শোনো বউঠান, রূপা জোর গলায় বলে, স্টেজের নটীরা সেজেগুজে সবার সামনে তাদের রূপ মেলে ধরছে, কিন্তু তারা কেউ তোমার চেয়ে রূপসিএ আমি বিশ্বাস করি না।
কাদম্বরী আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ান, গায়ের কাপড় ফেলে দিয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন তারও মনে হয়, রূপা সত্যি বলছে। নিজের লাবণ্য উচ্ছ্বাসে তার নিজেরই ঘোর লাগে যেন। কিন্তু বিনোদিনী, সে কেমন দেখতে? জানতেই হবে কাদম্বরীকে। অধীর হয়ে ওঠেন তিনি, বলেন, অনেকদিন তোর নতুনদাদাকে বলেছি থিয়েটারে নিয়ে যেতে, কিছুতেই সাহস পাননি বাবামশায়ের ভয়ে। চল তুই আর আমি লুকিয়ে বিনোদিনীকে দেখে আসি একদিন।
যাবে, সত্যি যাবে বউঠান? রূপাও উত্তেজিত হয়ে ওঠে নিষিদ্ধের স্বাদ নেওয়ার এমন লোভনীয় প্রস্তাবে।
প্রথমে মালিনীকে নিয়ে তুই বরং দেখে আয়, কাদম্বরী দ্বিধা করেন, আমি গিয়ে জানতে পারলে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে বাকি রাখবে সকলে। এমনিতেই বাঁজা বলে উঠতে বসতে খোঁটা দেয়, তার ওপর এখন স্বামীসোহাগ কমে গিয়েছে ভেবে সবাই যেন আরও তেড়ে আসছে। যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ভয় পাচ্ছি রে।
কাদম্বরীকে জড়িয়ে ধরে রূপা বলে, না বউঠান, তা হবে না। চলো না, এমন ব্যবস্থা করব লুকিয়ে যাওয়ার, কেউ জানতে পারলে তো!
কী ব্যবস্থা করবি শুনি? কাদম্বরী আশার আলোর খোঁজে মরিয়া যেন। তুই।
কী করে করবি? খবরদার হ্যারিসাহেবকে এর মধ্যে টেনে আনিস না যেন!
না না, বউঠান, ওই যে তুমি বললে মালিনীর কথা, আমি ওকেই ডেকে আনছি। ওই সব ব্যবস্থা করে দেবে। আমরা তিনজনেই গোপনে দেখে আসি চলো।
ধুর যত সব অসম্ভবের আশা, কাদম্বরী প্রসঙ্গ পালটাতে চান ভয় পেয়ে। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মালিনী এসে হাজির। সব শুনে সে এক অদ্ভুত কথা বলে বসল- নতুনবউঠান জানো, ভবিষ্যতে তোমাকে নিয়ে যে গল্পটা লেখা হবে, মালিনী রহস্য করে বলে, তার লাইনগুলো এখনই তোমাকে শোনাতে পারি, যদি শুনতে চাও তো।
সে আবার কী রে মালিনী, ভবিষ্যতের লেখা আবার কী, কাদম্বরী বলেন, তুই কি নিজেই আজকাল আফিম খেয়ে গল্পটল্প লিখছিস নাকি?
আমি কেন লিখব, তোমার প্রিয়জনদের মধ্যেই কেউ হয়তো লিখবে, আমি চোখ বুজে বসলেই সে লেখার অক্ষরগুলো অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করে চোখের সামনে ভেসে উঠছে, শুনবে, শোননই না একটু গিরিবালার সৌন্দর্য অকস্মাৎ আলোকরশ্মির ন্যায়, বিস্ময়ের ন্যায়, নিদ্রাভঙ্গে চেতনার ন্যায়,… তাহার সন্তানাদি নাই, ধনিগৃহে তাহার কোনো কাজকর্মও নাই– সে কেবল নির্জনে প্রতিদিন আপনার মধ্যে আপনি সঞ্চিত হইয়া শেষকালে আপনাকে আর ধারণ করিয়া রাখিতে পারিতেছে না। স্বামী আছে কিন্তু স্বামী তার আয়ত্তের মধ্যে নাই। গিরিবালা বাল্যকাল হইতে যৌবনে এমন পূর্ণবিকশিত হইয়া উঠিয়াও কেমন করিয়া তাহার স্বামীর চক্ষু এড়াইয়া গেছে।
বরঞ্চ বাল্যকালে সে তাহার স্বামীর আদর পাইয়াছিল।… গোপীনাথ যাহাকে দাসখত লিখিয়া দিয়াছে তাহার নাম লবঙ্গ– সে থিয়েটারে অভিনয় করে– সে স্টেজের উপর চমৎকার মূৰ্ছা যাইতে পারে– সে যখন সানুনাসিক কৃত্রিম কঁদুনির স্বরে হাঁপাইয়া হাঁপাইয়া টানিয়া টানিয়া আধ-আধ উচ্চারণে প্রাণনাথ প্রাণেশ্বর করিয়া ডাক ছাড়িতে থাকে তখন পাতলা ধুতির উপর ওয়েস্টকোট পরা, ফুলমোজামণ্ডিত দর্শকমণ্ডলী এক্সেলেন্ট এক্সেলেন্ট করিয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া ওঠে।
কাদম্বরী উসখুস করে আর থাকতে না পেরে এক ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন, যাঃ, কীসব গাঁজাখুরি গল্প বলছিস মালিনী, তোদের নতুনদাদা কি ওরকম ছাপোষা পোশাক পরেন, না কি আমার নাম গিরিবালা? কেন এ-সব গিরিবালা গোপীনাথ লবঙ্গদের গল্প আমাকে শোনাচ্ছিস?
তুমি চিনতে পারলে না নতুনবউঠান, মালিনী বলে, ওটা তো তোমারই গল্প। দেখছ না সবটাই তোমার জীবনের আদলে লেখা!
সে তো তুই ইনিয়ে বিনিয়ে লিখেছিস, কাদম্বরী ফুঁসে ওঠেন, তোকে এত বিশ্বাস করি মালিনী, তুই কী করে পারলি আমাকে নিয়ে এমন কেচ্ছার গল্প ফঁদতে? আমার যন্ত্রণা তোর কাছে হাসির খোরাক হল? ছিঃ!
মালিনী কাদম্বরীর পায়ে মাথা রেখে বলে, নতুনবউঠান বিশ্বাস করো, আমি এ-সব মনে মনে ভাবিনি। আমি চোখ বুজলে অনেক অদ্ভুত সব ব্যাপার ঘটে, না-লেখা অক্ষরগুলো নেচে বেড়ায়, আমি পড়তে পারি। আজ তোমার সামনে বসতেই আমার মাথায় হুড়মুড় করে এ-সব লাইনগুলো আসছে। এ গল্প আমি লিখিনি, বিশ্বাস করো, এ ভাষায় আমি ভাবতেই পারি না। কে লিখবে কখন লিখবে আমি জানি না। কিন্তু জানি এ লেখা সত্যি।
যা যা, তুই আমার চোখের সামনে থেকে যা তো মালিনী, কাদম্বরী ওকে আর সইতে পারেন না, যত সব ভুতুড়ে কাণ্ড। রূপাকে বলেন, তুই রবির চিঠিগুলো আরেকবার পড়ে শোনা তো রূপা।
আর কতবার শুনবে নতুনবউঠান, রূপা যেন মজা পায়, পড়ে পড়ে আমারই তো মুখস্থ হয়ে গেল।
তবু পড়, কাদম্বরী বলেন, আমার ভাল লাগে, সেই যে মিস্টার আর মিসেস বেকার সারাক্ষণ ঝগড়া করেন, সেই চিঠিটা পড় না, বেশ মজা হবে। রূপা বিছানার ওপর তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে পড়তে থাকে–
‘আমি দিনকতক আমার শিক্ষকের পরিবারের মধ্যে বাস করেছিলুম। সে বড়ো অদ্ভুত পরিবার। মিস্টার ব–মধ্যবিত্ত লোক। তিনি লাটিন ও গ্রীক খুব ভালোরকম জানেন। তাঁর ছেলেপিলে কেউ নেই; তিনি, তার স্ত্রী, আমি, আর একজন দাসী, এই চারজন মাত্র একটি বাড়িতে থাকতুম। কর্তা আধবুড়ো লোক, অত্যন্ত অন্ধকার মূর্তি, দিনরাত খুঁতখুঁত খিটখিট করেন, নীচের তলায় রান্নাঘরের পাশে একটি ছোট্ট জানলাওয়ালা দরজা-বন্ধ অন্ধকার ঘরে থাকেন। একে তো সূর্যকিরণ সে ঘরে সহজেই প্রবেশ করতে পারে না, তাতে জানলার উপরে একটা পর্দা ফেলা, চার দিকে পুরোনো ছেঁড়া ধুলোমাখা নানা প্রকার আকারের ভীষণদর্শন গ্রীক-লাটিন বইয়ে দেয়াল ঢাকা, ঘরে প্রবেশ করলে একরকম বদ্ধ হাওয়ায় হাঁপিয়ে উঠতে হয়। এই ঘরটা হচ্ছে তার স্টাডি, এইখানে তিনি পড়েন ও পড়ান। তার মুখ সর্বদাই বিরক্ত। আঁট বুটজুতো পরতে বিলম্ব হচ্ছে, বুটজুতোর উপর চটে ওঠেন; যেতে যেতে দেয়ালের পেরেকে তার পকেট আটকে যায়, রেগে ভুরু কুঁকড়ে ঠোঁট নাড়তে থাকেন। তিনি যেমন খুঁতখুঁতে মানুষ, তার পক্ষে তেমনি খুঁতখুঁতের কারণ প্রতি পদে জোটে। আসতে যেতে হুচট খান, অনেক টানাটানিতে তাঁর দেরাজ খোলে না, যদি বা খোলে তবু যে-জিনিস খুঁজছিলেন তা পান না। এক-এক দিন সকালে তার স্টাডিতে এসে দেখি, তিনি অকারণে বসে বসে ভ্রুকুটি করে উ আঁ করছেন, ঘরে একটি লোক নেই। কিন্তু ব–আসলে ভালোমানুষ– তিনি খুঁতখুঁতে বটে, রাগী নন; খিটখিট করেন, কিন্তু ঝগড়া করেন না। নিদেন তিনি মানুষের উপর রাগ প্রকাশ করেন না, টাইনি বলে তার একটা কুকুর আছে তার উপরেই তার আক্রোশ। সে একটু নড়লে চড়লে তাকে ধমকাতে থাকেন, আর দিনরাত তাকে লাথিয়ে লাথিয়ে একাকার করেন। তাকে আমি প্রায় হাসতে দেখি নি। তার কাপড়চোপড় ছেঁড়া অপরিষ্কার। মানুষটা এইরকম। তিনি এককালে পাদরি ছিলেন; আমি নিশ্চয় বলতে পারি, প্রতি রবিবারে তার বক্তৃতায় তিনি শ্রোতাদের নরকের বিভীষিকা দেখাতেন। তার এত কাজের ভিড়, এত লোককে পড়াতে হত যে, এক-এক দিন তিনি ডিনার খেতে অবকাশ পেতেন না। এক-এক দিন তিনি বিছানা থেকে উঠে অবধি রাত্রি এগারোটা পর্যন্ত কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এমন অবস্থায় খিটখিটে হয়ে ওঠা কিছু আশ্চর্য নয়। গৃহিণী খুব ভালোমানুষ, রাগী উদ্ধত নন, এককালে বোধ হয় ভালো দেখতে ছিলেন, যত বয়স তার চেয়ে তাকে বড় দেখায়, চোখে চশমা, সাজগোজের বড়ো আড়ম্বর নেই। নিজে রাঁধেন, বাড়ির কাজকর্ম করেন, ছেলেপিলে নেই, সুতরাং কাজকর্ম বড়ো বেশি নয়। আমাকে খুব যত্ন করতেন। খুব অল্প দিনেতেই বোঝা যায় যে, দম্পতির মধ্যে বড়ো ভালোবাসা। নেই, কিন্তু তাই বলে যে দুজনের মধ্যে খুব বিরোধ ঘটে তাও নয়, অনেকটা নিঃশব্দে সংসার চলে যাচ্ছে। মিসেস ব কখনো স্বামীর স্টাডিতে যান না; সমস্ত দিনের মধ্যে খাবার সময় ছাড়া দুজনের মধ্যে দেখাশুনা হয় না, খাবার সময়ে দুজনে চুপচাপ বসে থাকেন। খেতে খেতে আমার সঙ্গে গল্প করেন, কিন্তু দুজনে পরস্পর গল্প করেন না। বর আলুর দরকার হয়েছে, তিনি চাপা গলায় মিসেসকে বললেন, some potatoes (please কথাটা বললেন না কিংবা শোনা গেল না)। মিসেস ব–বলে উঠলেন I wish you were a little more polite। ব– বললেন I did say please; মিসেস ব–বললেন I did not hear it; ব–বললেন it was no fault of mine। এইখানেই দুই পক্ষ চুপ করে রইলেন। মাঝে থেকে আমি অত্যন্ত অপ্রস্তুতে পড়ে যেতেম। একদিন আমি ডিনারে যেতে একটু দেরি করেছিলেম, গিয়ে দেখি, মিসেস ব, ব–কে ধমকাচ্ছেন, অপরাধের মধ্যে তিনি মাংসের সঙ্গে একটু বেশি আলু নিয়েছিলেন। আমাকে দেখে মিসেস ক্ষান্ত হলেন, মিস্টার সাহস পেয়ে শোধ তোলবার জন্যে দ্বিগুণ করে আলু নিতে লাগলেন, মিসেস তার দিকে নিরুপায় মর্মভেদী কটাক্ষপাত করলেন। দুই পক্ষই দুই পক্ষকে যথারীতি ডিয়ার ডার্লিং বলে ভুলেও সম্বোধন করেন না, কিংবা কারও ক্রিশ্চান নাম ধরে ডাকেন না, পরস্পর পরস্পরকে মিস্টার ব–ও মিসেস ব–বলে ডাকেন। আমার সঙ্গে মিসেস হয়তো বেশ কথাবার্তা কচ্ছেন, এমন সময় মিস্টার এলেন, অমনি সমস্ত চুপচাপ। দুই পক্ষেই এইরকম। একদিন মিসেস আমাকে পিয়ানো শোনাচ্ছেন, এমন সময় মিস্টার এসে উপস্থিত; বললেন, When are you going to stop? মিসেস বললেন, I thought you had gone out পিয়ানো থামল। তার পরে আমি যখন পিয়ানো শুনতে চাইতেম মিসেস বলতেন, that horrid man যখন বাড়িতে না থাকবেন তখন শোনাব, আমি ভারি অপ্রস্তুতে পড়ে যেতুম। দুজনে এইরকম অমিল অথচ সংসার বেশ চলে যাচ্ছে। মিসেস রাঁধছেন বাড়ছেন, কাজকর্ম করছেন, মিস্টার রোজগার করে টাকা এনে দিচ্ছেন; দুজনে কখনো প্রকৃত ঝগড়া হয় না, কেবল কখনো কখনো দুই-এক বার দুই-একটা কথা-কাটাকাটি হয়, তা এত মৃদুস্বরে যে পাশের ঘরের লোকের কানে পর্যন্ত পৌঁছয় না। যা হোক আমি সেখানে দিনকতক থেকে বিব্রত হয়ে সে অশান্তির মধ্যে থেকে চলে এসে বেঁচেছি।‘
