কাদম্বরী তাঁর চাঁপার কলির মতো আঙুলে আন্নার গোলাপি থুতনি তুলে ধরে জানতে চান, আন্না তুমি মরেছ, রবি তোমার সব চুরি করেছে মনে হচ্ছে!
আন্না লজ্জা পান, মুখ ঘুরিয়ে বলেন, আহা, সে তো জানে শুধু নতুনবউঠান আর নতুনবউঠান। তুমিই তার মাথা খেয়েছ। তোমাকে আমি খুব ঈর্ষা করি।
কাদম্বরী ছাড়েন না, নিজের অস্বস্তি গোপন করে আন্নাকে বলেন, ও-সব। বলে পাশ কাটানো যাবে না, সত্যি বলল, তুমি রবিকে ভালবাসো?
লজ্জায় আন্নার মুখ নুয়ে পড়ে কাদম্বরীর বুকে। বলেন, আমি আগে কখনও এত কাছ থেকে কোনও কবিকে দেখিনি! তাকে ভাল না বেসে পারা যায় না!
আন্নার চোখে রবির এক নতুন চেহারার ছায়া দেখেন কাদম্বরী, সে আর তার সেই কিশোর উপাসক নয়, সে যে কোন অজান্তে এক রমণীমোহন পুরুষ হয়ে উঠেছে কাদম্বরী জানতেও পারেননি। মনের কোণে কোথায় ঈষৎ খচখচ করে, এতদিনকার একান্তই তার আঁচলে বাঁধা পোষা প্রাণীটি এখন অন্যত্র রাজ্যবিস্তার করছে। অন্য নারীর চোখের তারায় রবির ছায়া তিরতির করে কাঁপতে দেখে কাদম্বরী উদাস হয়ে যান একটু। কাদম্বরীর ছায়া কি কারও চোখের মণিতে ছায়া ফেলে?
পাণ্ডুরং মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পারছেন বলেই কলকাতায় এসেছেন। রবি চলে যাওয়ার পর থেকেই আন্না খুব উদাস। রবি যাওয়ার সময়ে যেন আন্নার হৃদয়টিকেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন। এদিকে এত যুবক তার কৃপাপ্রার্থী, কিন্তু তাদের কাউকেই ঠিক মনে ধরেনি এই চঞ্চলা কন্যার। পাণ্ডুরং দেবেন ঠাকুরের সঙ্গে একথা-সেকথার পর জানতে চান রবির বিয়ের কথা কিছু ভাবছেন কি না মহর্ষি দেবেন্দ্র পাণ্ডুরংকে যত্নআত্তি করলেও রবির বিয়ের কথায় সায় দিতে পারেন না। রবি এখন বিলেতে পড়তে গেছে। আগে সে সব সম্পূর্ণ হোক, কাজ শুরু করুক, তারপর ভাবা যাবে। তা ছাড়া এই মরাঠি ভদ্রলোকের মনের ইচ্ছে অনুমান করলেও কোনওদিনই তাতে রাজি হতে পারবেন না দেবেন্দ্র। একে কন্যা বাঙালিনি নয় তার ওপর বয়সে রবির চেয়ে প্রায় পাঁচ-ছ বছরের বড়। গুজরাতি মরাঠিদের মধ্যে এমন অসম-বয়সি বিয়ে হলেও বাঙালিদের মধ্যে চল নেই। দেবেন ঠাকুর নানা কথায় বিয়ের প্রসঙ্গটি লঘু করে দেন। পাণ্ডুরং বুদ্ধিমান পুরুষ, বুঝতে পারেন এখানে বিয়ের সম্ভাবনা কম। বিষণ্ণ মনে আন্নাকে নিয়ে তিনি ঠাকুরবাড়ি থেকে বিদায় নেন।
আন্নার ছেড়ে যাওয়া বিষাদ যেন কাদম্বরীর ওপর ভর করে। তেতলার একলা ঘরে কখনও বিছানায় কখনও মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে তার দিনরাত যেন আর কাটতে চায় না। এখন আর ছাদের আসর বসে না। রবি চলে গেছে, অক্ষয় বা বিহারীলাল আর আসেন না। আসবেন কার কাছে? জ্যোতি এখন নাটক নিয়ে এমন মেতেছেন যে ঘরে আসার সময়ই হয় না। যখন ঘরে থাকেন, তখনও নতুন নাটক লেখায় ব্যস্ত। অশ্রুমতী মঞ্চস্থ হচ্ছে হইচই করে। জ্যোতি সারাদিন রিহার্সালেই পড়ে থাকেন। নায়িকাকে পার্ট শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। এখানেই কাদম্বরীর ব্যথা।
ব্যথা আছে জ্যোতির বুকেও। বিনোদিনী বেঙ্গল থিয়েটার ছেড়ে চলে গেছেন, সুতরাং অশ্রুমতীর নায়িকার ভূমিকায় তাকে পাওয়া গেল না। সুকুমারী বা বনবিহারিণীকে অনেক শিখিয়েও যেন বিনোদিনীর মতো হয় না। জ্যোতি ছুটে ছুটে কিশোরী বিনোদিনীর অভিনয় দেখতে যান ন্যাশনাল থিয়েটারে। কী তার অভিনয়! বিষবৃক্ষে কুন্দনন্দিনী, সধবার একাদশীতে কাঞ্চন, পলাশীর যুদ্ধে ব্রিটানিয়া এবং মেঘনাদ বধে একসঙ্গে সাতটি চরিত্রে পার্ট করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। গিরিশ ঘোষের সাহচর্যে এবং নিজের ঐকান্তিক নিষ্ঠায় অন্যসব নায়িকাদের ছাপিয়ে ইতিমধ্যেই আগুনের শিখার মতো স্টেজ জ্বালিয়ে দিচ্ছেন বিনোদিনী। জ্যোতি বারবার তাকে অনুনয় করেন অশ্রুমতীর নায়িকা হওয়ার জন্য, কিন্তু বিনোদিনী ফিরিয়ে দেন। গিরিশ ঘোষকে ছেড়ে বেঙ্গল থিয়েটারে ফিরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। তবে কি বিনোদিনী গিরিশের প্রেমে পড়েছে? জ্যোতির মনটা ঈর্ষায় চিনচিন করে ওঠে।
রূপা আর কাদম্বরী বসে বসে কখনও রবির চিঠি পড়েন, কখনও থিয়েটারের রিভিউ। সেদিন বিনোদিনীর রূপগুণের ব্যাখ্যান পড়তে পড়তে হঠাৎ কাদম্বরী দেখলেন রূপা কিছুই শুনছে না, হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।
কাদম্বরী পত্রিকা নামিয়ে রেখে বালিশে গা এলিয়ে বলেন, এই রূপা, কী দেখছিস রে অমন হাঁ করে?
রূপা বলে, তোমাকে দেখছি। দেখছি আর অবাক হয়ে ভাবছি এমন অপূর্ব রূপ তোমার, এমন শরীরের গড়ন, যেন হঠাৎ আসা আলোর মতো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। তবু কেন জ্যোতিদাদার ঘরে মন টেকে না!
তুই যেন জানিস না, তিনি এখন বিনোদিনী, সুকুমারী, বনবিহারিণীদের রূপে মজেছেন! কাদম্বরী ঝামটা মেরে বলেন, আমার দিকে চাইবার তার সময় কোথায়? তবে আমাকে নিয়ে তুই বেশি বেশি আদিখ্যেতা করিস, সত্যি যদি অমন রূপসি হতাম তা হলে কি একা ঘরে পচে মরি?
ওমা, আমি কেন খামোখা মিথ্যে বলব নতুনবউঠান, রূপাও ঝংকার দেয়, তোমার বর যদি এখন আগুন দেখে পতঙ্গের মতো ঝাঁপ দেন, তাতে তোমার কমলহিরের মতো রূপ তো আর মিথ্যে হয়ে যায় না।
তা হলে আমাকে ফেলে তিনি সেখানে ছুটে যান কেন? সেই বারাঙ্গনা নটীরা কি রূপে রুচিতে শিক্ষায় আমাকে ছাপিয়ে গেছে? সে কি বিহারীলালের কবিতা পড়ে?
