মহর্ষি রবিকে নির্দেশ দিলেন দেশে ফিরতে। কিছুদিন এলোমেলো বিলেত ভ্রমণের পরে সবে যখন ইংলিশ ক্লাসের শিক্ষক মি. মরলির পড়ানোয় আকর্ষিত হয়েছেন রবি, তখনই তার দেশে ফেরার ডাক এল।
স্কট আন্টি রবির হাত ধরে কেঁদে ফেললেন বিদায়কালে। রবির মনেও শেষ কদিন চলল অসহ্য টানাটানি। মালতীপুঁথির খাতা নানারকম আঁকিবুকি করতে করতে রবি লিখলেন তার বেদনার ভাষ্য,
‘ফুরালো দুদিন।কেহ নাহি জানে এই দুইটি দিবসে–
কি বিপ্লব বাধিয়াছে একটি হৃদয়ে।
দুইটি দিবস/চিরজীবনের স্রোত দিয়াছে ফিরায়ে–
এই দুই দিবসের পদচিহ্নগুলি/শত বরষের শিরে রহিবে অঙ্কিত।
যত অশ্রু বরষেছি এই দুই দিন/যত হাসি হাসিয়াছি এই দুই দিন
এই দুই দিবসের হাসি অশ্রু মিলি।
হৃদয়ে স্থাপিবে চির
হাসি অশ্রু।
বসন্ত বরষা।
নিজের বেদনা চেপে রেখে, ব্যারিস্টার বা আই সি এস হওয়ার চেষ্টায় জলাঞ্জলি দিয়ে, দুই নীলনয়নার হৃদয়ে দাগা দিয়ে ১৮৮০ সালের বসন্তকালে দেশে ফিরে এলেন রবি। পথে ফ্রান্স ভ্রমণ করে একইসঙ্গে বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে ফিরলেন সত্যেন জ্ঞানদাও।
.
বাবু কলকাতার এক আশ্চর্য নক্ষত্র বিনোদিনী। বারাঙ্গনার মেয়ে পুঁটি কী এক অসাধারণ জাদুমন্ত্রে নিজেকে পালটে নিয়েছে। তার রেয়াজি কণ্ঠের গানে, চমকদার রূপে আর অভিনয়ের মুনশিয়ানায় রাতের পর রাত জমে ওঠে আলোকিত নগরমঞ্চ। শহরের অভিজাত পুরুষেরা তার পায়ে লুটোপুটি খায়। অভিনয় শেষে কেউ ফুল নিয়ে আসে তো কেউ টাকার তোড়া, কেউ হিরের নেকলেস উপহার দেয় তো কারও হাত প্রণামের ছলে হাঁটু বেয়ে তার উরু ছুঁতে আসে।
বিনোদিনী অবশ্য সবাইকে পাত্তা দেন না। বাছা বাছা বাবুরাই তার প্রসাদ পায়। ধনীঘরের এক যুবক এখন তার প্রেমিক, যদিও সে ছেলেটির বাড়ি থেকে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
কিন্তু সবার ওপরে গিরিশচন্দ্র। তিনিই বিনোদিনীর ঈশ্বর। বিনোদিনীর বাড়িতে আজকাল প্রায়ই জমাটি আসর বসাচ্ছেন গিরিশ। অমৃতলাল বসু, অমৃতলাল মিত্রেরাও আসেন। কোনওদিন গিরিশ কিটসের কবিতা পাঠ করে শোনন তো আর-একদিন শেকসপিয়রের নাটক, কোনওদিন কাব্যালোচনা তো কোনওদিন আবার বিলেতের অভিনেত্রীদের কথা। মিসেস সিডেনস-এর লেডি ম্যাকবেথ চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের কথা প্রায়ই বলেন গিরিশ। বিনোদিনী চাতকের মতো শুষে সব রসগ্রহণ করেন। নিজেকে গিরিশের মনোমতো করে তুলতে তার চেষ্টার অন্ত নেই।
মলমলের নকশাকাটা উড়ানি উড়িয়ে, বিলিতি আতরের খুশবু ছড়িয়ে হঠাৎই এদিন সেখানে উপস্থিত হলেন জ্যোতি।
গিরিশ বলে ওঠেন, এ কাকে টেনে এনেছিস বিনোদ? এই খারাপ পাড়ায় নটীর ঘরে জ্যোতিঠাকুরের উদয় হল, লোকে যে আমাকেই দুষবে!
কেন গিরিশবাবু, আপনি এলে আমারই বা আসতে দোষ কোথায়? জ্যোতি বলেন। নটীর কাছে নাট্যকারকে তো আসতেই হবে।
জ্যোতি, তুমি বড়ঘরের ছেলে, গিরিশ তবু বললেন, তুমি এখানে এলে সমাজে অনেক কথা হবে। আমার কথা আলাদা, আমি সারাদিন নেশা করি, থিয়েটারের নেশায় যা খুশি করি, আমাকে নিয়ে কেউ কিছু বলে না, বললেও যায় আসে না।
আমি আপনাকে আমার নতুন নাটক শোনাতে চাই, জ্যোতি গিরিশকে বলেন, আপনি অনুমতি না দিলে বিনোদিনী তো তাতে অভিনয় করতে পারবে না।
বিনোদিনীর হিরের নাকচাবি ঠিকরে ওঠে। এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন তিনি, এখন বলে ওঠেন, আমি তো এখন ন্যাশনালে ছাড়া অন্য কোথাও থিয়েটার করব না, সরোজিনী করেছিলাম। জ্যোতিঠাকুরবাবু, এখন আপনার নাটক কী করে করি বলুন তো?
জ্যোতির হৃদয় সে মুহূর্তে যেন থেমে গেল, পৃথিবী দুলে উঠল। সরোজিনী! সরোজিনী! উঃ কী নিষ্ঠুর তুমি! বিনোদিনীর গা থেকে ভেসে আসা আতরের যে গন্ধ জ্যোতিকে পাগল করে সেই গন্ধে এখন তার দম বন্ধ হয়ে আসে।
গিরিশ কেঠো গলায় শ্লেষের সঙ্গে জ্যোতিকে বললেন, ও, আসল কথা এটাই, আমাকে নাটক শোনাতে চাওয়াটা একটা বাহানা, আসলে তুমি চাও বিনোদিনীকে!
উপস্থিত দু-একজন হেসে হেসে বলেন, বিনোদিনীকে কে না চায় মশায়, ঠাকুর একা আর কী দোষ করলেন?
এ-সব হেঁজিপেঁজি লোকের ফোড়ন কাটায় জ্যোতির মানে লাগে, অথচ সত্যিই তো বিনোদিনীর টানে চুম্বকের মতো ছুটে এসেছেন তিনি। ওর হাসি, ওর গন্ধ, ওর নাকচাবির ইশারা ওঁকে পাগল করে দেয় যে উন্মাদনা কোনও ঘরনির কাছেই পাওয়া সম্ভব না, যা এমনকী কাদম্বরীও দিতে পারে না।
একটু বিরক্ত হয়েই জ্যোতি বললেন, দেখুন গিরিশবাবু, এতে দোষ কীসের? বিনোদিনী ভাল অভিনেত্রী, আমি যদি তাকে আমার নাটকের হিরোইন করতে চাই, আপনার গায়ে লাগবে কেন?
গিরিশের এক ফচকে চেলা বলে ওঠে, রোজ সন্ধ্যায় জ্যোতিঠাকুর ন্যাশনালে আসেন বিনোদিনীকে দেখতে! রোজ!
তাতে কী হল? জ্যোতি ফুঁসে ওঠেন।
আহা রাগ করছেন কেন, বিনোদিনী জ্যোতির হাত ধরে অনুনয় করেন, ঠান্ডা হয়ে একটু বসুন দেখি!
জ্যোতি তার দিকে তাকিয়ে বলেন, তোমার কাছে আসতে এত পাথরে ঠোক্কর খেতে হয় কেন সরোজিনী?
আহা, ওটা কি আমার নাম নাকি? বিনোদিনী লজ্জা পান। আমি তো কত চরিত্র করেছি, যখন যে পার্ট করি সেটাই আমাকে সারাক্ষণ খেলার সঙ্গীর মতো ঘিরে রাখে, তখন আর অন্য পার্ট মনে থাকে না।
আমার কাছে তুমি চিরদিনই সরোজিনী হয়ে থাকবে, জ্যোতি বলেন, যতদিন-না আমার নতুন নাটকের হিরোইন হবে। ওই জ্বল জ্বল চিতা গানের সঙ্গে আগুনের দৃশ্যে তোমার রূপ যে দেখেছে সে কোনওদিন ভুলতে পারবে না।
