সরোজিনী নিয়ে দর্শকেরা পাগল হয়ে গেছিল ঠিকই, বিনোদিনী বলেন, কিন্তু ঠাকুর, আগেও অমন হয়েছে। আমরা যখন গ্রেট ন্যাশনাল থেকে সারা ভারত ঘুরে ঘুরে নীলদর্পণ করছিলাম, কী হয়েছিল জানো! ক্রমে সেই দৃশ্যটা এল, রোগসাহেব ক্ষেত্ৰমণিকে পীড়ন করছে আর ক্ষেত্ৰমণি নিজের ধর্মরক্ষার জন্য চিৎকার করে বলছে, ও সাহেব, তুমি মোর বাবা, মুই তোর মেয়ে। ছেড়ে দে, আমায় ছেড়ে দে। তারপর তোরাপ এসে সাহেবের গলা টিপে ধরে হাঁটুর গুঁতো কিল চড় মারছে, অমনি সাহেব দর্শকরা হইচই শুরু করে দিল। কতগুলো লালমুখো গোরা তরোয়াল খুলে স্টেজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেকী হুড়োহুড়ি চিৎকার!
জ্যোতি বলেন, জানি বিনোদ, সেই অভিনয় দেখেই তো আমি তোমাকে সরোজিনীর পার্ট দেব ঠিক করলাম। কিন্তু সরোজিনীর উন্মাদনা আরও বেশি ছিল। অন্যদের দিকে তাকিয়ে আবার বলেন, আপনারা দেখেননি, সরোজিনী এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে ওই নাটকটি গ্রামেগঞ্জে যাত্রাপালা হয়েও ছড়িয়ে পড়েছে।
গিরিশের একটু গায়ে লাগে, বলেন, আপনি সরোজিনী ভুলতে পারছেন না, মেঘনাদ বধের সাতটি চরিত্রে ওকে দেখেননি? বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনীতে? মৃণালিনীতে ওর অভিনয় দেখে বঙ্কিম বলেছেন, আমি মনোরমার ছবি লিখেছিলাম, কখনও প্রত্যক্ষ চলেফিরে বেড়াতে দেখব আশা করিনি। এখন বিনোদিনীর অভিনয়ে যেন জ্যান্ত মনোরমাকে দেখছি।
চেলা বলে, আর সধবার একাদশীর কাঞ্চন?
আরেক চেলা বলে, ব্রিটানিয়া, পলাশীর যুদ্ধে?
অমৃতলাল বসু বললেন, সরোজিনীতে খুব ভাল পার্ট করেছিল বিনোদিনী সত্যি, কিন্তু গিরিশ যখন নায়ক সাজে, তার উলটোদিকে নায়িকা বিনোদিনীকে যেমন মানায়, তেমনটা আর কিছুতে না।
জ্যোতির বিমর্ষ লাগে, এখানে যেন গিরিশের রাজ্যপাট। গিরিশের কবল থেকে না ছাড়াতে পারলে এভাবে বিনোদিনীকে রাজি করানো যাবে না।
জ্যোতি ঘুরেফিরে আসেন বিনোদিনীর কাছে। বিনোদিনীও খুশি হন তাকে দেখলে, নিজের লেখা কবিতার খসড়া শোনান। জ্যোতিঠাকুর প্রশংসা করলে তাঁর শরীরে খুশির হিল্লোল বয়ে যায়। জ্যোতি আসতেই নিজের লেখায় সুর বসিয়ে বিনোদিনী গান গেয়ে ওঠেন,
চাই না চাই না চাই নারে তোর ওজন করা ভালবাসা
সিন্ধুসম ভালবাসা বিন্দুতে কি যায় পিপাসা
ভালবাসা পাকা সোনা, ভালবাসায় খাদ মেশে না
ভালবাসা বেচাকেনা ভরাডুবি করে আশা।
জ্যোতি আকুল হয়ে বলে ওঠেন, এমন গান তুমি কাকে নিয়ে বেঁধেছ সরোজিনী? কে তোমাকে এমন দাগা দিল? আমাকে বলল, আমি তোমার সব কষ্ট বুক পেতে নেব বলেই তো বারবার ছুটে আসি।
বিনোদ রহস্যময় হাসি হেসে আর-একটা গান ধরেন।
জ্যোতি যখন তাঁকে নিজের লেখা গান বা নাটক শোনান, বিনোদিনী তখন মুগ্ধ শ্রোতা। কিন্তু তার মনের কোণের নিভৃত জায়গাটায় কিছুতেই যেন পৌঁছতে পারেন না জ্যোতি। সেখানে বিনোদ তাকে ঢুকতে দেয় না কেন? কে বসে আছে সেখানে? গিরিশ না অন্য কেউ? নিজের কন্দর্পকান্তি রূপ এবং আশ্চর্য প্রতিভাকে ব্যর্থ মনে হয় জ্যোতির। ভগ্নহৃদয় নিয়ে বারবার বিনোদিনীর কাছ থেকে ফিরে আসেন তিনি।
ফিরে আসেন কাদম্বরীর কাছে। কিন্তু ফিরে এসেও সুখ কোথায়? কাদম্বরী তো বারবার জ্যোতিকেই কাঠগড়ায় তোলে। কেঁদেকেটে অস্থির করে তোলে বিনোদিনীর সঙ্গে কল্পিত প্রণয়ের অভিযোগে।
কাদম্বরীকে নিয়ে একদিন স্টিমারে ভেসে পড়লেন জ্যোতি, সঙ্গে অক্ষয় ও দু-একটি বন্ধুবান্ধব। সেদিন ওঁদের গানবাজনার মুড, জ্যোতি পাগলের মতো সুর তৈরি করছেন আর অক্ষয় কথা বসাচ্ছেন। বন্ধুরা বাহবা দিচ্ছেন সুরে সুর মিলিয়ে।
কাদম্বরী আজ আসরের মধ্যমণি। জ্যোতি সুর দিচ্ছেন তার দিকে তাকিয়ে, অক্ষয় গান গাইছেন তাকে ঘিরে। আকাশের পাখি, নদীর জল তাঁকে ঘিরে উৎসবে মেতেছে। কাদম্বরীর বড় ভাল লাগে। বহুদিন পরে আবার এমন আসর, গত বসন্তের স্মৃতির মতো, বেলকুঁড়ি-গন্ধমাখা তেতলার ছাদের সন্ধ্যার মতো। আজ আবার যেন তিনি ত্রিমুণ্ডী হেকেটি।
আকাশ কালো করে ঝড় এল, বৃষ্টি এল, পালের মতো উড়তে লাগল কাদম্বরীর শাড়ি, তবু কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। নীল মেঘডম্বরু শাড়ির ঘোমটায় মাথা ঢেকে নিলেন হেকেটি আর দুই ঘোরলাগা পুরুষ গান তৈরি করে চললেন।
বাহ্যজ্ঞানহীন তুরীয় অবস্থায় জ্যোতি ও অক্ষয় একের পর এক কত গান যে তৈরি করলেন সেদিন! গানগুলি ইন্দ্র, শচী ও দেবদেবীদের নিয়ে নানারকম প্রেমের, রাগ অনুরাগের গান। চন্দননগরে পৌঁছে সেগুলি নিয়ে বসলেন দুই বন্ধু, ঘষামাজা করে তৈরি হল মানময়ী নামে একটি গীতিনাট্য।
নাটক তৈরি হতেই জ্যোতির আর-একরকম ছটফটানি, এবার থিয়েটার নামাতে হবে। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এই গীতিনাট্যের তোড়জোড়ের মধ্যেই ফিরে এলেন রবি, সত্যেন ও জ্ঞানদা। বাড়ির গানবাজনার এই চিরপরিচিত স্রোতে ফিরতে পেরে রবির মন নেচে ওঠে। গুনগুন করে মানময়ীর গানের সুর ভাঁজতে ভাজতেই রবি লিখে ফেললেন একটি নতুন গান।
রবির গলা শুনে কাদম্বরী বলেন, রবি কেমন পালটে গেছ, তোমার গলাও কেমন বিলিতি বিলিতি ঠেকছে।
আহা, এ-কথা শোনার জন্য কি ফিরে এলাম বউঠান, রবি মজা করে বলেন, সেখানে তোমার কথা ভেবে ভেবে রাতে ঘুম হত না, কত বিলিতি বালিকার ফুলশর অগ্রাহ্য করে তোমার কাছে ফিরে এলাম, আর তুমি এমন পরপর ভাব করছ!
