মাঝে মাঝেই সত্যেন আসেন। কোনওদিন সত্যেন, তারক ও রবি হয়তো দল বেঁধে যোগ দিলেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সভায়। আবার কোনওদিন ব্রিটিশ গণতন্ত্রের কাঠামোকে কাছ থেকে দেখার জন্য তারা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গ্রীষ্ম অধিবেশন দেখতে গেলেন। পরপর কদিন গিয়ে কিন্তু হতাশ হলেন রবি।
ঘরে ফিরে সত্যেন ও তারককে বলেই ফেললেন তার নিরাশার কথা, পার্লামেন্টের অভ্রভেদী চূড়া, প্রকাণ্ড বাড়ি, হাঁ করা ঘরগুলো দেখলে খুব তাক লেগে যায়; কিন্তু ভেতরে গেলে তেমন ভক্তি হয় না। ইংরেজদের গণতন্ত্র ও বিচক্ষণতা সম্বন্ধে আমার যতটা উঁচু ধারণা ছিল, ততই এরা হতাশ করল।
সত্যেন নিজেও বেশ হতাশ, ইংরেজরা যে এমন অসভ্যের মতো চেঁচামেচি করবে এ আমার দুঃস্বপ্নের অতীত ছিল।
রবি যোগ করলেন, এরা তো অন্য কাউকে কথা বলতেই দিচ্ছে না,বক্তাকে কতভাবে যে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তা ভাবা যায় না, কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ হিসস হিসস শব্দ করে, এত অসংযত!
তারক একটু লঘু করার চেষ্টা করেন, আসলে তোমরা বুঝতে পারছ না, এটাই রাজনীতির আসল চেহারা, কেউ কাউকে বলতে দেব না, কেউ কাউকে বিনা যুদ্ধে একচুল জমি ছাড়ব না।
তা হলে ভদ্রতা, সৌজন্যের বড় বড় কথাগুলো সব ইংরেজদের ভণ্ডামি, রবি তবু ফুঁসে ওঠেন। সেদিন যে আইরিশ মেম্বার ভারতের প্রেস অ্যাক্ট এর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছিলেন, কেউ তার কথা মন দিয়ে শুনলই না! অথচ ভারতবাসীর করের টাকাতেই ওদের এত রমরমা। ভারতের কোনও রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকবে নাই বা কেন?
রবি যা খেপেছে এবার না রাজদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারক বলেন, তার চেয়ে তাড়াতাড়ি ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে এ-সব তর্ক তোলার চেষ্টা করো।
তবে হ্যাঁ, রবি বলেন, কিছু যে শেখার মতো পাইনি তা বলব না, গ্ল্যাডস্টোনের বাগ্মিতায় আমি অভিভূত। তিনি মঞ্চে ওঠামাত্রেই সমস্ত ঘর একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, গলার স্বর শুনতে পেয়ে বাইরে ঘুরে বেড়ানো মেম্বারেরা এসে বসতে লাগলেন, দুদিকের বেঞ্চি ভরতি হয়ে গেল, তখন যেন পূর্ণ উৎসের মতো গ্ল্যাডস্টোনের ভাষণ উৎসারিত হতে লাগল। তিনি তেজের সঙ্গে বলেন কিন্তু চিৎকার করেন না, যা বলেন আন্তরিক বিশ্বাস থেকে বলেন। আর অন্যদিকে, আইরিশ মেলোডির সুরে মজে থাকার পাশাপাশি উপেক্ষিত আইরিশ মেম্বারদের প্রতি আমার টান রোজই বাড়ছে।
ওঁরা সেদিন তারক পালিতের বাড়িতে উঠেছেন। হঠাৎ বালা এসে রবির হাত ধরে টানতে থাকেন পিয়ানোর দিকে।
পেছন থেকে সতু বলে ওঠেন, অনেক রাজনীতি হয়েছে, এবার তোমার একটা আইরিশ মেলোডি শোনাও রবি। আমার বিলেতি বান্ধবীরাও তোমার গলার খুব প্রশংসা করেছে।
সেই ভাল, স্কচের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে তারক বললেন, রবির গান শোনা যাক এবার, বালা সতুর ইংরেজ বান্ধবীরাও যখন ভাল বলছে!
রবির গান শেষ হতেই বালা যোগ করেন, রবির গলার এই টেনর ইংরেজ মেয়েদের মুগ্ধ করেছে। শুধু তাই নয়, রবি, তোমার চেহারার প্রশংসাতেও পঞ্চমুখ তারা।
সতু বলেন, রবি তো লজ্জায় মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতেই পারে না। এখানে পার্টি হলে সবাই একটু আধটু ফ্লার্ট করে, তুমি কেন করতে পারছ না রবি! তোমাকে মেয়েরা এত পছন্দ করে!
রবি লাজুক হেসে বললেন, আমার চোখ সেই যে বাঙালি মেয়ের কালোহরিণ চোখে বাঁধা পড়েছে, তার থেকে আর মুক্তি পেলাম না। বিলিতি নীলনয়নাদের দেখে আমার পুষিবেড়াল পুষিবেড়াল মনে হয়।
.
কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য দুজন নীলনয়না পুষিবেড়ালের সঙ্গে সরস বন্ধুত্বে জড়িয়ে পড়লেন রবি। মাঝখানে কিছুদিন বার্কারদের বাড়িতে কাটিয়ে তাদের দাম্পত্য ঝগড়ায় বিপর্যস্ত রবি আশ্রয় নিলেন লুসি স্কটদের পরিবারে। বিলেতের এই পরিবারটি হয়ে উঠল তার আপনজনের মতো। বিশেষত মাতৃস্নেহবঞ্চিত রবিকে মিসেস স্কট তার অসীম স্নেহের বন্ধনে বেঁধে ফেললেন।
রবি কাদম্বরীকে চিঠিতে লিখতে থাকেন, এখন আমি ক-র পরিবারের মধ্যে বাস করি। তিনি, তাঁর স্ত্রী, তাদের চার মেয়ে, দুই ছেলে, তিন দাসী, আমি ও টেবি বলে এক কুকুর নিয়ে এই বাড়ির জনসংখ্যা। মিস্টার ক একজন ডাক্তার। তার মাথার চুল ও দাড়ি প্রায় সমস্ত পাকা। বেশ বলিষ্ঠ সুশ্রী দেখতে। অমায়িক স্বভাব, অমায়িক মুখশ্রী। মিসেস ক আমাকে আন্তরিক যত্ন করেন। শীতের সময় আমি গরম কাপড় না পরলে তার কাছে ভর্ৎসনা খাই। খাবার সময় যদি তার মনে হয় আমি কম খেয়েছি, তা হলে যতক্ষণ না তাঁর মনের মতো খাই ততক্ষণ পীড়াপীড়ি করেন। বিলেতে লোকে কাশিকে ভয় করে; দৈবাৎ যদি আমি দিনের মধ্যে দুবার কেশেছি তা হলেই তিনি জোর করে আমার স্নান বন্ধ করান, আমাকে দশরকম ওষুধ গেলান, শুতে যাবার আগে আমার পায়ে খানিকটা গরম জল ঢালবার বন্দোবস্ত করেন, তবে ছাড়েন।
রবিকে গরম জলের সেক দিতে এসে লুসি ও জেসি নানারকম খুনসুটি শুরু করে দেয়, তাদের চঞ্চলতায় রবির সংকোচ কেটে যাচ্ছে। তিনিও বেশ ওদের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে ওঠেন।
লুসি হেসে হেসে বলে, জানো রবি, একজন ইন্ডিয়ান অতিথি আসবে শুনে আমরা ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে মাসির কাছে চলে গিয়েছিলাম!
কেন, রবিও মজা পেয়ে জানতে চান, আমি কি ভূত না রাক্ষস?
না না, জেসি এবার বলে, আমরা ভেবেছিলাম কোথাকার কোন জংলি আসছে, বড় বড় নখ, গায়ে গন্ধ।
