মালিনী চুপ করতেই হাততালি দিয়ে ওঠেন স্বর্ণকুমারী। এমন অপূর্ব ভাষা, এমন রসবোধ, আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি। বল না মালিনী কে লিখেছেন, কোথা থেকে মুখস্থ করলি এই লেখা?
কাদম্বরী কেমন ঘোরের মধ্যে বলেন, গিরিবালা জিতে গেল! সত্যি এমন করে শোধ নেওয়া যায়! কী আশ্চর্য!
রূপা হাততালি দিয়ে বলে, কী মজা, চাইলে তুমিও তো এমন পারো নতুন বউঠান।
চুপ কর, যা মুখে আসে তাই বলিস, রূপাকে ধমক দিয়ে অন্যমনস্ক কাদম্বরী আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ান। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী যেন খুঁজতে থাকেন নিজের চেহারায়।
কার লেখা বল না, অধীর হয়ে ওঠেন স্বর্ণ, কেন হেঁয়ালি করছিস মালিনী। সে লেখকের আর কি কোনও লেখা আছে, এটাই বা কোথায় পেলি?
আমি জানি না দিদি, সত্যি বলছি, মালিনী বলে, আমার মাথায় মাঝে মাঝে কী যেন ভর করে, এগুলো বোধহয় এখনও লেখা হয়নি, কিন্তু কোথাও লেখা চলছে। গল্পটা আর নাম পড়তে পারছি, মানভঞ্জন; কিন্তু লেখকের নামের জায়গাটা খালি, আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে দিদি। আমি যাই।
এই থিয়েটার-পর্বের রেশ কাটতে না কাটতেই এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল বাড়িতে। শীতের দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ঊর্মিলাকে নিয়ে কাদম্বরী শুয়েছিলেন। বিছানায়। কখন চোখ লেগে গেছে টের পাননি।
ঊর্মিলা পালঙ্ক থেকে নেমে খেলতে খেলতে কখন ছাদের বাঁকা সিঁড়ির দিকে চলে গেছে, তারপর নামতে গিয়ে গড়িয়ে পড়েছে সিঁড়ির নীচে। তার কান্নায় ঘুম ভেঙে কাদম্বরী যখন ছুটে এলেন, ততক্ষণে ব্রেন কনকাশন হয়ে নিথর ঊর্মিলার শরীর।
ঊর্মিলার দেহ কোলে নিয়ে মূৰ্ছা গেলেন কাদম্বরী। দাসীরা ছুটে গিয়ে যখন লেখার টেবিলে সাধনায় মগ্ন স্বর্ণকুমারীর কাছে খবর পৌঁছে দিল, সংবাদের আকস্মিক আঘাতে তিনিও অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
সারা বাড়িতে কালো ছায়া নেমে এল। বালক-বালিকাদের যে যার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, স্বর্ণর ছেলেমেয়েদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সতীশ পণ্ডিতের ঘরে। মৃত্যুর নিষ্ঠুর রূপ যেন তারা জানতে না পারে। ওদের বলা হল, ঊর্মিলা কোথায় বেড়াতে গেছে।
শোকাচ্ছন্ন পরিবারের মহিলারা সবাই জড়ো হয়েছেন মৃত বালিকাকে ঘিরে। সৌদামিনীর চিন্তা, জানকীনাথ বিদেশে, এই অবস্থায় এতবড় আঘাত কী করে সামলাবেন স্বর্ণ? কোনায় বসে থাকা অশ্রুমতী কাদম্বরীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলে ফেললেন, দাসদাসীদের এত পয়সা দিয়ে রাখা হয়েছে, বাচ্চারা তো তাদের কাছেই ভাল থাকে বাপু, নজর রাখতে না পারলে এত আদিখ্যেতার দরকার কী ছিল?
কথাটা কাদম্বরীর বুকে শেলের মতো বেঁধে। তিনি বলেন, ঊর্মিলা কি আমার সন্তান নয়? পেটে ধরিনি বলে এতবড় নিষ্ঠুর কথাটা বলতে পারলে বড়ঠাকুরঝি?
তা হলেও নতুনবউ, নীপময়ী বললেন, তোমার আরেকটু সাবধান হওয়া উচিত ছিল। খোলা সিঁড়ির সামনে বাচ্চা নিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে, একবার দাসীদের ডাকা যেত না?
কাদম্বরী কাঁদতে কাঁদতে স্বর্ণর সামনে এসে কাধ ধরে নাড়িয়ে বলেন, তুমিও কি আমাকে দোষ দিচ্ছ স্বর্ণ ঠাকুরঝি? সত্যি বলো, আমার জানা দরকার তুমি কী ভাবছ।
স্বর্ণ উত্তর দেন না, কাঁদতে থাকেন, কাঁদতেই থাকেন। সৌদামিনী কাদম্বরীকে বলেন, ওকে বিরক্ত কোরো না, একটু কাঁদতে দাও। সন্তানের অপঘাত মৃত্যুর চেয়ে বড় শোক হয় না।
সৌদামিনীর কথায় অবাক হয়ে যান কাদম্বরী, তিনিও যে সদ্য তার একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন, তার সেই যন্ত্রণার কথা কেউ অনুভবই করছে না যেন? এরা কী নিষ্ঠুর অনুভূতিহীন! স্বর্ণ কোনও জবাব দিচ্ছে না কেন? সেও কি আমাকে দোষ দিচ্ছে?
পেছন থেকে কে যেন বলে ওঠে, নিজের পেটের মেয়ে হলে কি এমনি ঘুমিয়ে পড়তে পারতে ঠাকরুন? মায়ের চেয়ে কি কোনওদিন মাসির দরদ বেশি হয়, না হতে পারে?
হায়, হায়! এ-কথা শোনার আগে তাঁর মৃত্যু হল না কেন? আর কী মানে আছে বেঁচে থাকার? স্বর্ণর নীরবতা তাকে সবচেয়ে আঘাত করছে। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদতে থাকেন সন্তানহীনা অপমানিতা কাদম্বরী।
রূপা কোথা থেকে ছুটে এসে কোলে তুলে নেয় কাদম্বরীর লুটিয়ে পড়া মাথা। তাকে জড়িয়ে তুলে ধরে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে সবার দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে, তোমরা কি মানুষ? একেই নতুনবউঠান মৃত্যুশোকে যন্ত্রণা পাচ্ছেন, তার ওপর তোমরা বাক্যবাণে বিধছ? ছিঃ!
রূপার দুঃসাহসে বাড়ির মেয়েরা স্তম্ভিত পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার কাঁধে ভর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে থাকেন অশ্রুমতী কাদম্বরী, পেছনের লম্বা বারান্দা জুড়ে তার গঙ্গাজলি ডুরে শাড়ির আঁচল লুটিয়ে চলে, যেন এক নদীর মতন।
১৪. লুসি ও বিনোদিনী
রবিকে ইংলন্ডে আনা হয়েছে ব্যারিস্টারি বা আই সি এস পরীক্ষার জন্য। কিন্তু মেজোবউঠানের স্নেহচ্ছায়ায়, ঘরের আরামে রবির ভগ্নহৃদয় কাব্যটি এগিয়ে চললেও পড়াশোনা যে খুব বেশি এগোচ্ছে না সেটা কিছুদিনের মধ্যেই লক্ষ করলেন সত্যেন। সুতরাং বন্ধু তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে তাকে লন্ডনে পাঠানো হল। প্রথমে কিছুদিন রিজেন্ট পার্কের সামনে একটি ভাড়া বাড়িতে একা থাকার প্র্যাকটিস করতে হল তাকে। লোকজন কেউ দেখা করতে এলে রবির মনে হয় তাদের জোর করে ধরে রাখবেন, এই শীতে নির্জন ঘরে তার প্রাণ যেন হাঁপিয়ে ওঠে।
