শেষ পর্যন্ত রূপা আর মালিনী মিলে কাদম্বরীকে রাজি করিয়েই ফেলল। বিনোদিনীকে স্বচক্ষে দেখার জন্য কাদম্বরীও ছটফট করছিলেন সেই সরোজিনী নাটকের সময় থেকে। কৌতূহল আর যেন বাধ মানছে না।
এক সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ কাজের গোপন উত্তেজনায় দুরু দুরু বুকে আটপৌরে ধনেখালি শাড়ির ছদ্মবেশে ঘোমটায় মাথা ঢেকে রূপা আর কাদম্বরী বেরিয়ে পড়লেন ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্দেশে অ্যাডভেঞ্চারে।
অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলায় সুধোকে লইয়া (গিরিবালা) গোপনে থিয়েটার দেখিতে গেল। নিষিদ্ধ কাজের উত্তেজনা বেশি। তাহার হৃৎপিণ্ডের মধ্যে যে-এক মৃদু কম্পন উপস্থিত হইয়াছিল সেই কম্পনাবেগে এই আলোকময়, লোকময়, বাদ্যসংগীত-মুখরিত, দৃশ্যপটশোভিত রঙ্গভূমি তাহার চক্ষে দ্বিগুণ অপরূপ ধারণ করিল।… সেদিন মানভঞ্জন অপেরা অভিনয় হইতেছে… রাধার দুর্জয় মান হইয়াছে; সে মানসাগরে কৃষ্ণ আর কিছুতেই থই পাইতেছে না– কত অনুনয় বিনয় সাধাসাধি কাদাকাদি, কিছুতেই কিছু হয় না। তখন গর্বভরে গিরিবালার বক্ষ ফুলিতে লাগিল। কৃষ্ণের এই লাঞ্ছনায় সে যেন মনে মনে রাধা হইয়া নিজের অসীম প্রতাপ নিজে অনুভব করিতে লাগিল। কেহ তাহাকে কখনো এমন করিয়া সাধে নাই: সে অবহেলিত অবমানিত পরিত্যক্ত স্ত্রী, কিন্তু তবু সে এক অপূর্ব মোহে স্থির করিল যে, এমন করিয়া কাঁদাইবার ক্ষমতা তাহারও আছে।… অবশেষে যবনিকাপতন হইল, গ্যাসের আলো ম্লান হইয়া আসিল, দর্শকগণ প্রস্থানের উপক্ৰম করিল; গিরিবালা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসিয়া রহিল। এখান হইতে উঠিয়া যে বাড়ি যাইতে হইবে এ কথা তাহার মনে ছিল না।… এখন হইতে সে প্রতি সপ্তাহেই থিয়েটারে যাইতে আরম্ভ করিল।
প্রতি সপ্তাহে না হলেও কাদম্বরী তার দুঃসাহসী সঙ্গিনীদের নিয়ে আরও দু-চারবার ন্যাশনালে গোপন অ্যাডভেঞ্চার করলেন। ঠাকুরবাড়ির কেউ এই থিয়েটার-কাণ্ড টের পেল না সত্যিই।
তারা মেতেছিলেন অশ্রুমতী নিয়ে। এত শোরগোল পড়ে গেছে আর বাড়ির মেয়েরা দেখতে পাবে না! ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় একদিন অভিনয়ের ব্যবস্থা হল। কিন্তু তাতে সকলের মন ভরলেও থিয়েটারের আবহাওয়া পুরোপুরি উপভোগ করা গেল না যেন। কিছুদিনের মধ্যেই গুণেন ঠাকুরের আদেশে ১৮৭৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পুরো বেঙ্গল থিয়েটার ভাড়া নেওয়া হল শুধু ঠাকুর পরিবারের জন্য। আগে দু-একজন লুকিয়ে চুরিয়ে দেখে থাকতেও পারেন কিন্তু অভিজাত মেয়েদের সেই প্রথম সাড়ম্বরে থিয়েটারে পদার্পণ। হলের বেঞ্চি সরিয়ে বাড়ি থেকে আনা কাপের্ট, আরামচেয়ার ও নানা আসবাবে হল সেজে উঠল। ফুলের মালা, আলবোলা, মেয়েদের চিকের ব্যবস্থাও বাদ গেল না। ৫ এবং ৬ নং বাড়ির সকলেই এদিন মহা উৎসাহে থিয়েটার দেখতে গেলেন। কাদম্বরীও।
সেদিন নায়িকা হয়েছেন সুকুমারী। অন্যরা মুগ্ধ বিস্ময়ে নাটক উপভোগ করলেন কিন্তু কাদম্বরী আনমনা। তিনি ন্যাশনালে দেখে আসা বিনোদিনীর রূপমাধুর্যের স্মৃতিতে ঈর্ষাতুর বিষণ্ণতায় ডুবে রইলেন। জ্যোতির মুখে বিনোদিনীর প্রশংসাই তো সবচেয়ে বেশি শুনতে হয় তাকে।
.
আন্না তড়খড় ভগ্ন মন নিয়ে বোম্বাই ফিরে গেছেন। রবির প্রতি তীব্র অভিমানে তাকে চিঠি লেখেন না, কিন্তু কাদম্বরীকে দু-একটা চিঠি পাঠিয়ে নিজের কথা জানান। রবির দেওয়া নলিনী নামটি অবশ্য তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। আনাবাই নলিনী নাম নিয়ে তিনি পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করেন।
মনখারাপের মধ্যেও আনা বুঝতে পারছিলেন রবি অধরাই রয়ে যাবেন। কাদম্বরী চিঠিতে জানতে পারেন, আন্নার জীবনে এক নতুন পুরুষের কথা। দুজনের প্রথম দেখা ডবলিন শহরে, প্রায় প্রথম সাক্ষাতেই প্রেম। লিটলডেল তখন বরোদা কলেজের উপাধ্যক্ষ। তরুণ স্কটিশ অধ্যাপক হারল্ড লিটলডেলের সঙ্গে নভেম্বরের এক শীতসন্ধ্যায় বিয়ে হয়ে গেল আন্নার।
আন্না হয়তো এই ভাল করল, কাদম্বরী হাতের তাস ফেলে বললেন। রূপা আর স্বর্ণকুমারীর সঙ্গে বিছানার ওপর মাদুর পেতে গোল হয়ে বসে তাস খেলছেন তখন।
এ-কথা বলছ কেন? স্বর্ণ জানতে চান, ভাল খারাপ কীসে মাপছ নতুন বউঠান? রবির সঙ্গে বিয়ে হলেই বা কী খারাপ হত?
সে তো বাবামশায় রাজি হলেন না, কাদম্বরী বলেন। আর রবি কি তা চায়? চাইলে তো কিছু বলত আন্নাকে। আর আমি ভাবছিলাম, এ বাড়ির ছেলেরা তো অন্য নারীর রূপের মোহে স্ত্রীকে ভুলে যেতে পারে চট করে, তার চেয়ে ওর সাহেব বর ভাল।
এ তোমার অভিমানের কথা বউঠান, স্বর্ণ যেন মানতে চান না জ্যোতির প্রতি কাদম্বরীর চাপা ক্ষোভের কারণটা। ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের চরিত্র খুব বলিষ্ঠ। এদের মতো সংবেদনা আর কোন বাড়িতে পাবে?
রূপা আর ক্ষোভ চেপে রাখতে পারে না, স্বর্ণদিদি তুমি সব জানো না। রোজ কত সেজেগুজে অপেক্ষা করে নতুনবউঠান, আর নতুন দাদা ঘরে এলেও টাকাপয়সা নিয়ে পোশাক পালটে আতর লাগিয়ে আবার চলে যান, বউঠানের দিকে তাকানোর দু মুহূর্ত ফুরসত নেই যেন।
কাল কী হল জানো ঠাকুরঝি? কাদম্বরীর চোখে জল ভরে আসে, আমি ওঁর পথ আটকে বললাম, যেতে দেব না, আজ সন্ধেটা আমার সঙ্গে থাকো।
তিনি বললেন, ছাড়ো বউ, আমাকে যেতেই হবে।
আমি আঁকড়ে ধরে বললাম, দেখি কেমন করে যাও!
তিনি বললেন, জেদ কোরো না।
