আমি বললাম, করব।
তিনি নিষ্ঠুরভাবে আমার হাতটা ছাড়িয়ে দিলেন। ঠেলা লেগে আমি পড়ে গেলাম। তিনি চলে গেলেন। ওই কি আমার সেই স্বামী, যিনি লোকনিন্দা উপেক্ষা করে দিনের পর দিন আমাকে নিয়ে ঘোড়ায় চেপে ময়দানে ঘুরেছেন, কত কাব্যপাঠ করে শুনিয়েছেন, গান শুনিয়েছেন? আমি যেন সেই স্বামীকে চিনতে পারি না।
বই-মালিনী বইয়ের কাঁপ নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ায়, বলে আজ তোমার ঘরে ঢুকব, না, ঢুকব না নতুনবউঠান?
মেঘলা আকাশের মতো টলটলে চোখ তুলে তাকান কাদম্বরী। মালিনী এসেছিস, আয়, তোর কথাই ভাবছিলাম। তোর সেই গিরিবালার তারপর কী হল সেদিন শোনা হয়নি।
তুমি তো সেদিন রাগ করে তাড়িয়ে দিলে আমাকে, মালিনীর স্বর একটু অভিমানী শোনায়।
তা হোক, তুই শোনা মালিনী, কাদম্বরী কৌতূহলী, আমি সেদিন থেকে মাঝে মাঝেই ভাবি গিরিবালার কী হল!
তখন রাত্রি দশটা। বাড়ির আর সকলে আহারাদি সমাধা করিয়া ঘুমাইতে গিয়াছে। এমন সময় আতর মাখিয়া, উড়ানি উড়াইয়া, হঠাৎ গোপীনাথ আসিয়া উপস্থিত হইল– সুবধা অনেকখানি জিভ কাটিয়া সাত হাত ঘোমটা টানিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করিল।
গিরিবালা ভাবিল, তাহার দিন আসিয়াছে। সে মুখ তুলিয়া চাহিল না। সে রাধিকার মতো গুরুমানভরে অটল হইয়া বসিয়া রহিল। কিন্তু দৃশ্যপট উঠিল না;… সংগীতহীন নীরসকণ্ঠে গোপীনাথ বলিল, একবার চাবিটা দাও দেখি।… গিরিবালা সমস্ত মান বিসর্জন দিয়া উঠিয়া পড়িল। স্বামীর হাত ধরিয়া বলিল, চাবি দিব এখন, তুমি ঘরে চল।…
গোপীনাথ কহিল, আমি বেশি দেরি করতে পারিব না, তুমি চাবি দাও।…
গিরিবালা প্রস্তরমূর্তির মতো শক্ত হইয়া, দরজা ধরিয়া, ছাদের দিকে চাহিয়া, দাঁড়াইয়া রহিল। ব্যর্থমনোরথ গোপীনাথ রাগে গরগর করিতে করিতে আসিয়া বলিল, চাবি দাও বলিতেছি, নহিলে ভালো হইবে না।
গিরিবালা উত্তরমাত্ৰ দিল না। তখন গোপী তাহাকে চাপিয়া ধরিল এবং তাহার হাত হইতে বাজুবন্ধ, গলা হইতে কণ্ঠী, অঙ্গুলি হইতে আংটি ছিনিয়া লইয়া তাহাকে লাথি মারিয়া চলিয়া গেল।
এই পর্যন্ত শুনেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন কাদম্বরী। ওরে একটু থাম তুই। মালিনী, গিরিবালার কষ্ট আমি আর সইতে পারছি না।
রূপা কাদম্বরীকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে চায়। কাদম্বরীও পরম আশ্রয়ের মতো তার কাঁধে মাথা রাখেন।
স্বর্ণ বলে ওঠেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না মালিনী, তুই কী একটা আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে বসলি আর নতুনবউঠান এমন কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন! এ তো তোর বটতলার গল্প নয়, ভাষার কৌশল বেশ ভাল, বর্ণনাও চমৎকার। এ গল্প কে লিখেছে?
আমি জানি না স্বর্ণদিদি, মালিনীর অকপট স্বীকারোক্তি। নতুনবউঠানের সামনে এলেই আজকাল আমার মাথায় এই গল্পের লাইনগুলো কিলবিল
সেকী রে, স্বর্ণ অবাক হন, তুই এমন চোখ বুজে গড়গড়িয়ে কী বলে যাচ্ছিস, আরেকটু শোনা তো!
শোনো, আমি ছবির মতো দেখতে পাচ্ছি, মালিনী উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায়, গোপীনাথ থিয়েটারে গিয়ে গোলমাল পাকাচ্ছে, স্টেজের ওপর ফুলের তোড়া ছুঁড়ে দিচ্ছে, লবঙ্গ লবঙ্গ বলে চেঁচাচ্ছে। উপায় না দেখে থিয়েটারের মালিকরা গোপীনাথকে হল থেকে বের করে দিল। সেই রাগে থিয়েটারের দলকে শিক্ষা দেবার জন্য লবঙ্গকে নিয়ে পরদিন বোটে চড়ে পালিয়ে গেল গোপী।
ওমা, কী কাণ্ড, রূপাও উত্তেজিত, তারপর কী হল, আমার আর তর সইছে না মালিনীদিদি।
স্বর্ণ বিরক্ত হন, আঃ রূপা তুই থাম তো। মালিনী এভাবে নিজের ভাষায় বলিস না। ওই সাহিত্যের ভাষায় বল।
থিয়েটারওয়ালারা হঠাৎ অকূলপাথারে পড়িয়া গেল। কিছুদিন লবঙ্গের জন্য অপেক্ষা করিয়া অবশেষে এক নতুন অভিনেত্রীকে মনোরমার অংশ অভ্যাস করাইয়া লইল; তাহাতে তাহাদের অভিনয়ের সময় পিছাইয়া গেল।
কিন্তু বিশেষ ক্ষতি হইল না। অভিনয়স্থলে তোক আর ধরে না। শতশত লোক দ্বার হইতে ফিরিয়া যায়। কাগজেও প্রশংসার সীমা নাই।
সে প্রশংসা দূরদেশে গোপীনাথের কানে গেল। সে আর থাকিতে পারিল না। বিদ্বেষে ও কৌতূহলে পূর্ণ হইয়া সে অভিনয় দেখিতে আসিল।
মনোরমা যতক্ষণ মলিন দাসীবেশে ঘোমটা টানিয়া ছিল ততক্ষণ গোপীনাথ নিস্তব্ধ হইয়া দেখিতেছিল। কিন্তু যখন সে আভরণে ঝলমল করিয়া, রক্তাম্বর পরিয়া, মাথার ঘোমটা ঘুচাইয়া, রূপের তরঙ্গ তুলিয়া বাসরঘরে দাঁড়াইল এবং এক অনির্বচনীয় গর্বে গৌরবে গ্রীবা বঙ্কিম করিয়া সমস্ত দর্শকমণ্ডলীর প্রতি এবং বিশেষ করিয়া সম্মুখবর্তী গোপীনাথের প্রতি চকিত বিদ্যুতের ন্যায় অবজ্ঞাবজ্রপূর্ণ তীক্ষ্ণ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিল– যখন সমস্ত দর্শকমণ্ডলীর চিত্ত উদ্বেলিত হইয়া প্রশংসার করতালিতে নাট্যস্থলী সুদীর্ঘকাল কম্পান্বিত করিয়া তুলিতে লাগিল– তখন গোপীনাথ সহসা উঠিয়া দাঁড়াইয়া গিরিবালা গিরিবালা করিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। ছুটিয়া স্টেজের উপর লাফ দিয়া উঠিবার চেষ্টা করিল– বাদকগণ তাহাকে ধরিয়া ফেলিল।
এই অকস্মাৎ রসভঙ্গে মর্মান্তিক ক্রুদ্ধ হইয়া দর্শকগণ ইংরাজিতে বাংলায় দূর করে দাও বের করে দাও বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিল।
গোপীনাথ পাগলের মতো ভগ্নকণ্ঠে চিৎকার করিতে লাগিল, আমি ওকে খুন করব, ওকে খুন করব।
পুলিশ আসিয়া গোপীনাথকে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেল। সমস্ত কলকাতা শহরের দর্শক দুই চক্ষু ভরিয়া গিরিবালার অভিনয় দেখিতে লাগিল, কেবল গোপীনাথ সেখানে স্থান পাইল না।
