্র অভিনয় দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন দেবেনবাবুর ছোট ছেলের প্রতিভায়।
