অ্যাই রবি, একদম বাজে কথা, কাদম্বরী ঠোঁট ফুলিয়ে বলেন, আমার কথা তোমার মনেই ছিল না। কত বালিকাকে ফুলশরে বধ করেছ তুমিই জানো, তবে আন্না যে এখানে এসে তোমার জন্য চোখের জল ফেলেছে, সে তো আমি নিজের চোখেই দেখেছি।
রবি কাদম্বরীর হাত ধরে একপাক ঘুরে যান নাচের ভঙ্গিতে, গেয়ে ওঠেন, আয় তবে সহচরী
জ্যোতি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, বাঃ বেশ তো গানটা, নতুন লিখলি রবি? লাগিয়ে দে আমাদের নাটকে।
এবার স্বর্ণকুমারীও বলে উঠলেন, না রবি, তোর গলা একটু পালটেছে ঠিকই, নতুনবউঠান ভুল কিছু বলেননি। কেমন যেন বিদেশি বিদেশি লাগছে, ভালই লাগছে।
অক্ষয় বললেন, বিলিতি সুরের প্রভাবে গলা একটু পালটেছে ঠিক, তার ওপর ওর এখন বয়ঃসন্ধি পেরোনো কণ্ঠ। রবির গলায় আইরিশ মেলোডির ছোঁয়া লেগেছে।
রবি আপাদমস্তক শিউরে ওঠেন কী এক অজানা ভাললাগায়, একদিন ছিল যখন অক্ষয়ের কণ্ঠে আইরিশ মেলোডির ওইসব কবিতার আবৃত্তি শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। বিলেতে গিয়ে সুরগুলি শিখে এসে অক্ষয়কে কবে শোনাবেন, তাই ভাবতেন কিশোর রবি। শিখেছেনও, কিন্তু সব সুর যে ভাল লেগেছে তা নয়। কিছু সুর মিষ্টি, সরল, করুণ। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের প্রাচীন কবিসভার বীণ ছোটবেলায় যেভাবে বেজে উঠত, বিলেতে যেন তেমনভাবে বাজল না। বরং তিনি অন্য অনেক সুর শিখেছেন। লুসির সঙ্গে সুরের খেলায় মেতেছিলেন এই সেদিন, এখন যেন পিয়ানোর ছেঁড়া তার। বেজে ওঠে বুকে। চোখের জল লুকোতে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ান তিনি।
জ্ঞানদা অন্য কথা বলেন, প্রথমে নিজেদের মধ্যেই মানময়ীর অভিনয় হোক না। কে কী পার্ট করবে সব ঠিক করা যাক।
আমি সুরাটে গিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার আগেই তা হলে অভিনয় হোক, সত্যেন বললেন। এতদিন দূরে ছিলাম, একটু গানবাজনা অভিনয়ের স্বাদ নিয়ে কাজে ফিরতে চাই।
ঘরে বসেই ঠিক হয়ে গেল, জ্যোতি করবেন ইন্দ্রের পার্ট, রবি মদন।
আর শচী সাজবেন কে? কাদম্বরী পরম উৎসাহে জানতে চান।
বহুদিন বিদেশে থেকে জ্ঞানদার মন থেকে নতুনবউয়ের ওপর অসন্তোষ কিছুটা কমেছে। মেয়েটা কেমন শীর্ণ হয়ে গেছে, চোখের তলায় জমে আছে বর্ষার মেঘ।
তুমিই তো শচী সাজতে পারো নতুনবউ, জ্ঞানদা বললেন, সাজলে গুজলে নতুনের সঙ্গে তোমায় বেশ মানাবে।
এমনিতে বুঝি মানায় না? কাদম্বরী সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেন জ্ঞানদার গোপন ইশারাটি। ঠিক কীরকম হলে মানাবে বলো তো?
আহা, মেজোবউঠান ওভাবে কিছু বলেননি, জ্যোতি তাড়াতাড়ি বলেন, তোমরা আবার শুরু করে দিয়ো না, দোহাই নতুনবউ।
অভিমানিনী কাদম্বরী রবির কাছে জানলায় গিয়ে দাঁড়ান। রবি তার হাতে হাত রাখে। কানে ফিসফিস করে উচ্চারণ করে নিজের লেখা একটি কবিতা,
হয়তো জান না, দেবি, অদৃশ্য বাঁধন দিয়া
নিয়মিত পথে এক ফিরাইছ মোর হিয়া।
গেছি দূরে গেছি কাছে, সেই আকর্ষণ আছে
পথভ্রষ্ট হই নাক তাহারি অটল বলে।
বৈশাখে বাড়ির আঙিনায় মহা ধুমধাম করে মানময়ীর অভিনয় হল। কাদম্বরী সর্বস্ব পণ করে অভিনয় করলেন, মানময়ী শচীর চোখের জলে মিশিয়ে দিলেন নিজের চেপে রাখা অশ্রুজলরাশি।
সবাই নাটকের অভিনয়ের প্রশংসায় মাতোয়ারা, বিশেষত কাদম্বরীর অভিনয় সবাইকে অবাক করেছে। সকলে যখন ধন্য ধন্য করছে তখন জ্যোতিকে আড়ালে টেনে নিয়ে তার আঙরাখার সোনার বোম ধরে নাড়াচাড়া করতে করতে কাদম্বরী জানতে চান, তোমার বিনোদিনী কি আমার চেয়েও ভাল অভিনয় করে?
উঃ, নতুনবউ, তোমার মাথার ঠিক নেই! জ্যোতি ছিটকে যান, যে অধরা আগুনকে ভুলে থাকতে চাইছেন তিনি আবার তাকেই কেন টেনে আনে কাদম্বরী!
নাটকের মানময়ীর মানভঞ্জন হয়, কিন্তু বাস্তবের মানময়ী নিজের পরম সাফল্যের দিনেও চোখভরা অশ্রু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন চিত্রার্পিত।
১৫. শ্ৰীমতী হে
রবির প্রেরণা কাদম্বরী, কাদম্বরী জ্যোতির জন্য উতলা, জ্যোতি বিনোদিনীর জন্য। মাঝে মাঝে জ্যোতি ভাবেন, বিনোদিনী কি তার জীবনের ফেম ফেটাল! কী অনিবার্য আকর্ষণে সব ওলটপালট করে দিচ্ছে সে। প্রিয়তমা নতুনবউকেও আর তত প্রিয় মনে হয় না, অথচ বিনোদিনী ধরা দেয় না। কাদম্বরীকেই বা সামলাবেন কীভাবে, সে যে তিল তিল করে ধ্বংস করছে নিজেকে।
কাদম্বরী ভাবছেন, জ্যোতি কার্তিকের মোহান্ধ পোকার মতো আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছেন, কী করে তাকে সরিয়ে আনবেন ওই নটীর অগ্নিশিখা থেকে। কী করে বাঁচাবেন নিজেকে?
রবি বুঝতে পারেন দুজনকেই। জ্যোতিদাদার কাছে বিনোদিনী এখন দেবী মিউজ, সরোজিনীর পর থেকেই তাকে নিয়ে পাগলা হয়ে আছেন কিন্তু রবির মিউজ নতুনবউঠান। এমন এক আশ্চর্য নারী, চাঁদনি রাতের আলোর মতো, কনকচাপার সৌরভের মতো যার উপস্থিতি, তাকে কেন চোখের জলে ভাসতে হবে? তার কথা ভাবতে ভাবতে পাতার পর পাতা কবিতা লিখে চলেন রবি। ভগ্নহৃদয় কাব্যটি শেষ হতে চলল এবার, প্রথম সর্গ শুরু হয়েছিল বিলেত যাওয়ার আগে।
সর্বনাশিনী সেই বিনোদিনীর থেকে অনেক দূরে শান্তিনিকেতনে চলে এলেন ওঁরা, রবি জ্যোতি ও কাদম্বরী। সবুজের সেই অবারিত আঙিনায় কাদম্বরীকে ঘিরে দুই অসাধারণ যুবকের মনে দুরকম ঘূর্ণি পাকিয়ে ওঠে।
একগুচ্ছ বকুলফুল কুড়িয়ে এনেছেন কাদম্বরী, ফুল নাড়াচাড়া করতে করতে আদুরে গলায় বলেন, এই ফুলগুলো যেমন শুকিয়ে যাবে, আমিও একদিন শুকনো বকুলের মালার মতো তোমাদের ঘরের কোনায় পড়ে থাকব।
