আমি তো ভেবেছিলাম, তোমার গায়ে উলকি আঁকা থাকবে আর নাকে কানে গলায় ভারী ভারী সব গয়না, হাসতে হাসতে লুসি বলল।
ও তোমরা ইন্ডিয়ান বলতে রেড ইন্ডিয়ান ভেবেছিলে, রবি লুসি-জেসির কথা শুনে মজা করে বলেন, দাঁড়াও না, একদিন ওরকম সেজে দেখাব তোমাদের। আবার মাসির বাড়ি পালাতে হবে।
ইসস, ভয় দেখাবে! লুসি বলে, দেখি কে কাকে ভয় দেখায়! পায়ে সেক দিয়ে দিচ্ছি, আরাম করে শুয়ে আছেন বাবু, আবার ভয় দেখাবেন!
রবি বলেন, তখন তো পালিয়ে গিয়েছিলে, এখন কী মনে হচ্ছে দেখে?
লুসি বলে, বলব না। বুঝে নাও।
.
রাতে খুব সুন্দর সুন্দর সব স্বপ্ন দেখলেন রবি। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। বাইরের ঘরের সোফায় এসে বসেছিলেন। এ বাড়ির সকালটা কীভাবে শুরু হয়, কে জানে। সব চুপচাপ। সবাই ঘুমোচ্ছে।
একটু পরে বড়মেয়েটি নেমে এল নীচে। ফায়ারপ্লেসের আগুন উসকে দিয়ে সে বলে, গুড মর্নিং রবি। ঘুম ঠিক হয়েছিল?
এটাই কথাবার্তা শুরু করার দস্তুর, রবিও তাকে বলেন গুড মর্নিং।
মেয়েটি দ্রুতপায়ে রান্নাঘরে গিয়ে রাঁধুনিকে ব্রেকফাস্টের ব্যাপারে কিছু নির্দেশ দেয়। আবার ফিরে এসে অগ্নিকুণ্ডে দু-চারটে কয়লা গুঁজে দিয়ে সোফায় বসে।
এমন সময় সিঁড়িতে দুদ্দাড় শব্দ। শীতে হি হি করে কঁপতে কাঁপতে মিস্টার স্কট। নামলেন। ফায়ারপ্লেসের কাছে গিয়ে হাত পা সেকতে সেকতেই গুড মর্নিং-এর পাট সেরে ফেললেন। তারপর খবরের কাগজ নিয়ে বসলেন খাবার টেবিলে।
রবিকে দু-একটা খবর পড়ে শোনাতে শোনাতে কফিপর্ব শুরু হয়ে যায়। লুসি ও জেসি নেমে এসে বাবার গালে চুমু দিয়ে সকাল শুরু করে।
মিস্টার স্কট বললেন, এই যে লুসি জেসি, আজ আবার ফাইন হল তোমাদের। আমার পরে ঘুম থেকে উঠেছ, দাও, দাও চার আনা ফাইন।
দেব, বাবা, দেব। ঠিক দিয়ে দেব। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে লুসি বলে। জেসিও বাবাকে একটু আদর করে যায়।
স্কট রবিকে সাক্ষী মেনে বলেন, দেখো রবি, এরা কথা রাখছে না। এদের সঙ্গে আমার চুক্তি আছে, ওরা আমার আগে উঠলে আমি পাঁচ সিকে পুরস্কার দেব আর আমি আগে উঠলে ওরা দেবে চার আনা ফাইন। ওদের কাছে আমার অনেক পাওনা হয়েছে, এরকম ডেট অব অনার ফাঁকি দেওয়া কি ভদ্রতা?
সব শেষে ব্রেকফাস্ট টেবিলে যোগ দিলেন মিসেস স্কট। সাড়ে নটার মধ্যে জলখাবার পর্ব শেষ। একটু হাসিঠাট্টার পরেই মেয়েদের তাগাদা দেন স্কট আন্টি। সবাই কাজে লেগে পড়ো। হাতে দস্তানা পরে আন্টি নিজে দাসীদের নিয়ে একতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত ঝাড়মোছ করান। রান্নাঘরে গিয়ে রুটিওলা, তরকারিওলা, মাংসওলার বিল দেখে পাওনা মেটান। কর্তার সঙ্গে পরামর্শ করেন। রান্নার তদারক করেন। বড় মেয়েটিও তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে।
মেজোমেয়ে জেসির কাজ হল দাসীরা ঘর ঝাঁট দেওয়ার পর একটা ঝাড়ন নিয়ে ড্রয়িংরুমের ধুলো সাফ করা। লুসি তখন সেলাই নিয়ে বসে। বালিশের ওয়াড় বা মোজা রিপু করা, চিঠিপত্র লেখা এ-সব তার কাজ। লুসি কিন্তু গানবাজনাও করে, বাড়িতে সে একমাত্র গাইয়ে-বাজিয়ে। গানের আসরে আজকাল রবিও সোৎসাহে যোগ দিচ্ছেন।
.
লুসির খেয়ালে হঠাৎ একটি নতুন খেলা শুরু হল কিছুদিন। প্ল্যানচেট-চর্চা। এক-একদিন সন্ধ্যায় টেবিল চালা হত। কয়েকজন মিলে চেয়ারে বসে একটা টিপাইতে হাতে হাত লাগিয়ে রাখতেন আর টিপাই উন্মত্তের মতো সারাঘরে ঘুরে বেড়াত। শেষে যাতে হাত দেন তাই নড়তে শুরু করে। একবার খেলাচ্ছলে ওরা মিস্টার স্কটের টুপির দিকে হাত বাড়াতেই স্কট আন্টি ছুটে এসে টুপি সরিয়ে নিলেন, স্কটসাহেবের কোনও জিনিসে শয়তানের স্পর্শ লাগুক সেটা তিনি হতে দেবেন না কিছুতেই।
এরমধ্যে রবি ভরতি হয়েছেন লন্ডনে ইউনিভার্সিটি কলেজে ইংলিশ পড়ার জন্য। এখানে রবির সহপাঠী তারকের ছেলে লোকেন। বয়স কম হলেও অদ্ভুতভাবে তেরো বছরের লোকেনের সঙ্গে আঠারো বছরের রবির বন্ধুত্ব খুব জমে উঠল অচিরেই। লুসিকে বাংলা শেখাতে গিয়ে রবি যখন শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন, তখনও তার সাহায্যকারী লোকেন পালিত।
রবির সন্দেহ হয় শুধু লুসি নয়, জেসিও যেন তার প্রতি একটু বেশিই মনোযোগী। বাগানের গাছের ফাঁকে, ছাদের দক্ষিণমুখো ঘরে, পিয়ানোর রিডের ওঠা-নামায়, প্ল্যানচেটের আঙুল ছোঁয়ায় কী যে মধুর রহস্য পল্লবিত হয়ে ওঠে, রবি সবটা যেন বুঝতে পারেন না।
ইংলিশ ক্লাসের ফাঁকে রবি তার সমস্যার কথা বলেন লোকেনকে। লুসি যেন কী একটা কথা বলতে চায়, কিন্তু কী বলতে চায় রবি বোঝেন না। আবার জেসিও কত রহস্য করে লুসিকে লুকিয়ে।
লোকেন তাকে বলে, বুঝতে পারছ না, ওরা দুজনেই তোমার প্রেমে পড়েছে।
রবি বলেন, কী জানি, আমি তো বিশ্বাস করার মতো মরাল কারেজ পাচ্ছি না। কী যে করি!
কী আবার করবে, লোকেন অনেক পরিণত, প্রেম করো। ফ্লার্ট করো। ওরা তোমার সুরের ভক্ত, চেহারায় মুগ্ধ।
রবি সাহস পান না। তার মনে পড়ে যায় ঘরের কোনার একটি রহস্যময় কালো চোখ। কালো আর নীল চোখের টানাপোড়েনে হাবুডুবু খান তরুণ রবি।
স্কটকন্যাদের সঙ্গে রবির মাখামাখি বন্ধুত্বের কাহিনি কিছুটা পল্লবিত হয়ে ক্রমে দেবেন ঠাকুরের কানেও এসে পৌঁছল। তার ওপর ইংরেজ মেয়েদের স্বাধীন রূপ নিয়ে রবির মুগ্ধতা যেভাবে ভারতীতে য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র নামে প্রকাশিত হচ্ছিল, তাতে দেশে বেশ শোরগোল পড়ে গেল। কয়েকজন তো জোর তর্ক বাঁধিয়ে দিলেন এ নিয়ে।
